ভাষার মাস। খাগড়াছড়ির এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে নতুন রঙ করা ইটের দোতলা ভবন চকচক করছে। দেয়ালে শহীদ মিনারের ছবি, করিডোরে ভাষা আন্দোলনের পোস্টার। সকালের অ্যাসেম্বলিতে শিশুরা একসাথে দেশপ্রেমের শপথবাক্য আবৃত্তি করছে। লাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মারমাভাষী ছোট্ট মেয়ে ম্য সিন। তার চুলে নীল ফিতা, পিঠের স্কুলব্যাগে নতুন বই।
সমাবেশ শেষে তাকে জিজ্ঞেস করি, “তুমি বাড়িতে কোন ভাষায় কথা বলো?”
সে একটু ভেবে বলে, “আমাদের ভাষায়।”
“স্কুলে?”
সে এবার সরাসরি উত্তর দেয়, “স্কুলে বাংলা।”
“তোমার ভাষার বই আছে?”
ম্য সিন মাথা নাড়ে। “ছিল। এক বছর।”
এই ‘ছিল’ শব্দটাই মাতৃভাষায় নৃগোষ্ঠী শিশুদের শিক্ষা লাভের পুরো গল্প; বাংলাদেশের বহুভাষিক শিক্ষানীতির সারাংশ।
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় নৃগোষ্ঠী শিশুদের জন্য মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে নীতিগত স্বীকৃতি পায় ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা তাদের মাতৃভাষায় দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এই নীতির পেছনে যুক্তি ছিল আন্তর্জাতিক গবেষণা ও অভিজ্ঞতা।
ইউনেস্কো (UNESCO) বহু বছর ধরে বলে আসছে, শিশুর প্রথম ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হলে শেখার ফল ভালো হয়, ঝরে পড়া কমে, দ্বিতীয় ভাষা শেখাও সহজ হয়। কারণ, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি জ্ঞান গ্রহণের প্রথম জানালা। শিশুর মস্তিষ্ক সহজেই তার পরিচিত শব্দের ভেতর দিয়ে পৃথিবীকে ধরতে শেখে।
এ লক্ষ্যে ২০১২ সাল থেকে কাজ শুরু করে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পর ২০১৭ সালে প্রাক-প্রাথমিক স্তরে পাঁচটি ভাষায় পাঠ্যবই চালু হয়: চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদরি। এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।
দীর্ঘদিনের দাবি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আন্দোলনের ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং সাংবিধানিক অধিকার- সব মিলিয়ে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হয়েছিল। কিন্তু নীতির শক্তি বাস্তবতার গায়ে এসে বারবার ভেঙে পড়েছে।
আজ খাগড়াছড়ির অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অবকাঠামোগতভাবে আগের চেয়ে উন্নত। পাকা ভবন, পাকা মেঝে, বিদ্যুৎ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, কোথাও এমনকি ডিজিটাল বোর্ডও আছে। সমস্যা আর সেই নড়বড়ে ঝুপড়ি ঘর নয়। সমস্যা আজ ভাষার অদৃশ্য স্তরে।
ম্য সিন যে স্কুলে পড়ে, সেখানে মারমা ভাষার বই পৌঁছেছে কিনা, সেটাই আসল প্রশ্ন নয়। বড় সংকট হলো মারমা ভাষায় সাবলীল, প্রশিক্ষিত শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না। নিজ ভাষায় শিক্ষিত মানুষই কম, আর যারা শিক্ষিত, তাদের অনেকেই নিজস্ব লিপিতে পড়া বা লেখায় দক্ষ নন। ফলে বই থাকলেও পাঠদান কার্যকর হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ক্লাসে বই খোলা হয়, কিন্তু ব্যাখ্যা চলে বাংলায়। ধীরে ধীরে বই প্রতীকে পরিণত হয়, শিক্ষার মাধ্যম আর হয়ে ওঠে না।
