বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ফুটবল

ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য রাজস্থানের পদমপুরা গ্রাম। তপ্ত গ্রীষ্মের এক বিকেলে ১৪ বছর বয়সী নিশা বৈষ্ণব এবং তার ১৯ বছর বয়সী দিদি মুন্না মাঠে ফুটবল অনুশীলনে ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ তারা লক্ষ্য করেন, পাঁচজন অচেনা ব্যক্তি তাদের ছবি তুলছেন। পরে নিশা জানতে পারেন, ওই পরিবারটি তাদের ছেলের জন্য কনে খুঁজছে।
নিশার মা লালি ওই বিয়ের প্রস্তাবে বেশ উৎসাহী ছিলেন। অতিথিরা বাড়িতে এলে মাকে সম্মান জানিয়ে তাদের পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে বলা হয় নিশাকে। কিন্তু নিশা সাফ জানিয়ে দেন, ‘আমি পারব না।’
এটি কেবল নিশার একার জেদ নয়; বরং রাজস্থানের রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় ফুটবলকে হাতিয়ার করে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে দুই বোনের এক নীরব বিপ্লবের গল্প।
ভারতে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ে এবং ২১ বছরের কম বয়সী ছেলেদের বিয়ে করা দণ্ডনীয় অপরাধ। তাসত্ত্বেও ইউনিসেফের তথ্যমতে, ভারতে প্রায় ২৫ শতাংশ নারীর বিয়ে হয়ে যায় আইনি বয়সের আগেই। রাজস্থানে এই হার জাতীয় গড়ের চেয়েও বেশি।
২০২২ সালে নিশা ফুটবলের আঙিনায় পা রাখেন দিদি মুন্নার হাত ধরে। মুন্না ফুটবল ফর ফ্রিডম প্রকল্পের মাধ্যমে এই খেলার খোঁজ পান। এই প্রকল্পের লক্ষ্য খেলাধুলার মাধ্যমে মেয়েদের স্বাবলম্বী করা। গ্রামে হাফপ্যান্ট পরে মাঠে নামা ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। মুন্না বলেন, ‘শুরুতে গ্রামের নারীরা আমাদের দিকে আঙুল তুলে বলতেন, দেখো দেখো, মেয়েরা পা বের করে ঘুরছে। আমরা তাদের পাত্তা দিইনি।’
নিশা খেলায় দ্রুত উন্নতি করেন এবং ২০২৪ সালে জাতীয় ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে রাজস্থান রাজ্য দলের হয়ে খেলার সুযোগ পান। বিদ্রোহের প্রতীক হিসেবে তিনি নিজের চুলও ছোট করে ফেলেন।
২০২৫ সালে নিশা ও মুন্নার জন্য একটি যৌথ বিয়ের প্রস্তাব আসে। তাদের বাবা যখন নিশাকে জিজ্ঞেস করেন, ফুটবল মাঠে কি কোনও প্রেমিক তার জন্য অপেক্ষা করে? নিশা উত্তর দিয়েছিলেন, ‘সেখানে কোনও প্রেমিক নেই। আমি ফুটবল খেলতে যাই, ফুটবলই আমার ভালোবাসা।’
মেয়েদের বিয়ের পেছনে দারিদ্র্য ও কুসংস্কার বড় কারণ হিসেবে কাজ করে। নিশার মা লালি নিজেও একজন ‘শিশু কনে’ ছিলেন। তার বড় মেয়ের বিয়েও হয়েছে ১৬ বছর বয়সে। লালি বলেন, ‘গ্রামের মানুষ ভয় পায় যে বিয়ে না দিলে মেয়েরা খারাপ পথে যাবে বা ছেলেদের সঙ্গে পালিয়ে যাবে।’ আইনি জটিলতা এড়াতে তারা গোপনে বিয়ে দেন, কোনও দাওয়াতপত্রও ছাপান না।
ফুটবল ফর ফ্রিডম-এর পদ্মা যোশি জানান, ২০১৬ সাল থেকে তারা ১৩টি গ্রামের প্রায় ৮০০ মেয়েকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তারা সরাসরি বাল্যবিবাহ বন্ধের কথা না বলে অভিভাবকদের ফুটবল খেলার সুফলের কথা বোঝান। কারণ রাজস্থানসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সরকারি চাকরিতে খেলোয়াড়দের জন্য কোটা সংরক্ষিত থাকে।
পদ্মা যোশি বলেন, ‘আমরা অভিভাবকদের বোঝাই যে, ভালো ফুটবল খেললে মেয়েদের সরকারি চাকরি পাওয়ার সুযোগ বাড়বে। এতে তারা পরিবারের বোঝা না হয়ে সম্পদ হয়ে উঠবে।’
১৫ বছর বয়সী নিশা বর্তমানে স্কুলে পড়ছেন। তার স্বপ্ন একদিন ভারতের জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামা। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে ক্রীড়া কোটায় একটি সরকারি চাকরি জোগাড় করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হওয়া।
অন্যদিকে মুন্না এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন এবং ছোট মেয়েদের ফুটবলের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। মুন্না বলেন, ‘আমি তাদের বিয়ে বন্ধ করতে পারি বা না পারি, আমি চাই তারা জীবনে কিছু একটা হোক এবং নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করুক।’
ফুটবল মাঠের এই লড়াই এখন পদমপুরার আরও অনেক মেয়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে, যারা মাঠের ঘাসে নিজেদের ভবিষ্যতের ঠিকানা খুঁজছে।
ব্রিটিশ সংবদমাধ্যম বিবিসি অবলম্বনে।



