Uncategorized

পুঁজির সংকট, শ্রেণিশক্তি ও অনিবার্যতার মিথ

ক্লারা ই. মাত্তের ‘দ্য ক্যাপিটাল অর্ডার’ কৃচ্ছ্রসাধনের অর্থনীতি নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী বই। পড়লে জানা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে যে গণতান্ত্রিক উত্থান, শ্রমিক আন্দোলন এবং সামাজিক পুনর্বণ্টনের দাবি তীব্র হয়ে উঠেছিল, তার মোকাবিলায় শাসকশ্রেণি কীভাবে এক বিশেষ অর্থনৈতিক কৌশল উদ্ভাবন করল। সেই কৌশলের নাম দেওয়া হল ‘অস্টেরিটি’ বা কৃচ্ছ্রনীতি।

যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের ঋণ বেড়েছে, মুদ্রাস্ফীতি ছড়িয়েছে, শ্রমিকশ্রেণি রাজনৈতিক অধিকারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অধিকারও চাইছে। ভোটাধিকার সম্প্রসারিত হয়েছে। সংসদীয় রাজনীতি এখন আর কেবল অভিজাতদের ক্ষেত্র নয়। এই নতুন বাস্তবতায় পুঁজিবাদী শৃঙ্খলা টালমাটাল। সামাজিক ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি সুরক্ষা, জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি; এগুলি যদি স্থায়ী রূপ পায়, তবে সম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং মুনাফার হার প্রশ্নের মুখে পড়বে।

এই প্রেক্ষিতে কৃচ্ছ্রসাধনকে হাজির করা হলো নৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজন হিসেবে। বলা হলো, রাষ্ট্রকে ‘দায়িত্বশীল’ হতে হবে, বাজেট ঘাটতি কমাতে হবে, মুদ্রার মান রক্ষা করতে হবে। কিন্তু এই ভাষ্যের অন্তর্লীন লক্ষ্য ছিল অন্যত্র। জনকল্যাণ ব্যয় সংকোচন, শ্রমিক অধিকার খর্ব করা, সামাজিক দাবিকে ‘অর্থনৈতিক বাস্তবতা’র নামে দমন করা; এই সবের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক চাপে পুঁজিবাদকে রক্ষা করা।

কৃচ্ছ্রনীতি এক রাজনৈতিক প্রকল্প। এর লক্ষ্য রাষ্ট্রীয় নীতিকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা যাতে গণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান পুঁজির আধিপত্যকে বিপন্ন করতে না পারে। ‘বেল্ট টাইটেনিং’ কথাটি তাই বিভ্রান্তিকর। এখানে সবাই সমানভাবে ত্যাগ স্বীকার করে না। ত্যাগের ভার প্রধানত শ্রমজীবী ও নিম্নবিত্ত মানুষের ওপর চাপানো হয়, আর আর্থিক শৃঙ্খলার নামে সম্পত্তির কাঠামো অক্ষত রাখা হয়।

এই অর্থে বইটি কৃচ্ছ্রনীতিকে অর্থনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে পাঠ করতে শেখায়। যুদ্ধোত্তর গণতান্ত্রিক সম্ভাবনাকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পুঁজিবাদী রাষ্ট্র যে পথ বেছে নেয়, তার নামই অস্টেরিটি।

ক্লারা ই. মাত্তেই তাঁর ‘The Capital Order’ বইটি শুরু করেন এক কঠিন দাবির মধ্য দিয়ে। কৃচ্ছ্রনীতি ব্যর্থ হয়নি; বরং যে উদ্দেশ্যে তাকে গড়ে তোলা হয়েছিল, সে কাজই সে করেছে। যদি কেউ মনে করেন অস্টেরিটি মানে কেবল দায়িত্বশীল বাজেট রক্ষা, আর শ্রমজীবী মানুষের ক্ষতি সেখানে অনিচ্ছাকৃত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, তবে মাত্তেই বলবেন; পুরো প্রকল্পটাই আপনি ভুলভাবে পড়ছেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন ও ইতালির অভিজ্ঞতা তাঁর বিশ্লেষণের কেন্দ্র। যুদ্ধোত্তর ইউরোপে শ্রমিক আন্দোলন জোরালো, মজুরি ও সামাজিক অধিকারের দাবি তীব্র, গণতন্ত্রের পরিসর বিস্তৃত। এই মুহূর্তে পুঁজিবাদ কেবল অর্থনৈতিক সংকটে নয়, রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখেও। মাত্তেই দেখান, এই পরিস্থিতিতে কৃচ্ছ্রনীতি তৈরি হয় সংকট মোকাবিলার অভিজাত নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক কৌশল হিসেবে। বাজেট সংকোচন, মজুরি দমন, জনকল্যাণ ব্যয় হ্রাস; সবই এক বৃহত্তর লক্ষ্য পূরণের উপায়: পুঁজির ওপর গণতান্ত্রিক চাপ কমানো।

