ট্রাম্পের হুমকি ও যুদ্ধের দামামা: অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সামরিক চাপ আর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া ‘১৫ দিনের’ আলটিমেটামের মুখে বহুমুখী কূটনৈতিক ও সামরিক তৎপরতা শুরু করেছে ইরান। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর রাজধানী, সর্বত্রই এখন তেহরানের দৌড়ঝাঁপ। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল রুটিনমাফিক কূটনীতি নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’ বা যুদ্ধ এড়ানোর অন্তিম চেষ্টা। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর এ খবর জানিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, একটি ‘অর্থবহ চুক্তিতে’ পৌঁছানোর জন্য তেহরানের হাতে বড়জোর ‘১০ থেকে ১৫ দিন’ সময় আছে। চুক্তি না হলে ‘ভয়াবহ কিছু ঘটবে’ বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। এই হুমকির সমান্তরালে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও যুদ্ধের প্রস্তুতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তেহরানের জন্য ট্রাম্পের এই সময়সীমা ও সামরিক মহড়া একটি পুরোনো ক্ষতকে জাগিয়ে তুলেছে। ২০২৫ সালের জুন মাসে ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের সময়ও ট্রাম্প কূটনীতির জন্য ৬০ দিনের সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। ঠিক ৬১তম দিনে শুরু হয়েছিল ভয়াবহ যুদ্ধ। ইরানি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে সেই তুলনা না টানলেও দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলোতে ওই নজির নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
বৃহস্পতিবার জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাইদ ইরাভানি নিরাপত্তা পরিষদে চিঠি লিখে ‘সামরিক আগ্রাসনের বাস্তব ঝুঁকি’ নিয়ে সতর্ক করেছেন। ট্রাম্পের বক্তব্যকে জাতিসংঘ সনদের ‘নগ্ন লঙ্ঘন’ আখ্যা দিয়ে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, কোনও হামলা হলে ইরান তার ‘যথাযথ ও চূড়ান্ত’ জবাব দেবে। সেক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত সব মার্কিন ঘাঁটি, স্থাপনা এবং সম্পদ ইরানের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি একদিকে যেমন জেনেভায় মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার পরোক্ষ আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন, অন্যদিকে আঞ্চলিক ও বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রাখছেন। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভকে পারমাণবিক আলোচনার অগ্রগতি জানিয়েছেন আরাঘচি। নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়ার সমর্থন তেহরানের জন্য বড় ভরসা। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সৌদি আরব ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গেও কথা বলেছেন তিনি। বিশেষ করে সৌদি আরব কোনোভাবেই চায় না এই অঞ্চলে আরেকটি যুদ্ধের ফলে জ্বালানি বাজার অস্থিতিশীল হোক।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের দেওয়া ‘ডেডলাইন’ বা সময়সীমার কথা অস্বীকার করলেও ইরানের ভেতর পরিস্থিতি ভিন্ন। রেভ্যুলশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) সংশ্লিষ্ট তাসনিম নিউজ বলছে, ওয়াশিংটন থেকে আসা বিপরীতধর্মী সংকেত, কখনও আশাবাদ, কখনও যুদ্ধের হুমকি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
একদিকে যখন জেনেভায় কূটনৈতিক টেবিলে ‘উইন-উইন’ বা উভয় পক্ষের জয় হয় এমন চুক্তির খসড়া হচ্ছে, অন্যদিকে আইআরজিসি হরমুজ প্রণালিতে নৌ-মহড়া চালাচ্ছে। উদ্দেশ্য স্পষ্ট, যুদ্ধ শুরু হলে সমুদ্রপথে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করার হুমকি দিয়ে ওয়াশিংটনকে চাপে রাখা।
ইরানি কৌশলবিদদের মতে, লক্ষ্য এখন কেবল সংঘাত এড়ানো নয়, বরং সংঘাত শুরু হলেও তার ব্যাপ্তি নিয়ন্ত্রণ করা এবং শাসনব্যবস্থার পতন ঠেকানো। তেহরানের বর্তমান অবস্থানকে ‘ঝুলন্ত তলোয়ারের’ নিচে বসবাসের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।
ইরান একদিকে যেমন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও সীমিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বজায় রেখে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী, অন্যদিকে কোনও আলটিমেটামের মুখে মাথানত করে নিজেদের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিতেও রাজি নয়। কূটনৈতিক টেবিলে নমনীয়তা আর যুদ্ধের ময়দানে কঠোর প্রস্তুতির এক সংমিশ্রিত নীতি নিয়ে এগোচ্ছে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি।



