Uncategorized

চার বছর পরও ইউক্রেন যুদ্ধে ভুল হিসাবের মাশুল দিচ্ছে রাশিয়া

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে ইউক্রেনে সর্বাত্মক হামলা শুরুর সিদ্ধান্ত এখনও রাশিয়ার জন্য এক কৌশলগত ভুল হিসাবের প্রতীক। চার বছর পেরিয়ে যুদ্ধ রক্তক্ষয়, অর্থনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক অবস্থান; সব ক্ষেত্রেই মস্কোর জন্য বড় মাশুল বয়ে এনেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে।

কিয়েভের এক হোটেলের ছাদে দাঁড়িয়ে তখনও অনেকের বিশ্বাস ছিল, সীমান্তে সেনা সমাবেশ সত্ত্বেও এমন পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ কল্পনা করা কঠিন। ভ্লাদিমির পুতিন চেচনিয়া, জর্জিয়া, সিরিয়া ও ক্রিমিয়ায় সামরিক শক্তি প্রয়োগে তুলনামূলক কম ক্ষয়ক্ষতিতে সাফল্য পেয়েছিলেন। কিন্তু ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ যে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, সেটি স্পষ্ট ছিল।

১০ দিনের পরিকল্পনা, ১৪৫০ দিনের যুদ্ধ

লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরু করার সময় ক্রেমলিনের ধারণা ছিল ১০ দিনের মধ্যেই ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যাবে।

কিন্তু ১ হাজার ৪৫০ দিনের বেশি সময় পর সেই সময়সীমা আজ সরল ও ভুল হিসাব হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, ইউক্রেন খুব দুর্বল বা বিশৃঙ্খল বলে যে ধারণা, তাও ছিল ভ্রান্ত। একই সঙ্গে অজেয় বলে পরিচিত রাশিয়ার বিশাল সামরিক শক্তির ভাবমূর্তিও আঘাত পেয়েছে।

প্রাণহানির ভয়াবহ হিসাব

রাশিয়ায় তথ্য নিয়ন্ত্রণ কঠোর হওয়ায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব গোপন রাখা হয়েছে। তবে বিভিন্ন সূত্রের অনুমান বলছে, প্রাণহানি অত্যন্ত বেশি।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, সর্বাত্মক আগ্রাসনের পর থেকে প্রায় ১২ লাখ রুশ সেনা নিহত বা আহত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার নিহত।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনও বড় শক্তির কোনও যুদ্ধে এত বেশি হতাহত হয়নি। এতে ইউক্রেনের ক্ষয়ক্ষতি ধরা হয়নি, যা ৫ থেকে ৬ লাখের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়ই এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেন। যুদ্ধ পঞ্চম বছরে প্রবেশ করলেও হতাহতের সংখ্যা কমার বদলে বাড়ছে। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা সম্প্রতি দাবি করেছেন, শুধু ডিসেম্বরেই ৩৫ হাজার রুশ সেনা নিহত হয়েছে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ বলেছেন, লক্ষ্য হলো নতুন নিয়োগের চেয়ে দ্রুত রুশ সেনাদের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ানো।

যুদ্ধ অর্থনীতির চাপ

মস্কো শহরের বাহ্যিক চিত্রে যুদ্ধের প্রভাব স্পষ্ট নয়। দোকান, ক্যাফে, যানজট; সবই স্বাভাবিক। ২০২২ সালের নিষেধাজ্ঞার ধাক্কার পর সামরিক ব্যয় বাড়িয়ে রাশিয়া অর্থনীতি চাঙা রাখার চেষ্টা করে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাশিয়া বিশ্বের নবম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে, যা যুদ্ধের আগে ছিল একাদশ।

তবে যুদ্ধ অর্থনীতির বিকৃতির লক্ষণও বাড়ছে। সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বড় অঙ্কের বোনাস ও নিহতদের পরিবারকে আরও বেশি ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে। সামরিক শিল্পে অগ্রাধিকার দেওয়ায় অন্যান্য খাতে শ্রমিকসংকট দেখা দিয়েছে। ক্রেমলিনপন্থি পত্রিকা নেজাভিসিমায়া গাজেতা একে ‘তীব্র শ্রমিকসংকট’ বলে আখ্যা দিয়েছে। প্রায় ৮ লাখ দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিও ভোক্তাদের চাপে ফেলেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডিসেম্বরের পর থেকে শসার দাম দ্বিগুণ হয়েছে। অনলাইনে এক নারী লিখেছেন, আগে ডিম ছিল ‘স্বর্ণের’, এখন শসা।

ন্যাটো বিস্তার ও আন্তর্জাতিক অবস্থান

ন্যাটো সম্প্রসারণ ঠেকানো ছিল আক্রমণের ঘোষিত কারণগুলোর একটি। কিন্তু সর্বাত্মক যুদ্ধের পর ন্যাটো-তে যোগ দিয়েছে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড। বিশেষ করে ফিনল্যান্ডের যোগদানে রাশিয়া-ন্যাটো স্থলসীমা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার ফলে রাশিয়া পূর্বমুখী হয়েছে। বিশেষ করে চীনের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ইউরোপীয় নীতি বিশ্লেষণ কেন্দ্র সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান পলিসি অ্যানালাইসিস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্পর্ক ভারসাম্যহীন, মস্কো বেইজিংয়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল।

২০২৪ সালে বিদ্রোহীদের চাপে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হলে রাশিয়া তাকে সরিয়ে নিয়ে আশ্রয় দেয়। মধ্যপ্রাচ্যে আরেক মিত্র ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সময়ও মস্কো কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল।

এছাড়া গত মাসে কারাকাসে নিজ শয়নকক্ষ থেকে মার্কিন বাহিনীর অভিযানে গ্রেফতার হন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। তিনি ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত।

ভুল হিসাবের দীর্ঘ ছায়া

চার বছরের এই ক্ষয়ক্ষতির যুদ্ধে ইউক্রেন যেমন ভয়াবহ মূল্য দিচ্ছে, তেমনি রাশিয়াও ঘরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুর্বল হয়েছে।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনেকেই ভাবেননি, পুতিন সর্বাত্মক আগ্রাসনের নির্দেশ দেবেন। কিন্তু সিদ্ধান্তের ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে যে আশঙ্কা ছিল, চার বছর পর তা নির্মমভাবে সত্য প্রমাণিত হয়েছে ইউক্রেনের জন্য এবং রাশিয়ার জন্যও।

 




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button