এটি ইঙ্গিত দেয়, “বাজারের আস্থা” রক্ষার নামে যে ত্যাগের ডাক বারবার শোনা যায়, তা নিছক টেকনোক্র্যাটিক ভুল নয়। এটি শ্রেণির রাজনীতি, অর্থনীতির ভাষায় অনূদিত। ‘দায়িত্বশীলতা’, ‘শৃঙ্খলা’, ‘সংযম’; এই শব্দগুলি ক্ষমতার বিন্যাস পুনর্গঠনের হাতিয়ার।

মাত্তেইর বক্তব্য অনুযায়ী, অস্টেরিটি এক পরিকল্পিত রাজনৈতিক সরঞ্জাম, যা সংকটময় সময়ে পুঁজিবাদকে রক্ষা করতে এবং গণতান্ত্রিক শক্তিকে সীমায়িত করতে ব্যবহৃত হয়েছে।

আমরা সময়ের পরিসরে এই পর্যালোচনায় মাত্তেইর তর্ককে চারটি মূল প্রস্তাবে সংক্ষিপ্ত করব। এই চারটি সূত্র একসঙ্গে পড়লে বোঝা যায়, ক্ষমতার বিন্যাসের এক ইতিহাস লেখা হচ্ছে।

প্রথমত, আধুনিক অর্থনীতি শুরুর দিন থেকেই নিজেকে নিরপেক্ষ জ্ঞানশাস্ত্র হিসেবে দাঁড় করায়নি। বরং সম্পত্তির মালিকগোষ্ঠী এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মৈত্রী গড়ে তুলে নীতিনির্ধারণের প্রধান ভাষা হয়ে ওঠে। কোনটি ‘সম্ভব’, কোনটি ‘অর্থনৈতিকভাবে দায়িত্বশীল’, কোনটি ‘অবাস্তব’; এই বিচার করার ক্ষমতা ক্রমশ অর্থনীতির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। ফলে গণতান্ত্রিক বিতর্কের জায়গা সংকুচিত হয়; শ্রেণিগত স্বার্থ নীতিগত অপরিহার্যতার ভাষায় অনূদিত হতে থাকে।

দ্বিতীয়ত, ১৯১৪ থেকে বিশের দশকের গোড়ার মধ্যে যে কৃচ্ছ্রনীতি গড়ে ওঠে, তা মুদ্রাস্ফীতি বা ঋণসঙ্কটের নিরপেক্ষ প্রতিকার ছিল না। এটি ছিল শ্রমিক শ্রেণির উত্থান ও বিদ্রোহের প্রত্যুত্তর। যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে যখন শ্রমিকরা মজুরি, কাজের শর্ত ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্ন তুলছে, তখন বাজেট সংকোচন, মজুরি নিয়ন্ত্রণ, রাষ্ট্রীয় ব্যয় হ্রাস; এই সব পদক্ষেপের মাধ্যমে সেই শক্তিকে শাসনযোগ্য করে তোলা হয়।

তৃতীয়ত, ব্রিটেন ও ইতালি; দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক পরিসর। একদিকে উদার সংসদীয় ব্যবস্থা, অন্যদিকে ফ্যাসিবাদী শাসন। কিন্তু মাত্তেই দেখান, উভয় ক্ষেত্রেই কৃচ্ছ্রনীতির রূপরেখা আশ্চর্যরকম সাদৃশ্যপূর্ণ। লক্ষ্য একটাই: শ্রমকে শৃঙ্খলিত করা, মুনাফার হার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, পুঁজির ওপর গণচাপ কমানো। শাসনব্যবস্থার ধরন আলাদা হলেও অর্থনৈতিক শাসনের কৌশল প্রায় একই।