আরেকটি বাস্তবতা অভিভাবকদের মনস্তত্ত্বে। নৃগোষ্ঠী শিশুদের জন্য বর্তমানে পাঠ্যবই তৈরি হয়েছে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। চতুর্থ শ্রেণিতে উঠলেই পুরোপুরি বাংলা মাধ্যমে পড়তে হয়। ফলে অভিভাবকদের ভীতি কাজ করে। তারা ভাবেন, শুরু থেকেই বাংলা ভালোভাবে না শিখলে পরে সন্তান হঠাৎ করে বাংলা বই বুঝতে পারবে না, অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে পড়বে। এই আশঙ্কা একেবারে অমূলক নয়। কারণ চতুর্থ শ্রেণিতে পাঠ্যবইয়ের ভাষা ও জটিলতা হঠাৎ বেড়ে যায়। তখন যদি শিশুর বাংলা দক্ষতা দুর্বল থাকে, সে একই সঙ্গে বিষয়বস্তু ও ভাষা দুটোই সামলাতে হিমশিম খায়।
এই বাস্তবতায় অনেক পরিবার কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেয়। তারা শুরু থেকেই ঘরে বাংলার ব্যবহার বাড়ায়, স্কুলে বাংলা শেখায় জোর দেয়। ফলে মাতৃভাষার বই থাকলেও সেটি অগ্রাধিকারে থাকে না। নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় শিক্ষা সংক্রান্ত রাষ্ট্রের এই আংশিক প্রস্তুতি সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোকে দ্বিধায় ফেলে দিয়েছে। তিন-চার বছর মাতৃভাষা, তারপর হঠাৎ সম্পূর্ণ বাংলা। এই রূপান্তর যদি সুনির্দিষ্ট সেতুবন্ধন ছাড়া হয়, তবে শিশুকে দুই স্তরের অভিযোজন একসাথে করতে হয়।
এখানেই কাঠামোগত সংকটটি। মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা কার্যকর করতে হলে শুধু সংশ্লিষ্ট ভাষায় বই ছাপাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষক প্রস্তুতি, ধাপে ধাপে ভাষান্তর পরিকল্পনা এবং এমন এক মূল্যায়ন কাঠামো, যেখানে তৃতীয় থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে উত্তরণের সময় ভাষাগত সেতু তৈরি থাকে। নইলে নীতিগত সদিচ্ছা মাঠপর্যায়ে অভিভাবকদের উদ্বেগে এভাবেই আটকে যাবে, আর শিশুরা নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বাংলার দিকেই ঝুঁকে পড়বে।
বাংলাদেশে বাংলা ছাড়া আরও চল্লিশটির বেশি ভাষা প্রচলিত। এদের অনেকই বিপন্নতার বিভিন্ন স্তরে আছে। ভাষাবিদদের মানদণ্ড অনুযায়ী যখন কোনও ভাষায় শিশু প্রজন্ম স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলা কমিয়ে দেয়, তখন সেটি বিপন্নতার দিকে এগোয়। স্কুল যদি শিশুকে বলে, তোমার ভাষা এখানে প্রয়োজনীয় নয়, তাহলে সে দ্রুত বুঝে নেয় কোন ভাষা সামাজিকভাবে মূল্যবান।
এই প্রক্রিয়াটি খুব নীরব।
ম্য সিন বাড়িতে দাদীর সঙ্গে মারমায় কথা বলে। কিন্তু সে জানে পরীক্ষায় নম্বর পেতে হলে বাংলায় সাবলীল হতে হবে। তার বাবা-মাও একই বাস্তবতা বোঝেন। তারা চান মেয়েটি এগিয়ে যাক। চাকরি, উচ্চশিক্ষা, শহুরে জীবন- সবকিছুর ভাষা বাংলা। ফলে ঘরেও ধীরে ধীরে বাংলার ব্যবহার বাড়ে। মাতৃভাষা আবেগের জায়গায় সরে যায়, প্রয়োজনের জায়গা দখল করে নেয় বাংলা।
এখানে অভিভাবকদের যুক্তি অযৌক্তিক নয়। তারা সন্তানের ভবিষ্যৎ ভাবছেন। কিন্তু এর সমষ্টিগত প্রভাব হলো ভাষার স্থানচ্যুতি।
আন্তঃজাতিগত বিবাহও এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। একজন মারমা মা ও অন্য নৃগোষ্ঠীর বাবা হলে সন্তানের ভাষা নির্বাচন নিয়ে বাস্তব সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে একটি তৃতীয় প্রভাবশালী ভাষা বেছে নেওয়া হয়, যা সামাজিকভাবে সুবিধাজনক। ফলে পারিবারিক পরিসরেও মাতৃভাষার ব্যবহার সংকুচিত হয়।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুশীলনের পরিবর্তন ভাষার ব্যবহার কমিয়ে দেয়। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি গান, লোককথা, আচার, স্মৃতির ধারক। যখন এই ক্ষেত্রগুলো সংকুচিত হয়, ভাষাও দুর্বল হয়।
রাষ্ট্রের অবস্থানে একটি মৌলিক দ্বৈততা আছে। একদিকে বাংলা জাতীয় সংহতির ভাষা এবং প্রশাসনিক ভাষা। অন্যদিকে, বহুভাষিকতার নীতিগত স্বীকৃতি। কাগজে এই দুই অবস্থান পাশাপাশি থাকতে পারে। মাঠে সাধারণত একটি ভাষাই আধিপত্য বজায় রাখে।
মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা যদি শুধু প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেটি প্রতীকী হয়ে পড়ে। ধারাবাহিক পাঠক্রম, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, বহুভাষিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ ছাড়া এই উদ্যোগ টেকসই হয় না।
কারণ, ভাষা হলো পরিচয়ের নীরব অবকাঠামো। এটি দৃশ্যমান নয়, কিন্তু ব্যক্তি ও সমাজের চিন্তার কাঠামো নির্ধারণ করে। শিশুকে যদি তার প্রথম ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, সে হয়তো দ্রুত প্রভাবশালী ভাষা শিখে নেয়, কিন্তু নিজের ভেতরের ভিত্তিমূল দুর্বল হয়ে যায়। এই ক্ষতি পরীক্ষার ফলাফল বা পেশাগত সাফল্যের মাপকাঠিতে ধরা পড়ে না।
ম্য সিন যখন ভাষার মাসে শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলা কবিতা আবৃত্তি করে, সেটি এই দেশের ইতিহাসের প্রতি সম্মান। কিন্তু একই সঙ্গে যদি তার নিজের ভাষার পাঠ, গল্প, গান শ্রেণিকক্ষে জায়গা না পায়, তবে বহুভাষিকতার প্রতিশ্রুতি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
এই সংকটের সমাধান জটিল, কিন্তু অসম্ভব নয়।
প্রথমত, বাস্তবতার পরিধি স্পষ্ট করা দরকার। বাংলাদেশে প্রচলিত প্রায় চল্লিশটির মতো নৃগোষ্ঠী ভাষার মধ্যে প্রাথমিকভাবে মাত্র পাঁচটি ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হয়েছে। অর্থাৎ সংখ্যাগত দিক থেকেই উদ্যোগটি সীমিত। বিপুল ভাষিক বৈচিত্র্যের ভেতরে একটি ছোট অংশকে কাঠামোর ভেতরে আনা হয়েছে, বাকিরা রয়ে গেছে নীতিপত্রের বাইরে।
দ্বিতীয়ত, যেসব পাঁচটি ভাষায় বই তৈরি হয়েছে, সেখানেও কার্যকারিতা নিশ্চিত হয়নি শিক্ষক সংকটের কারণে। স্থানীয় ভাষাভাষী, প্রশিক্ষিত শিক্ষক ছাড়া মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। শুধু বই প্রণয়ন নয়, শিক্ষক তৈরি, লিপি-জ্ঞান উন্নয়ন এবং ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ অপরিহার্য।
তৃতীয়ত, পাঠ্যপুস্তক তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। চতুর্থ শ্রেণি থেকে পুরোপুরি বাংলা মাধ্যমে অধ্যয়ন শুরু করতে হয়। এই রূপান্তরকে ঘিরেই অভিভাবকদের উদ্বেগ। তারা আশঙ্কা করেন, শুরু থেকেই বাংলা দক্ষতা গড়ে না তুললে পরবর্তী শ্রেণিতে গিয়ে সন্তান হঠাৎ ভাষাগত চাপে পড়ে পিছিয়ে পড়বে। এই আশঙ্কা বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কহীন নয়। ফলে অনেক পরিবার শুরু থেকেই বাংলাকে অগ্রাধিকার দেয়।
এই তিনটি বাস্তবতা একসাথে রাখলে স্পষ্ট হয়, সমস্যাটি সদিচ্ছার অভাব নয়, কাঠামোগত অসম্পূর্ণতা। প্রায় চল্লিশ ভাষার দেশে পাঁচটিতে সীমিত পাঠ্যপুস্তক, তাও তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত; পর্যাপ্ত মাতৃভাষাভাষী শিক্ষক নেই; চতুর্থ শ্রেণিতে গিয়ে হঠাৎ সম্পূর্ণ বাংলা মাধ্যমে রূপান্তর। এর ফলে পরিবার কৌশলগতভাবে বাংলাকেই নিরাপদ পথ হিসেবে বেছে নেয়। যদি সত্যিকার বহুভাষিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবে পাঠক্রম সম্প্রসারণ, শিক্ষক তৈরির বিনিয়োগ এবং ভাষান্তরের সুস্পষ্ট রূপরেখা একসাথে নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: রিচার্স অ্যান্ড কনটেন্ট এক্সপার্ট, ‘বাংলাদেশের নৃগোষ্ঠী ভাষার ডিজিটাইজেশন’ প্রকল্প, ইবিএলআইসিটি, আইসিটি বিভাগ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার




