ঢাকা শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা

একটা শুভঙ্করের ফাঁকি উল্লেখ করে শুরু করি। ঢাকায় চালিত অনেক পরিবহনে জায়গায় জায়গায় মনিটরিং ব্যবস্থা চালু রয়েছে। অনেকক্ষেত্রে সেভাবেই ভাড়া নির্ধারিত হয়। ‘ক’ স্থান হতে ‘খ’ স্থানের ভাড়া ১০ টাকা হওয়ার কারণে শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পেশার মানুষের পাস হিসেবে অর্ধেক ভাড়া নির্ধারিত হলেও ন্যূনতম ভাড়া হিসেবে ১০ টাকা দিতে হয়। প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে নির্ধারিত স্থানে যখন চেকার যাত্রীর সংখ্যা লিপিবদ্ধ করতে আসে তখন বাসের কনডাক্টর কেন শিক্ষার্থীর সংখ্যা লিপিবদ্ধ করতে অতিরিক্ত চাপাচাপি করেন?
সবার ভাড়া যেখানে ১০ টাকা সেখানে শিক্ষার্থী আর সাধারণ যাত্রীর মধ্যে তফাৎ কোথায়? কার্যত কোনও পার্থক্য নেই। কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে কনডাক্টরের আয়ের হিসাবে। যদি সারাদিন ২০০ যাত্রী ভ্রমণ করে এবং মোট হিসাবে ৫০ জন শিক্ষার্থী বা যাদের জন্য অর্ধেক ভাড়া হয় তাহলে মালিককে সে হিসাবে অনেক টাকা কম দেওয়া যাবে।
মজার বিষয় হচ্ছে, ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সাথে তর্ক হলে কনডাক্টরদের প্রায়ই বলতে শোনা যায় যে তারা মালিকের চাকরি করেন; বিষয়টি তার ভাড়া নিয়ে তর্ক করার সাথে সাংঘর্ষিক।
প্রাসঙ্গিকভাবে, একই কোম্পানির অধীনে মালিকের চাকরি করলে একই নামের বাস যাত্রী উঠানো নিয়ে মারামারি করবে কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নাই। বাস চলাচলে আদতে কোনও শৃঙ্খলা নেই। কারণ রাস্তায় যেসব জায়গায় বাস চেকিং হয় সেসব জায়গায় নেমে গিয়ে অন্য বাস কিংবা একই কোম্পানির বাসে চড়লে ভাড়ার তারতম্য হবে; যা হওয়ার কথা ছিল না। আমাদের আরও অনেক কিছুই জানা নাই। যেমন, বাসের ফিটনেস পরীক্ষা করা হয় কিনা? বাসের অবস্থা দেখে ফিটনেস নাই বলেই আমাদের প্রতীয়মান।
লেখাটি কোনও গবেষণার ফলাফল নয়। লেখাটি একান্ত ধারণাপ্রসূত এবং অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা। ঢাকা শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী সংযোজন মেট্রোরেল। এ লেখায় মেট্রোরেল প্রসঙ্গ সচেতনভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। কারণ এ প্রসঙ্গে লিখতে হলে এর কলেবর বড় হয়ে যাবে। বরং ভিন্ন একটি লেখায় এ নিয়ে আলোকপাত করা যাবে। এটা অন্যন্ত আনন্দের যে আগে সব রুটে বাস চলাচল ছিল না। তাই বাসের রুট পরিবর্তন বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছা লাগত। যেদিকেই যেতে চান না কেন, ফার্মগেট হয়ে যেতে হতো। এখন প্রায় সব দিকে সব গন্তব্যে বাস চলাচল করছে। অনেকক্ষেত্রেই সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাইরে গিয়ে এক রুটে ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানির বাস চলাচল করছে। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এক একটি রুটের জন্য একটি সার্ভিস চালুর কথা বলেছিলেন।
দুটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই।
এক. এক্ষেত্রে সরাসরি যানজট কমবে কারণ যাত্রীর জন্য যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখার প্রবণতা কমবে। বিভিন্ন কোম্পানির গাড়ি চলাচলের কারণে রাস্তা বন্ধ করে কিংবা আটকে দিয়ে যাত্রী সংগ্রহের যে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিযোগিতায় চলে তার কারণে পিছনে থাকা গাড়িগুলোকে আটকে থাকতে হয়।
দুই. ভাড়া বেড়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, হাতির ঝিলে চক্রাকার যে বাস সার্ভিস তার ভাড়া ঢাকা শহরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। কারণ এখানে একচেটিয়া বাজার গড়ে উঠেছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এমনকি রামপুরা থেকে যে লঞ্চ বা সিএনজি চলাচল করে এর ভাড়াও অন্যান্য এলাকার তুলনায় অনেক বেশি। ঢাকার প্রধান সড়কসহ সর্বত্র ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করলেও রামপুরা ব্রিজ থেকে হাতিরঝিল হয়ে মগবাজার বা কারওয়ান বাজার যাওয়ার রাস্তায় এগুলো চলে না। তাই প্রতিযোগিতা নেই; ভাড়াও বেশি। বাজারে প্রতিযোগিতায় সৃষ্টি করতে না পারলে এরকম মনোপলি গড়ে ওঠা খুবই স্বাভাবিক। আধুনিক সরকারের কার্যপরিধির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাজারে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করা। এ রাস্তায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল শুরু করলে ভাড়া অর্ধেকে নেমে আসবে।
ঢাকা শহরের অর্থনীতি কোনও চার্ট বা সূচকের ভেতরে পুরো ধরা পড়ে না। এটি বোঝার জন্য সকালবেলা অফিসগামী মানুষের মুখ, বাসের ভিড়, কিংবা ট্রাফিক সিগন্যালে আটকে থাকা গাড়ির সারি দেখলেই যথেষ্ট। ঢাকা শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ট্রাফিক জ্যাম। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার যানজটের কারণে বছরে প্রায় ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়। যদিও বাস্তবে এ যানজটই এক বিকল্প অর্থনীতি তৈরি করেছে। ট্রাফিক জ্যামে বসেই মানুষ কাজ করে, ফোনে মিটিং সারে, আর ফুটপাত ঘিরে গড়ে ওঠে ক্ষুদ্র ব্যবসার এক বিশাল জাল। অনেকে একে ক্ষতি না বলে এক ধরনের ‘বিকল্প অর্থনীতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করতে চান।
তবে বিষয়টি এত সরল সমীকরণে দেখার সুযোগ নাই। দেখতে হবে মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান দ্বারা অর্থনীতির মোট সামাজিক সুবিধা (social benefit) এর তুলনায় কী পরিমাণ সামাজিক খরচ (social cost) হচ্ছে।
রাস্তা দখল করে ব্যবসা কিংবা পার্কিং ঢাকার রাস্তার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। এখানে পেট্রোল/সিএনজি পাম্পের যানবাহনের লাইন রাস্তায়, সকল প্রকার যানবাহনের পার্কিং রাস্তায়, শপিং মলের গাড়ি পার্কিং রাস্তায়, ফেরিওয়ালা থেকে শুরু করে স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা তৈরি করে ব্যবসা- সবই রাস্তায়। এগুলো সরিয়ে ফেলা সহজ নয়। ঢাকার যানজট একটু একটু করে কমানো যেতে পারে।
যেমন, সকালে রাস্তা ঝাড়ু দেওয়া বাদ দিলে অন্তত ৩ শতাংশ যানজট কমবে বলে আমার ধারণা। কারণ গাড়ির অতিরিক্ত চাপের কারণে রাস্তায় সামান্য একটি ইট পড়ে থাকলেও গতি কমে যাচ্ছে।
ফলশ্রুতিতে কয়েক মিনিটেই পিছনে গাড়ির চাপ তৈরি হচ্ছে। রাস্তা ভাঙ্গা থাকার কারণে যানবাহনগুলো সরে গিয়ে ভালো রাস্তা দিয়ে যাওয়ার প্রবণতার কারণে একইভাবে যানজটের সৃষ্টি হয়। রাস্তার কোথাও পানি জমে থাকলেও একই চিত্র দেখা যাবে। পানি জমে থাকা স্থানগুলো সচেতনভাবে এড়িয়ে চলবে। কারণ পানি জমে থাকা রাস্তাটির নিচে বিশাল গর্ত কিংবা ম্যানহোল আছে কিনা তা কেউ জানে না। তাই রাস্তা সংস্কার করাও জরুরি।
ধারণা করি, কিছু রাস্তা ইচ্ছা করেই সংস্কার করা হয় না, যাতে যানবাহন ধীর গতিতে চলে আর দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়! ভালো রাস্তায় গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কষ্টকর হবে।
