বয়কটের চক্র ভাঙতে পারবে নতুন বিরোধী দল?

সংসদীয় গণতন্ত্র সত্যিকার অর্থে জনগণের সেবা করতে হলে, ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদল দুই পক্ষের এমপিদের ভূমিকা সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও দলটির মিত্ররা ১৩তম সংসদে বিপুল বিজয়ের পর ট্রেজারি বেঞ্চ দখল করতে যাচ্ছে, তাই তাদের ওপর যথাযথভাবে আলোকপাত হচ্ছে। কিন্তু এখন সময় এসেছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও তাদের মিত্রদের প্রধান বিরোধীদল হিসেবে গঠনমূলক ভূমিকা পালনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার। জাতি এটাই তাদের কাছে প্রত্যাশা করে।
দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাস যদি কোনও পথপ্রদর্শক হয়, তবে আমরা খুব কমই এমন সারগর্ভ বিতর্ক বা কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেখেছি যা ট্রেজারি বেঞ্চ বা সরকারকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রয়োজন। একটি আদর্শ সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দল ‘ছায়াসরকার’ বা ‘অপেক্ষমাণ সরকার’ হিসেবে কাজ করে, যা জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। এর ভূমিকা হলো গঠনমূলক সমালোচনার পাশাপাশি বিকল্প নীতি-কৌশলগুলো সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা।
উল্টো চিত্রটি হলো, বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাস শুরুর দিকের সীমিত বহুদলীয় গণতন্ত্র থেকে ধীরে ধীরে সংঘাতময় রাজনীতি এবং দীর্ঘস্থায়ী সংসদ বয়কটের যুগে প্রবেশ করেছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এক ধরনের ‘অনুগত বিরোধী দলের’ উত্থান দেখা গেছে, যেখানে একদল রাজনীতিবিদ, যারা সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও বিলাসিতার বিনিময়ে তাদের মূল দায়িত্ব ও কঠোর তদারকির ভূমিকা বিসর্জন দিয়েছেন।
জামায়াত ও তার মিত্ররা যদি এই বৃত্ত ভাঙতে না পারে, তবে স্বয়ং সংসদীয় গণতন্ত্রই সবচেয়ে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে অনুপস্থিত গণতান্ত্রিক আদর্শকে সুসংহত করতে হলে দীর্ঘমেয়াদী সংসদ বর্জন এবং ‘অনুগত বিরোধী দল’ হওয়ার পুরনো আমল থেকে আমূল বেরিয়ে আসা অপরিহার্য।
সুযোগ হাতছাড়া করার ইতিহাস
১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল, যেখানে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টিতেই তারা জয়ী হয়। সে সময় বিরোধী দল প্রায় বিলীন হয়ে গেলেও, অবশিষ্ট হাতেগোনা কয়েকজন সদস্য ১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তনের আগে পর্যন্ত সংসদে জোরালো বিতর্কে অংশ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে দ্বিতীয় সংসদে (১৯৭৯-১৯৮২) বিরোধী দলের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক বড়, যা সামরিক আইন প্রত্যাহার এবং বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
তৃতীয় সংসদ (১৯৮৬-১৯৮৮) ছিল স্বল্পস্থায়ী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল না, তবুও এটি এইচ এম এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদে মুখর ছিল। ১৯৮৮ সালের চতুর্থ সংসদ—যা আওয়ামী লীগএবং বিএনপি উভয় দলই বর্জন করেছিল—সেখানে এরশাদ ‘সম্মিলিত বিরোধী দল’ (সিওপি) গঠনে সহায়তা করেছিলেন। এটি ছিল মূলত একটি ‘পাপেট অপজিশন’ বা পুতুল বিরোধী দল, যার লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্রের একটি কৃত্রিম মুখোশ তৈরি করা।
এরশাদের পতনের পর দেশে এক বিশাল জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল। তবে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে এলেও শেষ পর্যন্ত একটি প্রাণবন্ত সংসদ আমরা পাইনি। পঞ্চম সংসদ (১৯৯১-১৯৯৫) বেশ দাপুটে অংশগ্রহণ নিয়ে শুরু হলেও এর যবনিকা ঘটেছিল গণপদত্যাগের মধ্য দিয়ে, যার মূল লক্ষ্য ছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়। এরপর ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ষষ্ঠ সংসদের স্থায়িত্ব ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত; যার একমাত্র কাজ ছিল ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করা এবং এরপরই এর বিলুপ্তি ঘটে।
বয়কটের সংস্কৃতি