চতুর্থত, এই নীতিগুলিকে যে মানসিক কাঠামো বৈধতা দেয়; সমাজে স্তরবিন্যাস স্বাভাবিক, অভিজাতরা স্বভাবতই অধিক সক্ষম, দরিদ্ররা নিজের ঘাটতির জন্য দায়ী; সেই বিশ্বদৃষ্টি আজও অর্থনৈতিক সাধারণবোধের ভিত রচনা করে। ফলে কৃচ্ছ্রনীতির ভাষা বদলায়, কিন্তু তার নৈতিক ভিত্তি টিকে থাকে।

এই প্রেক্ষিতে কৃচ্ছ্রনীতি সমাজ-সংগঠনের এক প্রকল্প; যেখানে অর্থনীতি ব্যবহৃত হয় সামাজিক সম্পর্ক, শ্রেণিসীমা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠনের উপায় হিসেবে।

মাত্তেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর সময়ের ব্রিটেন এবং ইতালিকে বেছে নেন ইচ্ছাকৃতভাবে। রাজনৈতিক কাঠামোতে তারা দূরবর্তী; একদিকে সংসদীয় উদারনীতি, অন্যদিকে দ্রুত ফ্যাসিবাদের দিকে সরে যাওয়া এক রাষ্ট্র। তবু শ্রমিকদের ব্যাপক সংগঠিত উত্থানের মুখে দুই দেশই প্রায় একইরকম আচরণ করে। এই সাদৃশ্যই তাঁর বিশ্লেষণের কেন্দ্র।

পটভূমি ছিল তীব্র বৈষম্যে পূর্ণ। কারখানার পরিবেশ নিষ্ঠুর, দীর্ঘ ঘণ্টার শ্রম, পুরুষ শ্রমিকদের সুরক্ষা প্রায় নেই, নারী ও শিশুদের জন্য সামান্য কিছু আইনগত রক্ষা। লেসে-ফেয়ার পুঁজিবাদের ন্যায্যতা বা স্থিতিশীলতা নিয়ে যে অবশিষ্ট আস্থা ছিল, যুদ্ধ সেটিকে ভেঙে দেয়। রাষ্ট্র নিজেই বাজারে হস্তক্ষেপ করে, উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে, খাদ্য ও জ্বালানি বণ্টন নির্ধারণ করে। ফলে স্পষ্ট হয়ে যায়, অর্থনীতি কখনোই নিছক ‘স্বাভাবিক’ বাজারশক্তির ফল নয়; এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে গঠিত।

এই পরিস্থিতিতে শ্রমিক আন্দোলন তীব্র হয়। ১৯১৭ সালের মে মাসে গ্লাসগোর আশেপাশে প্রায় দুই লক্ষ ধাতুশ্রমিক তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় কাজ বন্ধ রাখেন। একই বছরের গ্রীষ্মে তুরিনে শ্রমিকেরা কারখানা দখল করেন, দোকানপাট লুট হয়, বহু এলাকায় কার্যত শ্রমিকরাই নিয়ন্ত্রণ নেয়। ব্রিটেন ও ইউরোপের নানা প্রান্তে শ্রমিক কাউন্সিল গড়ে ওঠে; ধর্মঘট সংগঠিত করতে, সামাজিক সুরক্ষার দাবি তুলতে, উৎপাদনের ওপর গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন তুলতে।

এই বিদ্রোহী রাজনীতির মুখে সরকারগুলি প্রধানত ছাড় দিয়ে সংকট সামাল দেয়নি। বরং তারা সামনে এনেছে ‘অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞতা’। বাজেট, মুদ্রানীতি, আর্থিক শৃঙ্খলা; এই শব্দগুলি হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অস্ত্র। দাবিকে মোকাবিলা করা হয় সংখ্যার ভাষায়; বিদ্রোহকে শাসন করা হয় অর্থনীতির যুক্তিতে। গণ-আন্দোলনের উত্তাপের জবাব দেওয়া হয় টেকনোক্র্যাটিক হিসাবের ঠান্ডা ভাষায়। এখানেই মাত্তেই দেখান, কৃচ্ছ্রনীতি কেবল অর্থনৈতিক সমন্বয় নয়; এটি ছিল এক সচেতন সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কৌশল।