মোড়ের ঠিক মাঝখানে যাত্রী খোঁজার জন্য যানবাহন (বিশেষ করে, প্যাডেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশা, থ্রি-হুইলার, ইত্যাদি) দাঁড়িয়ে থাকার কারণে অন্যান্য যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। রাস্তার যে কোনও জায়গায় দাঁড়িয়ে বাসগুলো যেভাবে যাত্রী নিয়ে থাকে তা অনেকটা service at door step এর মতো। এছাড়া, মানুষ পথচারী পারাপারের জন্য যে নির্দিষ্ট জেব্রা ক্রসিং রয়েছে তা ব্যবহার করতে নারাজ। সুযোগ থাকলে কেন আমি কষ্ট করে সিঁড়ি ভাঙ্গতে চাইবো? বিষয়টি অমূলক নয়; কারণ মানুষ জন্মগতভাবে অবাধ্য! তাছাড়া, শহরে অনেক শিশু এবং বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ বাস করেন যাদের কাছ থেকে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করা কাম্য নয়। সমাধান হিসেবে যন্ত্রচালিত এসকেলেটার ব্যবহার করলে কিছুটা সুফল পাওয়া যেতে পারে।
উপরন্তু, ঢাকার অনেক রাস্তা ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এখানে খুব বেশি গবেষণার প্রতিফলন নেই। অনেকক্ষেত্রেই এসব রাস্তা ব্যক্তি/গোষ্ঠীর একান্ত নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়। এসব রাস্তা খুলে দিলেও যানজট কমবে। যানজট নিয়ন্ত্রণে সবুজ রঙয়ের লেজার লাইট বেশ কার্যকর মনে হলেও তা যথেষ্ট নয়।
কিছু উদ্যোগ নিলে বিদ্যমান সম্পদ দ্বারাই যানজট কমানো সম্ভব। যেমন, যত্রতত্র পার্কিং না করলে (বিশেষ করে, বাস) ১০ শতাংশ, বাসগুলো যেখানে-সেখানে থেকে যাত্রী না তুললে ৫ শতাংশ, রাস্তা সংস্কার করলে ৭ শতাংশ, রাস্তার দু’পাশে গড়ে ওঠা ব্যবসা ও পার্কিং তুলে দিতে পারলে অন্তত ২২ শতাংশ, বাসগুলো নিজেদের মধ্যে যাত্রী নিয়ে মারামারি না করলে ৫ শতাংশ, মোড়ের মাঝখানে প্যাডেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশা, থ্রি-হুইলার দাঁড়িয়ে না থাকলে ৮ শতাংশ, বন্ধ রাস্তা খুলে দিলে ৬ শতাংশ, জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করলে ৪ শতাংশ, উল্টা দিকে যানবাহন চলাচল না করলে ৩ শতাংশ, বছরজুড়ে পরিকল্পনাবিহীন রাস্তা মেরামতের কাজ না করলে ১৭ শতাংশ, গনপরিবহনের সংখ্যা ও গুণগত মান বাড়ালে ১০ শতাংশ যানজট নিরসন করা সম্ভব। এখানে যোগফল হচ্ছে, ৯৭ শতাংশ। বাকি ৩ শতাংশ আসবে সকালে রাস্তা ঝাড়ু দেওয়া বাদ থেকে। মোট ১০০ শতাংশ; যা আমাদের স্বপ্নের ঢাকা শহর বিনির্মাণের কল্পনার চিত্র।
কোনও গবেষণা থেকে আমি এ পরিসংখ্যান সংগ্রহ করিনি। নাগরিক পোড় খাওয়া জীবনের অভিজ্ঞতাই এ ধারণার উৎস। তবে এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারলে শতভাগ না হলেও একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ যানজট কমানো সম্ভব।
এ শহরে ডানে-বামে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। সোজা যে গাড়ি যাবে সেও বাম দিকে চেপে বসে থাকে। তাই বামের বাহনগুলো কেবল সোজা যাওয়ার সিগন্যাল ছাড়লেই যেতে পারবে। ১৯৮০ এর দশকে যখন ঢাকায় আসি তখন ট্রাফিক লাইটগুলো কার্যকর ছিল। সময়ের পরিক্রমায় এখন আমরা ম্যানুয়েলি ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছি। এটি অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে হয়ে থাকতে পারে। তাছাড়া, অলিগলির রাস্তাগুলো প্রধান সড়কগুলোর সাথে মিশে যাওয়ার কারণে এসবের সংযোগস্থলে ট্রাফিক লাইট কাজ করবে না। বাধ্য হয়ে ম্যানুয়েল ব্যবস্থা। চলার পথে অনেকের মনে হয় যে যদি রাস্তার মাঝখানে ডিভাইডার থাকতো তাহলে নিশ্চয়ই যানজট কম