‘চার বছর ধরে গোছানো স্যুটকেস’, এখনও ফেরার অপেক্ষায় ইউক্রেনীয় শরণার্থীরা

পোল্যান্ডের একটি অ্যাপার্টমেন্টে তিনটি স্যুটকেস গুছিয়ে রেখেছেন মারিনা বোনদারেঙ্কো। চার বছর আগে যখন তিনি কিয়েভ থেকে পালাচ্ছিলেন, ভেবেছিলেন মাস দুয়েকের মধ্যেই শান্তি ফিরবে, তিনিও ঘরে ফিরবেন। কিন্তু সেই ‘দু-মাস’ আজ চার বছরে ঠেকেছে। ইউক্রেনে শান্তি ফেরেনি, মারিনার স্যুটকেসগুলোও আর খোলা হয়নি।
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার সর্বাত্মক আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর মারিনার মতো ৫০ লাখের বেশি ইউক্রেনীয় ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটিই ইউরোপের সবচেয়ে বড় শরণার্থী সংকট। তাদের একটি বড় অংশই আশ্রয় নিয়েছেন মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে।
ইউক্রেনে সামরিক আইন জারি থাকায় যুদ্ধ করার বয়সী পুরুষদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে শরণার্থীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই নারী ও শিশু। ৫১ বছর বয়সী সাংবাদিক মারিনা বর্তমানে পোল্যান্ডে ইউক্রেনীয় সংবাদমাধ্যমে কাজ করছেন। তার স্বামী আন্দ্রি দুদকো এখন রণাঙ্গনে ড্রোন অপারেটর হিসেবে কাজ করছেন।
মারিনা বারবার দেশে ফেরার পরিকল্পনা করলেও রাশিয়ার আকাশপথের হামলা সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা যাওয়ার প্রস্তুতি নিই, আর তখনই শুরু হয় বড় কোনও হামলা। আবার যখন ভাবি যাব, তখন হাড়কাঁপানো শীত আসে; বিদ্যুৎ, পানি বা হিটিং থাকে না। এই রকেট হামলার নিচে আমি আমার সন্তানকে নিয়ে যেতে পারি না।”
ইউক্রেন সরকারের আশা, যুদ্ধ শেষ হলে বিদেশে থাকা ৭০ শতাংশ মানুষ দেশে ফিরবেন। কিন্তু জরিপ বলছে, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই ফেরার আগ্রহ কমছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে ইউক্রেন এখন এক ঝাপসা স্মৃতি। মারিনার ১১ বছর বয়সী ছেলে দানিলো পোল্যান্ডেই থিতু হতে চায়। সে জানায়, ইউক্রেনের কোনও বন্ধুর কথা তার এখন আর মনে নেই।
খারকিভের দুই বান্ধবী ইরিনা কুশনির ও ওলগা ইয়েরমোলেঙ্কো এখন ইস্তাম্বুলে বাস করছেন। ইরিনা তুরস্কের এক নাগরিককে বিয়ে করেছেন এবং ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। তিনি বলেন, “সবার মতো আমিও ফিরতে চেয়েছিলাম, কিন্তু জীবন এখন অন্য খাতে বইছে।”
অন্যদিকে ওলগা তুরস্ক থেকে ইউক্রেনীয় ক্লায়েন্টদের জন্য কাজ করছেন। তিনি প্রতিনিয়ত টেলিগ্রামে নিজের শহর খারকিভের খবর দেখেন। ওলগা বলেন, “যখন দেখি আমার বাড়ির দিকে মিসাইল উড়ে আসছে, তখন আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। দ্রুত মাকে ফোন দিই তিনি ঠিক আছেন কি না তা জানতে।”
পোল্যান্ডের ওয়ারশ বা ক্রাকোর মতো শহরগুলোতে বড় বড় ইউক্রেনীয় জনপদ গড়ে উঠলেও স্থানীয়দের সঙ্গে মাঝেমধ্যে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে। কর্মসংস্থান ও সরকারি সুবিধা নিয়ে স্থানীয়দের অসন্তোষ থাকলেও মারিনাদের মতো লাখো শরণার্থী এখনো প্রতিদিন স্যুটকেস পাহারায় বসে থাকেন, যদি কোনোদিন ঘরে ফেরা যায়।
সূত্র: রয়টার্স



