ভাইয়ের কেলেঙ্কারিতে কি টলমল চার্লসের সিংহাসন?

লন্ডন ফ্যাশন উইকের জমকালো আয়োজনে বৃহস্পতিবার যখন রাজা তৃতীয় চার্লস ডিজাইনারদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছিলেন, তখন তার মন সম্ভবত পড়ে ছিল ১০০ মাইল দূরে স্যান্ড্রিংহামের উড ফার্মে। কারণ, ঠিক সেই সকালেই তার নিজের ভাই প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে ‘সরকারি পদে থেকে অসদাচরণ’ ও তথ্য পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রাজার সিংহাসনে বসার পর থেকে যত পরিকল্পনা ছিল, ভাইয়ের এই নজিরবিহীন কেলেঙ্কারি তা ধূলিসাৎ করে দেওয়ার উপক্রম করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক পর্যালোচনায় এমন চিত্র উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৬৮৮ সালের গৌরবময় বিপ্লব কিংবা ১৬৪৭ সালে রাজা প্রথম চার্লসের বন্দিত্বের পর ব্রিটিশ রাজপরিবার আর কখনও এত বড় সংকটে পড়েনি। এমনকি প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যু বা ১৯৩৬ সালের সিংহাসন ত্যাগের সংকটের চেয়েও এটি বর্তমান রাজতন্ত্রের জন্য বেশি হুমকিস্বরূপ। কারণ, এটি রাজপরিবারের স্বচ্ছতা, অর্থায়ন ও খোদ জনমতের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
নিজের ৬৬তম জন্মদিনে অ্যান্ড্রুকে নরফোকের এস্টেট থেকে সাধারণ পোশাকে আসা পুলিশ কর্মকর্তারা আটক করে আইলেশ্যাম থানায় নিয়ে যান। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ব্রিটিশ সরকারের জন্য সংগৃহীত ব্যবসা সংক্রান্ত গোপন তথ্য ব্যক্তিগত স্বার্থে পাচার করেছেন। জিজ্ঞাসাবাদের পর সন্ধ্যায় যখন তিনি মুক্তি পান, ক্যামেরার ফ্ল্যাশে তার বিধ্বস্ত ও আতঙ্কিত মুখচ্ছবি ধরা পড়ে। সাংবাদিকরা একে যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধীদের জনসমক্ষে হাঁটিয়ে নেওয়ার প্রথা ‘পার্প ওয়াক’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন।
সম্প্রতি প্রকাশিত জেফরি এপস্টেইন ফাইল অ্যান্ড্রুর বিপদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০১৯ সালে বিবিসি-কে দেওয়া সেই কুখ্যাত সাক্ষাৎকারে তিনি যা যা অস্বীকার করেছিলেন, যেমন ভার্জিনিয়া জুফ্রে-র সঙ্গে পরিচয় বা এপিস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ, তার সবই এখন মিথ্যা প্রমাণিত হচ্ছে। এমনকি তার কথিত ‘ঘাম হয় না’ বা পিৎজা এক্সপ্রেসে যাওয়ার গল্পগুলোও এখন হাস্যরসে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এপস্টেইনের মাধ্যমে পাচার হওয়া কিশোরীরা যখন ব্যক্তিগত জেটে স্ট্যানস্টেড বা লুটন বিমানবন্দরে নামত, তখন রাজকীয় প্রভাব খাটিয়ে তাদের কি বিনা পাসপোর্টে ছেড়ে দেওয়া হতো? সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন ইতোমধ্যে এ বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
আদালত অবমাননার ভয়ে রাজা চার্লস দ্রুত একটি বিবৃতিতে জানিয়েছেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, অ্যান্ড্রুর বিলাসিতা ও অসদাচরণের কথা দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে থাকলেও কেন আগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? রানি এলিজাবেথ তার প্রিয় সন্তানকে রক্ষা করতে গিয়ে চার্লসের উত্তরাধিকারের অর্থে অ্যান্ড্রুর ঋণ শোধ করেছেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে। এখন অ্যান্ড্রুর রাজকীয় পদবি বা সামরিক র্যাঙ্ক কেড়ে নেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক দেরি বলে মনে করছেন অনেকে।
ইপসোস-এর সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, ২৫ শতাংশ মানুষ এখন রাজতন্ত্র বিলোপের পক্ষে, যা ১০ বছর আগের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। ৫০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, আগামী ৫০ বছরের মধ্যে ব্রিটেনে আর রাজতন্ত্র থাকবে না।
ভিক্টোরীয় সংবিধান বিশেষজ্ঞ ওয়াল্টার বেজহট বলেছিলেন, রাজতন্ত্রের রহস্যময় জাদুর ওপর আলোকপাত করা বিপজ্জনক। এখন জনসমক্ষে অ্যান্ড্রুর কেলেঙ্কারির যে তীব্র আলো পড়েছে, তাতে সেই ‘ম্যাজিক’ ম্লান হয়ে রাজতন্ত্রের অস্তিত্বই কি সংকটে পড়বে?



