দেশীয় অর্থনীতি বনাম ইরান যুদ্ধ: উভয়সংকটে ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছেন, তখন তার নিজ প্রশাসনের উপদেষ্টারা তাকে ভোটারদের অর্থনৈতিক উদ্বেগের দিকে মনোনিবেশ করার পরামর্শ দিচ্ছেন। চলতি বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই সামরিক উত্তেজনা ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল সেনা সমাবেশ এবং ইরানের ওপর কয়েক সপ্তাহব্যাপী বিমান হামলার প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আগ্রাসী এই পদক্ষেপ কেন নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে মার্কিন জনগণের কাছে এখন পর্যন্ত কোনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি তিনি।
জনমত জরিপ অনুযায়ী, অধিকাংশ মার্কিনিদের কাছে জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনীতির মতো বিষয়গুলো প্রধান অগ্রাধিকার। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ১৩ মাসেই ট্রাম্পের এজেন্ডায় অভ্যন্তরীণ ইস্যুগুলোকে ছাপিয়ে সামরিক শক্তি প্রদর্শন ও পররাষ্ট্রনীতি জায়গা করে নিয়েছে।
হোয়াইট হাউজের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী মনোভাব সত্ত্বেও ইরানের ওপর হামলার বিষয়ে প্রশাসনের ভেতরে এখনও ‘একীভূত সমর্থন’ নেই। উপদেষ্টারা ভয় পাচ্ছেন, যুদ্ধের দামামা বাজলে অনিবন্ধিত ভোটারদের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে, যারা মূলত অর্থনীতি নিয়ে চিন্তিত।
আগামী নভেম্বরের নির্বাচন নির্ধারণ করবে কংগ্রেসের উভয় কক্ষ ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণে থাকবে কি না। কোনও একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে তা ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির শেষ বছরগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। রিপাবলিকান কৌশলবিদ রব গডফ্রে বলেন, “ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক বিপদ ডেকে আনতে পারে। তার সমর্থকরা ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ শেষ করার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির কারণেই তাকে ভোট দিয়েছিল।”
রিপাবলিকানরা মূলত গত বছর পাস হওয়া কর ছাড়, আবাসন ব্যয় হ্রাস এবং ওষুধের দাম কমানোর সাফল্য নিয়ে প্রচার চালাতে চান। কিন্তু যুদ্ধের আবহ সেই প্রচারকে ম্লান করে দিচ্ছে।
গত মাসে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে উৎখাত করার অভিযানে ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকদের সমর্থন থাকলেও ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। ইরান অনেক বেশি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। ট্রাম্প বারবার ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার টেবিলে আসার হুমকি দিচ্ছেন। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল, যার জবাবে ইরানও কঠোর প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে।
২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের আগে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ যেমন গণবিধ্বংসী অস্ত্রের দোহাই দিয়ে দীর্ঘ জনমত তৈরি করেছিলেন, ট্রাম্পের ক্ষেত্রে তেমন কোনও স্বচ্ছতা দেখা যাচ্ছে না। তিনি কখনও ইরানের বিক্ষোভ দমনের প্রতিবাদে, কখনও পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে, আবার কখনও ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ কথা বলে হামলার হুমকি দিচ্ছেন। তবে বিমান হামলা কীভাবে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করবে, তার কোনও ব্যাখ্যা নেই।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরি ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে ট্রাম্প নিজেই নিজেকে কোণঠাসা করে ফেলেছেন। ইরান যদি বড় কোনও ছাড় না দেয়, তবে হামলা না করলে আন্তর্জাতিকভাবে ট্রাম্পকে ‘দুর্বল’ মনে হতে পারে। আর হামলা করলে দেশের ভেতরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হবে।