যুদ্ধের খরচ জোগাতে ব্রিটেন ও ইতালি দু’দেশই বিপুল ঋণ নেয়। যুদ্ধশেষে তাদের সামনে দুটি তাড়া; ঋণদাতাদের আশ্বস্ত করা এবং মুদ্রার মান স্থিতিশীল রাখা। এই প্রেক্ষিতে ব্রিটেনে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্র ক্রমশ সংসদীয় উন্মুক্ত বিতর্ক থেকে সরে গিয়ে কেন্দ্রীভূত হয় ট্রেজারি ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের হাতে। গণতান্ত্রিক আলোচনা পর্দার আড়ালে, আর্থিক কর্তৃত্ব সামনে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম রালফ হট্রি। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী মুদ্রাস্ফীতির মূল কারণ ‘অসংযত’ ভোক্তাদের ব্যয়; অর্থাৎ যুদ্ধকালীন সংগঠনের ফলে যাঁরা কিছু দরকষাকষির ক্ষমতা পেয়েছিলেন, সেই শ্রমিকরাই। ভাষাটি নিরপেক্ষ মনে হলেও এর ভিতরেই শ্রেণিগত ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে। সমস্যা মজুরি বৃদ্ধি বা বাজারের গঠন নয়; সমস্যা শ্রমিকের খরচ করার সামর্থ্য।

নীতিগত পদক্ষেপও সেই দিকেই।

প্রথমত, ঋণসুবিধা কঠোরভাবে সংকুচিত করা হয়। সুদের হার বাড়িয়ে ও ঋণপ্রবাহ কমিয়ে চাহিদা চেপে ধরা হয়; কার্যত ধনী ছাড়া সকলের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত করার লক্ষ্যেই।

দ্বিতীয়ত, সামাজিক সহায়তায় কাটছাঁট। রুটির ভর্তুকি, যা সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তায় সহায়তা করত, তা প্রত্যাহার করা হয়।

তৃতীয়ত, করব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো হয় যাতে বোঝা পড়ে তাদের ওপর, যাঁদের বহন করার সামর্থ্য সবচেয়ে কম।

মাত্তেইর বক্তব্য, এই ফলাফলকে ‘বাজেট ভারসাম্য রক্ষার অনিবার্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ বলা ভুল। এটিই ছিল উদ্দেশ্য। যখন রাষ্ট্র ধনীদের বাইরে সকলের ক্রয়ক্ষমতা চেপে ধরে, তখন শ্রমবাজারে পুনরায় শৃঙ্খলা ফিরে আসে; বেকারত্বের ভয় বাড়ে, দরকষাকষির ক্ষমতা কমে। একই সঙ্গে ঋণদাতাদের কাছে বার্তা যায়: অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ আবার পুঁজির হাতে।

এখানে হিসাবের খাতা গুছোনোই মূল লক্ষ্য ভাবলে ভুল হয়; মূল লক্ষ্য ছিল সামাজিক ভারসাম্য পুনর্গঠন; যেখানে শ্রমের বদলে পুঁজি আবার প্রাধান্য পায়।

ইতালির পথ আরও প্রকাশ্যভাবে নিষ্ঠুর, কিন্তু গঠনগত দিক থেকে ব্রিটেনের সঙ্গে আশ্চর্যরকম সাদৃশ্যপূর্ণ। সংসদ পেনশন, বেকারভাতা, অক্ষমতা বিমা; এমনকি যুদ্ধে আহত সৈনিক ও তাঁদের পরিবারের সহায়তাও কেটে দেয়। সামাজিক অধিকারের পরিধি সংকুচিত হয় দ্রুত ও দৃশ্যমানভাবে।

একই সঙ্গে মজুরি চেপে ধরা হয়। শ্রমিকদের কার্যত মালিকের শর্তে কারখানায় ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়। দরকষাকষির জায়গা সংকুচিত, সংগঠনের শক্তি দুর্বল, আর রাষ্ট্রীয় নীতি সরাসরি পুঁজির পক্ষে অবস্থান নেয়।

এখানে অর্থমন্ত্রী আলবের্তো দে’ স্তেফানির ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি যেমন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ, তেমনি ফ্যাসিবাদী শাসনের গুরুত্বপূর্ণ মুখ। সামাজিক অধিকার হ্রাসকে তিনি অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, নৈতিক কর্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাঁর ভাষায়, “পঙ্গু, অক্ষম, সৈনিকদের অর্জিত অধিকার”; এগুলির সচেতন পরিত্যাগ এক “পবিত্র” কৃচ্ছ্রসাধন। অর্থাৎ ত্যাগকে ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়া হয়; সামাজিক সুরক্ষা ভাঙাকে নৈতিক উন্নতির ভাষায় আচ্ছাদিত করা হয়।