সপ্তম সংসদের (১৯৯৬-২০০১) সময় থেকেই দীর্ঘমেয়াদী সংসদ বয়কটের সংস্কৃতিটি আরও পাকাপোক্ত হয়। এটি ছিল মূলত ক্ষমতার হাতবদল মাত্র: যেখানে আগে আওয়ামী লীগ সংসদ বর্জন করতো, সেখানে বিএনপি ঘনঘন ওয়াকআউট করা শুরু করে। এই প্রবণতা চরম আকার ধারণ করে অষ্টম সংসদে (২০০১-২০০৬), যখন আওয়ামী লীগ মোট কার্যদিবসের প্রায় ৬০ শতাংশ সময় সংসদ থেকে অনুপস্থিত ছিল। যদিও নবম সংসদে (২০০৯-২০১৩) বিএনপি সংসদীয় কমিটির সভাগুলোতে অংশ নিয়েছিল, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ নিয়ে উত্তেজনা বাড়লে তারা প্রায় ৭৪ শতাংশ অধিবেশন বর্জন করে।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের আগের সময়টুকু নিয়ে যত কম বলা যায়, ততই ভালো। এই সময়ে ‘অনুগত বিরোধী দলের’ উত্থান শাসকদলকে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা থেকে স্বৈরতন্ত্রের দিকে ধাবিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। এই বন্দোবস্ত উভয় পক্ষের জন্যই ছিল সুবিধাজনক: সরকারি দল পেয়েছিল প্রশ্নাতীত আনুগত্য, আর তথাকথিত বিরোধী দল পেয়েছিল মন্ত্রিসভায় ঠাঁই। এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ ভোটাররা কেবল প্রতারিতই হননি, বরং পুরো ব্যবস্থার ওপরই বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন।
শূন্য থেকে শুরু
দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশের সংসদগুলোতে কোনও সুস্থ ও প্রাণবন্ত বিতর্ক না থাকায় আইনপ্রণেতাদের একটি পুরো প্রজন্ম তৈরি হয়েছে, যারা প্রকৃত সংসদীয় শিষ্টাচার বা আলোচনার ধার ধারেন না। অথচ সংসদীয় বিতর্ক হলো আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি সুশৃঙ্খল এবং আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, যার বৈশিষ্ট্যই হলো বিরোধী মতের মুখোমুখি হওয়া কিন্তু তা হতে হবে নির্দিষ্ট নিয়ম ও কাঠামোর মধ্য দিয়ে।
জামায়াত, এনসিপি এবং ত্রয়োদশ সংসদের অন্যান্য বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের তাই একদম শূন্য থেকে সংসদীয় বিতর্কের একটি কার্যকর সংস্কৃতি গড়ে তোলার কাজ শুরু করতে হবে। তারা যদি আজ এই বীজ বপন করতে পারেন, তবেই ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব একটি কার্যকর গণতন্ত্রের সুফল ভোগ করতে পারবে। তাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে: তারা কি আবারও সেই পুরনো সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনবেন, নাকি জনগণের স্বার্থে ট্রেজারি বেঞ্চ বা সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনবেন?
অপরিহার্য স্তম্ভ
গণতন্ত্রে বিরোধী দল দমন করার মতো কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং এটি শাসনব্যবস্থার এক অপরিহার্য স্তম্ভ। সরকারের ব্যয় এবং কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এর প্রাথমিক দায়িত্ব। আসন সংখ্যার বিচারে জামায়াত এবং এনসিপির নিজেদের ‘দুর্বল’ ভাবার কোনও অবকাশ নেই। সংসদের এক-চতুর্থাংশের বেশি আসন এবং মোট ভোটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পেয়ে তারা এক শক্তিশালী জনসমর্থন বা ম্যান্ডেট বহন করছে।
নতুন সংসদের অধিবেশন বসার আগেই আমরা যা প্রত্যক্ষ করছি, তা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। বিএনপি সংসদ সদস্যদের সংস্কারের শপথ না নেওয়ার অজুহাতে বিরোধী দল নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান বর্জন করেছে। গণতন্ত্রে ভিন্নমত প্রকাশের প্রধান বা স্বয়ংক্রিয় মাধ্যম কেন ‘বয়কট’ হবে, তা বোঝা দুষ্কর। বিরোধী দলগুলোকে আরও বিচক্ষণ হতে হবে এবং যেকোনও মতপার্থক্য বা ভিন্নমত সংসদের ভেতরেই জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে।
তারা এতদূর এসেছেন সংসদ সদস্য হতে এবং বিরোধী দলের বেঞ্চে বসতে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান বয়কট বা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করতে নয়। তাদের কাঁধে এখন অনেক বড় দায়িত্ব। তাদের উচিত মন্ত্রীদের বাধ্য করা যাতে তারা প্রতিটি নীতির যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেন, প্রশাসনের ব্যর্থতাগুলো জনসমক্ষে তুলে ধরেন এবং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দফতরের জন্য নির্দিষ্ট মুখপাত্রসহ একটি ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠন করেন। কেবল সমালোচনা নয়, বরং বিকল্প কর্মসূচি উপস্থাপনের মাধ্যমে তাদের উচিত ভবিষ্যতে ভোটারদের সামনে একটি স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প পথ তুলে ধরা।
একটি ‘অনুগত বিরোধী দল’ গণতন্ত্রের জন্য চরম অপমানের। সংসদ বয়কটের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসাই এখন সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ। আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা এবং নিজেদের ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে এই নতুন বিরোধী দল অবশেষে সেই ভারসাম্য (চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স) তৈরি করতে পারে, যার অভাব বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে তীব্রভাবে অনুভব করছে।
লেখক: সম্পাদক, ঢাকা ট্রিবিউন।



