শুল্ক কমাতে ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি করে বিপাকে এশিয়ার অনেক দেশ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করে উচ্চ শুল্কের হুমকি এড়িয়েছিল জাপান, ইন্দোনেশিয়াসহ এশিয়ার অনেক দেশ। কিন্তু মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের পর এখন প্রশ্ন উঠেছে, কে জিতল, আর কে হারল? মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস এ খবর জানিয়েছে।
সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্পের জন্য এটি ছিল বাণিজ্যের জয়ের সপ্তাহ। মঙ্গলবার জাপান যুক্তরাষ্ট্রে ৩৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাত মার্কিন কোম্পানির জন্য খুলে দেওয়ার চুক্তি সই করেন। এসব ছিল ট্রাম্পের হুমকি দেওয়া বিশাল শুল্কের (জাপানের ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে ৩২ শতাংশ) মুখে করা চুক্তি। ট্রাম্প এগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আবার জয়ী হওয়া’র প্রমাণ বলে ঘোষণা করেন।
কিন্তু সপ্তাহের শেষে চিত্র পাল্টে যায়। শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শাস্তিমূলক শুল্কের আইনি ভিত্তি বাতিল করে দেয়। এর পর ট্রাম্প বলেন, অনেক চুক্তি বহাল থাকবে, তবে কিছু না থাকলে অন্য শুল্ক আরোপ করা হবে।
এশিয়ায় বিশ্বের অধিকাংশ পণ্য উৎপাদিত হয়। সরকারগুলো ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি করতে তড়িঘড়ি করেছিল। লক্ষ্য ছিল রফতানি-নির্ভর শিল্পের জন্য শুল্ক কমানো। জাপান, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া ও ভারতের মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিতে অনেক শুল্ক তুলে দিয়েছে। কেউ কেউ ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা, জাতীয় নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সংগ্রহে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যা দেশগুলোতে রাজনৈতিক সমালোচনার মুখে পড়েছে, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ছাড় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এশিয়ার দেশগুলোর জন্য চীন একটি বড় বিষয়। প্রায় প্রতিটি দেশে চীন অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বা প্রতিদ্বন্দ্বী। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে চীনের বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং চুক্তির মাধ্যমে প্রতিবেশী এশীয় দেশগুলোকে এতে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চীন ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় এখনও অচলাবস্থা বজায় রেখেছে এবং প্রতিবেশীদের চেয়ে ভালো চুক্তি পেতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর এশিয়ার দেশগুলো ভাবছে যে, তাড়াহুড়ো করে ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি করা কি ভুল ছিল? চুক্তিগুলো টিকবে কি না?
এপিএসি অ্যাডভাইজার্সের প্রধান নির্বাহী স্টিভেন ওকুন বলেন, ‘যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করে ১৫ শতাংশের বেশি শুল্ক মেনে নিয়েছে, তারা এখন অসুবিধায় পড়েছে। ট্রাম্পের সুবিধা কমে যাওয়ায় কি চুক্তি পুনর্বিবেচনা করে আরও কঠিন শর্ত আদায় করবে? নাকি বর্তমান চুক্তি ধরে রেখে প্রতিশোধের ভয় এড়াবে?’
শুল্কের হারের পরিবর্তন অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। কোর্টের রায়ের কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। শনিবার তা ১৫ শতাংশে উন্নীত করেন।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান সম্প্রতি শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের বিনিময়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক পেয়েছে, তাদের অবস্থা তেমন বদলায়নি। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়া মার্কিন পণ্য কেনা ও খাত খোলার বিনিময়ে ১৯ শতাংশ শুল্ক মেনেছে। যা প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অসুবিধা তৈরি করেছে।
আরও জটিলতা রয়েছে। অনেক চুক্তি এখনও অনুমোদিত হয়নি। ট্রাম্প একতরফা সিদ্ধান্ত নিলেও অন্য দেশে আইনসভার অনুমোদন লাগে। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া জানিয়েছে, চুক্তি অনুমোদিত হয়নি। মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী জোহারি আবদুল গনি বলেন, দেশ নিজের স্বার্থে কাজ করবে এবং বাণিজ্য সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করবে। এ চুক্তি দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়া রায়ের পর বলেছে, এটি ১৫ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ককে অকার্যকর করেছে, তবে চুক্তি অস্বীকার করেনি।
ভিয়েতনামের মতো দেশ এখনও চুক্তি চূড়ান্ত করছে। ভিয়েতনামের নেতা তো লাম ট্রাম্পের ট্যারিফ ঘোষণার পর ফোন করেন। ৪৬ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়ে ভিয়েতনাম ২০ শতাংশে ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি করেছে, কিন্তু চূড়ান্ত হয়নি। সর্বশেষ আলোচনা এ মাসে শেষ হয়েছে, কোনও ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
জাপান শুরুর দিকে আলোচনা শুরু করে গত বছর চুক্তি করে। অটো ও অটো যন্ত্রাংশের শুল্ক ২৭.৫ থেকে ১৫ শতাংশে নামিয়েছে, বিনিময়ে ৫৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দিয়েছে। জাপান এখনও প্রথম দফা বিনিয়োগের পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়া অক্টোবরে চুক্তি করে ১৫ শতাংশ শুল্ক পেয়েছে, ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে আইনসভা অনুমোদন না হওয়ায় ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন ২৫ শতাংশে ফিরিয়ে নেবেন। কোর্টের রায়ে সেই হুমকির ধার কমেছে।
তাইওয়ান ২৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের চুক্তি করেছে, কিন্তু বড় প্রতিশ্রুতি এখনও ঘোষণা করা হয়নি।
টোকিওভিত্তিক সিএসআইএস-এর অ্যাডজাঙ্কট ফেলো পল নাদেও বলেন, ‘যারা চুক্তি করেনি বা জাপানের মতো অনেক টাকা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারাই জিতেছে।’ তিনি মনে করেন, শুল্ক কোনও না কোনও রূপে থাকবে, কিন্তু কোর্টের রায় ট্রাম্পের আলোচনার সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে।