মুসোলিনি তাঁকে অসাধারণ ক্ষমতা প্রদান করেন। প্রতীকী গণতান্ত্রিক আলোচনাও সরিয়ে রেখে অজনপ্রিয় পদক্ষেপ দ্রুত কার্যকর করা হয়। নীতি প্রণয়ন আর জনমতের বিষয় নয়; এটি হয়ে ওঠে নির্বাহী আদেশের প্রশ্ন।

আন্তর্জাতিক অর্থপুঁজি এই পরিস্থিতিতে বিচলিত হয়নি। জে. পি. মর্গ্যানসহ অন্যান্য ঋণদাতা শক্তি স্বৈরতন্ত্রে আপত্তি তোলে না, যতক্ষণ তা পুঁজিসঞ্চয়ের নড়বড়ে স্তম্ভগুলোকে আবার স্থিতিশীল করে। বার্তাটি স্পষ্ট: যদি বিনিয়োগ-অনুকূল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ফ্যাসিবাদ প্রয়োজন হয়, তবে সেটিও গ্রহণযোগ্য।

এই পর্বে কৃচ্ছ্রনীতি হলো সামাজিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের কঠোর প্রক্রিয়া। গণতান্ত্রিক অধিকারের বিনিময়ে পুঁজির আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা; এই সমীকরণেই ইতালির কৃচ্ছ্রনীতি দাঁড়িয়ে থাকে।

রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ মার্ক ব্লাইথের সঙ্গে যুক্ত একটি সমালোচনাধারা বলছে, কৃচ্ছ্রনীতি নিজস্ব ঘোষিত মানদণ্ডেই ব্যর্থ। “স্বল্পমেয়াদি কষ্ট, দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি”; এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে টেকে না। প্রবৃদ্ধি স্থায়ীভাবে আসে না, আর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারও নিশ্চিত হয় না। এই ব্যর্থতাই, ব্লাইথ ও বহু মূলধারার সমালোচকের কাছে, আসল কাহিনি।

মাত্তেই এখানেই যুক্তির ভিত্তি উলটে দেন। তিনি বলেন, আপনি ব্যর্থতা দেখছেন কারণ আপনি অভিজাতদের ঘোষিত যুক্তিকেই সত্য ধরে নিচ্ছেন। যদি কৃচ্ছ্রনীতিকে কেবল প্রবৃদ্ধি বা ঋণসঙ্কোচনের দৃষ্টিতে বিচার করেন, তবে ফলাফল বিভ্রান্তিকর লাগবে। কিন্তু যদি মাপকাঠি বদলান; অর্থাৎ শ্রেণিশক্তির ভারসাম্যে এর প্রভাব দেখেন; তাহলে চিত্রটি ভিন্ন হয়।

তাঁর নথিভুক্ত তথ্য অনুযায়ী, কৃচ্ছ্রনীতির সময় ব্রিটেনে “শোষণের হার”; অর্থাৎ জিডিপির যে অংশ কর্পোরেশন ও বিনিয়োগকারীদের কাছে যায়, শ্রমিকদের নয়; প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি পায়। ইতালিতে এই বৃদ্ধি অর্ধেকেরও বেশি। সংখ্যাগুলি কেবল পরিসংখ্যান নয়; এগুলি ইঙ্গিত করে আয় ও ক্ষমতার প্রবাহ কোনদিকে ঘুরছে।

এই অর্থে কৃচ্ছ্রনীতি তার প্রকৃত লক্ষ্য পূরণ করে। আয় উপরের দিকে সরে যায়, শ্রমের দরকষাকষির শক্তি কমে, মুনাফার অংশ বৃদ্ধি পায়। অর্থনৈতিক সংকোচন, বেকারত্ব, সামাজিক দুর্দশা; এগুলি সিস্টেমের ত্রুটি নয়। এগুলি সেই প্রক্রিয়ার অংশ, যার মাধ্যমে শ্রমিক প্রতিরোধ ভাঙা হয় এবং চুক্তির শর্ত পুঁজির পক্ষে পুনর্নির্ধারিত হয়।

কৃচ্ছ্রনীতিকে যদি কেবল সামষ্টিক অর্থনৈতিক ফলাফলে বিচার করা হয়, তবে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কিন্তু শ্রেণিগত ক্ষমতার স্থানান্তরকে কেন্দ্র করলে দেখা যায়; এটি এক সামাজিক পুনর্বিন্যাসের প্রকল্প, যেখানে কষ্ট কেবল সহ্য করার বিষয় নয়, বরং শাসনের উপায়।

