Uncategorized

ইজারা নেই, তবু চলছে ড্রেজারের গর্জন: কুষ্টিয়া গড়াই নদীর আর্তনাদ কে শুনবে, কুমারখালীতে প্রশাসন নির্বাক

নদীর বুক ফুঁড়ে যখন সকালের রোদ চিকচিক করে ওঠে, দূর থেকে মনে হয় যেন গড়াই নদী আলোয় ঝলমল করছে। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, এ আলো নয়—নদীর বুকের ক্ষতচিহ্ন থেকে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে ওঠা নীরব আর্তনাদ। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নে মীর মোশাররফ হোসেন সেতুর নিচে লাহিনীপাড়া ঘাটে দিনের আলোয় চলে বালু লুটের উন্মুক্ত উৎসব। অথচ সরকারি নথিতে নেই কোনো ইজারা, নেই কোনো অনুমতি। শুধু আছে ক্ষমতার গলা-চড়া আওয়াজ আর নদীর বুকজুড়ে গভীর ক্ষতের রেখা। নদী যেন প্রাণহীন এক দেহ, যাকে প্রতিদিন ড্রেজারের লোহার দাঁত দিয়ে চেঁছে নিচ্ছে অদৃশ্য সিন্ডিকেটের হাত।

এ যেন এক অদ্ভুত সময়, যেখানে সত্যকে লুকিয়ে রাখা হয় আর লুটেরাদের জন্য প্রশাসনের দরজা খোলা থাকে। কুমারখালী উপজেলার এসিল্যান্ড বলেন, তিনি নাকি কিছুই জানেন না; আবার বলেন, ঘাটের ইজারা আছে। অন্যদিকে ইউএনও সাফ জানিয়ে দেন—ইজারা নেই, খাস কালেকশনের মাধ্যমে বালু তোলা হচ্ছে। দুই কর্মকর্তা দুই দিকে টানেন সত্যের রশি, আর সেই রশি টানাটানির মাঝখানে পড়ে থাকে গড়াই নদী—নিঃশব্দ, ক্ষতবিক্ষত এবং ভাঙা।

এলাকাবাসী বলছেন, রাতদিন ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। সেই কম্পনে নদীর তীর কাঁপে, বাড়ির চৌকাঠ ভেঙে যায়, শিশুরা নদীর দিকে তাকাতেও ভয় পায়। কাগজে-কলমে নেই কোনো ঘাটের নাম, নেই লাইসেন্স; তবুও বালু যায় ট্রলিতে, যায় ট্রাকে, আর যায় প্রভাবশালীদের অদৃশ্য ছায়ার নিচে। নদীর বুকের বালু যেন জন্মগত অধিকার মনে করে যারা তোলেন, তাদের কাছে নদী শুধু টাকা বানানোর মেশিন।

লাহিনীপাড়ার মানুষজনের দীর্ঘশ্বাস—এটা শুধু বালু লুট নয়, আমাদের ভবিষ্যৎ লুট। রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা, দলীয় কর্মী আর অজানা রাঘববোয়ালদের দৌরাত্ম্যে নদী শূন্য হচ্ছে, তীর ফাঁকা হচ্ছে, মানুষের ভরসা কমে আসছে। নদীর ধারা এখন বিষণ্ন, তীর অসহায়, আর মানুষের জীবন ঝুলে আছে অনিশ্চয়তার দড়িতে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, তারা প্রতিবাদ করেন, চিৎকার করেন, অভিযোগ দেন—কিন্তু প্রশাসন আসে শুধু আশ্বাসের ঝুড়ি নিয়ে। সেই আশ্বাসে কাজ হয় না। আগুন হয়ে বের হওয়া তাদের দাবি ক্ষমতার স্যাঁতসেঁতে বাতাসে নিভে যায়।

গড়াই নদী যখন এভাবে কাঁদছে, তখন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমানের বক্তব্য—“লাহিনীপাড়া ঘাট সম্পর্কে আমি অবগত নই।” খাস কালেকশন হলে জেলা প্রশাসন জানবে—এমন বলেই দায় সেরে দেন তিনি। আর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আবদুল ওয়াদুদ জানান, খাস কালেকশনের কোনো নির্ধারিত রেট নেই; ইউএনও যেভাবে ঠিক করেন, সেভাবেই হয়। যেন অনিয়মের সব দরজা খোলা, শুধু সত্য জানার দরজাটাই বন্ধ।

এর চেয়েও ভয়াবহ তথ্য হলো—সাংবাদিকরা যখন বালুর বিষয়ে সরকারি দপ্তরে তথ্য নিতে যান, দপ্তর থেকে বের হওয়ার আগেই সেই তথ্য পৌঁছে যায় সিন্ডিকেটের হাতে। দপ্তরের দরজা পার হতেই সাংবাদিকের ফোন বেজে ওঠে—কেউ পরিচয় দেয় ‘বড় ভাই’, কেউ বলেন ‘রাজনৈতিক নেতা’। হুমকি দিয়ে বলেন, বালুর বিষয়ে কোনো নিউজ করবেন না। তাহলে কি সরকারি কর্মকর্তারাই তথ্য সরবরাহ করেন সেই বালু সিন্ডিকেটকে? প্রশ্ন থেকেই যায়।

যশোর নিউজ/এসএবি


Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button