দীর্ঘ ৩৬ বছরের শাসনামলে এর আগে বহুবার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও বিদেশি চাপ সামলেছেন। কিন্তু এবার যেন সব সমীকরণ বদলে গেছে। একদিকে মার্কিন বিমান হামলার হুমকি, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের মিত্রদের পতন; সব মিলিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়তুল্লাহ আলি খামেনি এখন তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সংকটের মুখোমুখি। মার্কিন হামলা এড়াতে ইরানের দূতরা যখন আলোচনায় দৌড়ঝাঁপ করছেন, তখন রণসজ্জা বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
৮৬ বছর বয়সী এই নেতার কট্টর পশ্চিমা-বিরোধিতা এবং ইরানকে রক্ষার মরিয়া চেষ্টা এখন পুরো অঞ্চলের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি খামেনির জন্য মোটেও সুখকর নয়। জানুয়ারিতে দেশজুড়ে হওয়া বিশাল গণবিক্ষোভ দমনে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এর ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় গত বছর ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আঞ্চলিক রাজনীতিতেও তেহরান এখন কোণঠাসা। লেবাননে হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন খামেনির প্রভাবকে সীমিত করে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র দাবি জানিয়েছে যে, ইরানকে তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগ করতে হবে। ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কিছুটা নমনীয়তা দেখালেও খামেনি ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি মনে করেন, ইসরায়েলি হামলা ঠেকানোর জন্য এটাই তেহরানের একমাত্র শক্তিশালী অস্ত্র। তার এই জেদই কি শেষ পর্যন্ত মার্কিন বিমান হামলাকে ত্বরান্বিত করবে? সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
১৯৮৯ সালে ক্ষমতায় বসা খামেনি শুরু থেকেই ছিলেন পশ্চিমের কট্টর সমালোচক। ১৯৮১ সালে এক হত্যা প্রচেষ্টায় ডান হাত পঙ্গু হওয়ার পর থেকে তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ে। তবে নিজের কঠোর আদর্শিক অবস্থানের মাঝেও তিনি প্রয়োজনে কৌশলী হতে জানেন। ২০১৩ সালে তিনি ‘হিরোয়িক ফ্লেক্সিবিলিটি’ বা ‘বীরোচিত নমনীয়তা’ তত্ত্ব দিয়েছিলেন, যার মাধ্যমে অর্থনীতির স্বার্থে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে সমর্থন জানিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আবারও ঘোলাটে হয়ে পড়ে।
খামেনির ক্ষমতার পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী ‘বাসিজ’। ২০০৯, ২০২২ এবং চলতি বছরের জানুয়ারির বিক্ষোভ দমনে এই বাহিনীগুলোকে তিনি নিষ্ঠুরভাবে ব্যবহার করেছেন। এ ছাড়া তার সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ‘সেতাদ’ নামক একটি বিশাল আর্থিক সাম্রাজ্য। বিলিয়ন ডলারের এই প্রতিষ্ঠানটি রেভল্যুশনারি গার্ডের অর্থায়নে বড় ভূমিকা রাখে।
একসময় দুর্বল উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য হওয়া খামেনি আজ ইরানের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সামরিক হুমকি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের পতনের মুখে খামেনির এই দীর্ঘ শাসনকাল এখন এক বড় অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন।