মাত্তেইর মতে কৃচ্ছ্রনীতির দীর্ঘস্থায়িত্ব কেবল নীতিগত কৌশলে নির্ভর করে না; এর পেছনে কাজ করে এক গভীর আদর্শগত রূপান্তর। শ্রেণিবিন্যাসকে রাজনৈতিক নির্মাণ হিসেবে নয়, স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা; এই স্থানান্তরই তাকে টেকসই করে।

এই জায়গায় তিনি মাফেও পান্তালেওনির কথা বলেন, যাকে তিনি ফ্যাসিবাদী কৃচ্ছ্রনীতির “প্রধান প্রকৌশলী” আখ্যা দেন। পান্তালেওনির যুক্তি ছিল সরল কিন্তু কঠোর: নিম্নআয়ের মানুষদের মধ্যে গুণগত ঘাটতি রয়েছে; সেই ঘাটতির ফল তাদের কম আয়। অর্থাৎ কাঠামোগত বৈষম্য নয়, ব্যক্তিগত অক্ষমতাই দারিদ্র্যের কারণ। কারণ-ফল সম্পর্ক উলটে দেওয়া হয়।

ক্লারা ই. মাত্তেই দরিদ্ররা নাকি নিজেদের অক্ষমতা প্রকাশ করে অতিরিক্ত ব্যয়ের মাধ্যমে; মদ, মিষ্টি, চকলেট, বিস্কুট, নানা “ভোগসামগ্রী”-তে। এই ব্যাখ্যায় দরিদ্রের চাহিদা আর মানবিক প্রয়োজন নয়; তা আত্মসংযমহীনতার লক্ষণ। অন্যদিকে উদ্যোক্তাদের চিত্রিত করা হয় “প্রতিভা ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ” হিসেবে, যাদের নির্বাচনের প্রক্রিয়া উদ্যোক্তা করে তোলে। অর্থাৎ সম্পদ ও ক্ষমতা তাদের নৈতিক বা প্রাকৃতিক যোগ্যতার ফল।

ব্রিটেন ও ফ্যাসিবাদী ইতালি; দুই ক্ষেত্রেই অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এই বয়ান মিল খুঁজে পায়। মালিকরা স্বভাবতই উচ্চতর; শ্রমিকরা ত্রুটিপূর্ণ এবং শৃঙ্খলার প্রয়োজন। এই কাঠামো মেনে নিলে দরিদ্রকে শাস্তি দেওয়া বা ধনীদের পুরস্কৃত করা নীতিকে আর পক্ষপাতদুষ্ট মনে হয় না। তা হয়ে ওঠে নিরপেক্ষ, এমনকি কল্যাণকর— কারণ তা নাকি “স্বাভাবিক” সামাজিক শৃঙ্খলার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মাত্তেইর দাবি, ভাষা বদলালেও এই বিশ্বদৃষ্টি আজও টিকে আছে। এখন তা সরাসরি শ্রেণিগত অবমাননার ভাষায় আসে না; বরং মেরিটোক্রেসির রূপ নেয়। শীর্ষে যারা আছে তারা প্রাপ্য বলেই আছে, আর নিচে যারা আছে তারা ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার জন্য সেখানে। এই বয়ান কৃচ্ছ্রনীতির নৈতিক ভিত্তিকে সমর্থন করে, কারণ এটি বৈষম্যকে ন্যায্যতা দেয়।

কৃচ্ছ্রনীতি কেবল বাজেট বা সুদের হার নয়; এটি মানুষের মূল্যায়ন, যোগ্যতা, শৃঙ্খলা; এই ধারণাগুলিকে পুনর্গঠন করে। শ্রেণিকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে প্রকৃতির মধ্যে স্থাপন করাই তার গভীরতম কৌশল।

মাত্তেই-এর জোরালো দাবিই ‘The Capital Order’-কে আজকের দিনে প্রয়োজনীয় করে তুলেছে। তিনি দেখিয়েছেন যে বিংশ শতকের শুরুতে অর্থনীতি, রাষ্ট্রক্ষমতা ও অভিজাত স্বার্থের মধ্যে যে জোট তৈরি হয়েছিল, তা এখনও নীতিনির্ধারণের ভাষা ও পদ্ধতির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।

