বাংলাদেশের পোশাক খাতে মাল্টি-মিলিয়ন পাউন্ডের নতুন বাজার

বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলোর প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে সাশ্রয়ী ফ্যাশন জায়ান্ট প্রাইমার্কের সঙ্গে কলিন রুনির মাল্টি-মিলিয়ন পাউন্ডের চুক্তি বিশ্ব ফ্যাশন জগতের নজর কেড়েছে বাংলাদেশের ওপর। কলিন রুনির এই নতুন পার্টনারশিপ বাংলাদেশের হাই-টেক ফ্যাক্টরিগুলোতে উৎপাদন ও প্রযুক্তির আধুনিকায়নে বড় ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে। মূলত প্রাইমার্কের বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের ৯৪ শতাংশই বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই চুক্তির সুফল সরাসরি পাচ্ছে এদেশীয় পোশাক খাত।
নেপথ্যে বাংলাদেশের সক্ষমতা
২০২৬ সালের মার্চ মাসে কলিন রুনি তার বিশেষ ‘অ্যাথলেইজার’ কালেকশন বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই গ্ল্যামারের আড়ালে আসল গল্পটি তৈরি হচ্ছে সাভার ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলগুলোতে। ২০২৫-২০২৬ সালের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনও প্রাইমার্কের বৃহত্তম সোর্সিং গন্তব্য। গত অর্থবছরে এই রিটেইল জায়ান্ট বাংলাদেশ থেকে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের পোশাক ক্রয় করেছে। এই নতুন কালেকশনের ক্রয় আদেশ বাংলাদেশের লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করছে, যার ৬০ শতাংশেরও বেশি নারী।
টেকসই ও উচ্চমূল্যের পোশাকের দিকে যাত্রা
ফাস্ট-ফ্যাশন বিশ্বে প্রাইমার্কের বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীলতা অতুলনীয়। বিশ্বজুড়ে ১৭টি দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করলেও প্রাইমার্কের সিংহভাগ ইনভেন্টরি আসে বাংলাদেশ থেকেই। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছর শেষে প্রাইমার্কের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যাসোসিয়েটেড ব্রিটিশ ফুডস (এবিএফ) জানিয়েছে, তাদের পোশাক লাইনের প্রায় ৭৪ শতাংশ এখন রিসাইকেল করা বা টেকসই তন্তু থেকে তৈরি— যার বড় একটি অংশ সরবরাহ করছে বাংলাদেশের কারখানাগুলো। প্রতি বছর এই অঞ্চল থেকে প্রাইমার্কের সোর্সিং ৫ থেকে ৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাধারণ টি-শার্ট থেকে বেরিয়ে এখন কলিন রুনির বিশেষায়িত ‘অ্যাথলেইজার’ পোশাক তৈরির মতো উচ্চ-মূল্যের কাজে যুক্ত হচ্ছে এদেশীয় কারখানাগুলো।
সার্কুলার ফ্যাশনের রূপান্তর
এই ‘রুনি ইফেক্ট’ ঢাকার পোশাক কারখানার প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের সাথে মিলে গেছে। নতুন এই সংগ্রহের চাহিদা মেটাতে প্রাইমার্ক বাংলাদেশের ৯৭টি কারখানাকে তাদের বিশেষ ‘রিসোর্স এফিসিয়েন্সি’ প্রোগ্রামের আওতায় এনেছে। এই উদ্যোগের ফলে ইতোমধ্যে ৮ লাখ ৮০ হাজার ঘনমিটার পানি সাশ্রয় হয়েছে। ২০২৬ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন সামনে রেখে বাংলাদেশ এখন ‘সস্তা শ্রম’ থেকে বেরিয়ে ‘ভ্যালু-ড্রিভেন’ বা ‘মানসম্পন্ন অংশীদারত্বের’ দিকে ঝুঁকছে। অর্থাৎ, কলিন রুনির কালেকশনটি তৈরি হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম সেরা পরিবেশবান্ধব বা লিড (এলইইডি) সার্টিফাইড গ্রিন ফ্যাক্টরিগুলোতে।
আরএমজি খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই কোলাবরেশন বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য একটি ‘দ্বিমুখী রূপান্তর’। ২০২৬ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের আরএমজি বাজার ২০৩৩ সাল নাগাদ ৪ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলারের মূল্যায়নে পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বিজিএমইএ এবং শিল্প উদ্যোক্তারা এখন প্রাইমার্কের সাথে নন-কটন বা কৃত্রিম তন্তুর দামী পোশাক তৈরির বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। কলিন রুনি রেঞ্জের সাফল্যই বলে দেবে বাংলাদেশ কি কেবল বাজেট ব্র্যান্ডের নির্মাতা হয়ে থাকবে, নাকি উচ্চ-মানের টেকসই ফ্যাশনেও বিশ্বকে সম্ভাবনা ছড়িয়ে নেতৃত্ব দেবে।