অর্থনীতি ধীরে ধীরে শাসনের প্রধান ভাষায় পরিণত হয়। সমস্যা কী, কোনটি সংকট, কোনটি সমাধানযোগ্য; সবই অর্থনৈতিক পরিভাষায় নির্ধারিত হতে থাকে। ‘দক্ষতা’ বা efficiency একপ্রকার পবিত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়। এর বাইরে ক্ষমতার প্রশ্ন, শ্রেণিবিন্যাস, বৈষম্য; এই সব প্রসঙ্গ তুললেই তা “অপেশাদার” বা “আদর্শগত” বলে চিহ্নিত হয়। ফলে বিতর্কের ক্ষেত্র সংকুচিত হয় এমনভাবে, যেন নীতির দিকনির্দেশনা কেবল প্রযুক্তিগত গণনার বিষয়।

অন্যদিকে এলিজাবেথ পপ বারম্যান দেখিয়েছেন কীভাবে মধ্য-শতকের আমেরিকায় এক বিশেষ “অর্থনৈতিক যুক্তির ধরন” বিস্তার লাভ করে। নীতিশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, থিংক ট্যাংক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা; সকলেই এমন উপকরণ গ্রহণ করে, যা ব্যয়-সাশ্রয়িতা ও বাজার-প্রতিযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেয়। সমতা, গণতান্ত্রিক কণ্ঠস্বর, বা সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন সেখানে প্রান্তে সরে যায়। এই প্রেক্ষাপটে কৃচ্ছ্রনীতি আর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলে মনে হয় না; তা হয়ে ওঠে অবশ্যম্ভাবী প্রাযুক্তিক প্রয়োজন।

মাত্তেইর গভীর সতর্কবার্তা এখানেই। যখন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হিসেবে দেখা হয়, তখন তার নিজস্ব ইতিহাস আড়াল হয়ে যায়; সেই ইতিহাস যেখানে অর্থনীতি ব্যবহৃত হয়েছে মালিকদের প্রাধান্য রক্ষা করতে। বিংশ শতকের প্রথম দিকের স্থপতিরা তাদের উদ্দেশ্য গোপন করেননি; দরিদ্রদের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ্য ছিল। আজ ভাষা পালটেছে, সুর হয়েছে টেকনোক্র্যাটিক। কিন্তু ফলাফল; আয়ের বণ্টন, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, শ্রমের দুর্বলতা; অচেনা নয়।

মাত্তেই দেখাতে চান: নীতি-আলোচনার বর্তমান কাঠামোকে যদি নিরপেক্ষ মনে করি, তবে আমরা তার শ্রেণিগত উত্তরাধিকারকে দেখতে পাই না। অর্থনীতির ভাষা যতই কোমল হোক, তার দ্বারা নির্মিত সামাজিক ফলাফল আমাদের পরিচিত ইতিহাসের ধারাবাহিকতাই বহন করে।

পর্যালোচনার বয়ানে মাত্তেই শেষ করেন অনিবার্যতার ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। আজকের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা কোনও স্বাভাবিক বা একমাত্র সম্ভাব্য পৃথিবী নয়। এটি ইতিহাসে নির্মিত, এবং তাই পরিবর্তনযোগ্য। নীতির আড়ালে যে অপ্রকাশিত বিশ্বাস কাজ করে; মালিকদের “স্বাভাবিক” কর্তৃত্ব, দক্ষতার অবিসংবাদিত আধিপত্য; সেগুলি চিহ্নিত করতে পারলেই বোঝা যায় অর্থনীতি একমাত্র বিচারক নয়। তাকে তার সীমায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব; গণতান্ত্রিক কথোপকথনের কণ্ঠ হিসেবে, যেখানে দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী, নাগরিক; সকলে অংশ নেবেন।

সমসাময়িক বাজেট কাটছাঁট, কল্যাণব্যবস্থা সংকোচন, বা “রাজস্ব শৃঙ্খলা”-র নামে কঠোর নীতির বিতর্ক যারা দেখছেন, তাঁদের জন্য এই বই একটি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিকোণ দেবে। যখনই শোনা যায়; “বিকল্প নেই”, “অন্য কোনও পথ সম্ভব নয়”; তখন মনে রাখতে হবে, এই ভাষা নতুন নয়। এটি এক শতাব্দী পুরোনো কৌশলের প্রতিধ্বনি, যার লক্ষ্য পুঁজিবাদের সংকট সমাধান করা নয়, বরং তার খরচ সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া।




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button