হতো। কিন্তু দেখা যায় ডিভাইডার যেখানে শুরু ঠিক সেখানে ডান ও বাম দিকে এত এত যানবাহন চলে আসে যে ডিভাইডার কার্যত কোনও কাজ করে না। বিশেষ করে, মোটর বাইকারদের সময়ের দাম এত বেশি যে তারা সবাইকে পিছনে ফেলে চলে যেতে চান। মোটর সাইকেলের অনির্ধারিত চলাচলের কারণে ফুটপাতে ব্যারিকেড দিয়েও কাজ হচ্ছে না। ঢাকায় ব্যক্তি পর্যায়ে চালিত মোটর সাইকেল বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে অথবা অতিরিক্ত কর আদায় করে নিরুৎসাহিত করা যেতে পারে।
ঢাকা শহরের লোকসংখ্যা কত? সরকারি হিসাবের সাথে মানুষের ধারণা সাংঘর্ষিক! জনসংখ্যার অত্যাধিক চাপের কারণে পাবলিক বাসে দিনের কিছু সময় বাদ দিয়ে অনেক ঠাসাঠাসি হয়। কেউ কেউ পিছন থেকে নামতে কষ্ট হবে বলে সামনেই দাঁড়িয়ে থাকতে চান। এদেরকে কেউ কেউ ‘পকেটমার’ হিসেবে বিবেচনা করেন। কারণ পকেটমাররা সামনেই দাঁড়াতে চায় যাতে কাজ শেষে চট করে নেমে যেতে পারে। রাস্তায় চলাচলে কিশোর/তরুণ/যুবসমাজ কানে হেডফোন ব্যবহার করছেন। তারা হয়তো বাইরের জগত থেকে নিজেকে নিবৃত করতে পারছেন কিন্তু বাকিদের চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টি হচ্ছে। তবে শব্দ দূষণ থেকে বাঁচতে পারলে প্রায় পুরা ঢাকার ময়লা- আবর্জনার দুর্গন্ধ থেকে বাঁচার কোনও উপায় নাই। গাড়ির জানালার পাশে বসে বাইরের দিকে মোবাইল রেখে কথা বললে সে মোবাইল মুহূর্তেই গায়েব হয়ে যেতে পারে। এক ভয়ঙ্কর চক্র গড়ে উঠেছে। ইদানিং এ চক্র এতটাই বেপরোয়া যে গাড়ির চাকার উপর দাঁড়িয়ে ভেতর থেকে মোবাইল নিয়ে যাচ্ছে। সহজ সমাধান ছিল – ট্র্যাপ করে এদের ধরে ফেলা যেত।
ভাড়া নিয়ে বাকচিত/তর্ক/হাতাহাতি নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। হয়তো বাস কর্তৃপক্ষ ও যাত্রীরা উভয়েই দায়ী। তবে দায়িত্ব হলো বাস কর্তৃপক্ষের। বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে।
এক. একই রুটে একই মানের ভিন্ন ভিন্ন সার্ভিসের বাস দিয়ে গেলে ভাড়া ভিন্ন হতে পারে; যা হওয়ার কথা ছিল না।
দুই. রাস্তার বিভিন্ন স্থানে যাত্রীর সংখ্যা লিপিবদ্ধ করে রাখার জন্য মনিটরিং ব্যবস্থা রয়েছে যা ভাড়া নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। এক চেকার থেকে আরেক চেকার পর্যন্ত ভাড়া ১০ টাকা। প্রশ্ন হলো কতগুলো চেকার থাকবে সেটা কে নির্ধারণ করে দিয়েছে?
তিন. বাস ভাড়া নির্ধারণে যাত্রীরা কোথাও ভরসা করতে পারেন না। যার ফলে ভাড়া নিয়ে ঝামেলা করতে করতেই আমাদের নাগরিক জীবন কেটে যাচ্ছে।
ব্যাটারিচালিত রিকশা ঢাকা শহরকে এক ভিন্ন জগতে নিয়ে গিয়েছে। কারণ এগুলো আসার আগে সিএনজি পাওয়াটা ছিল রহস্যময় লটারি জিতে যাওয়ার মতো। সকল রাস্তায় এদের দৌরাত্ম্য। কী প্রধান সড়ক, কী গলির রাস্তা সব জায়গায় এ ব্যাটারিচালিত রিকশা রাস্তা দখল করে নিয়েছে। তাই আপনি যত দামি গাড়িই ব্যবহার করেন না কেন ব্যাটারিচালিত এসব রিকশার গতিই ঢাকা শহরের গতি। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এটি থ্রি-হুইলার এর বিকল্প এবং সময় সাশ্রয় হয় বলে আগে মানুষ রিকশার নিচের দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হয় যে এটি ব্যাটারিচালিত। তবে এর পিছনে বেশ বড় একটা অর্থনীতি দাঁড়িয়ে গেছে।
প্রথমত, কর্মসংস্থান সৃষ্টি। গ্রামে কাজ না পাওয়া মানুষ শহরমুখী হয়ে সরাসরি এ কাজে জড়িয়ে পড়ছেন। দ্বিতীয়ত, আমদানি ব্যয় বাড়ছে। একটি ব্যাটারিচালিত রিকশার দাম ৬০,০০০ থেকে ৭০,০০০ টাকা (মেশিন/ ইঞ্জিন ১৫,০০০, ব্যাটারি ৩০,০০০ ও রিকশার বডি ১৫,০০০ – ২৫০০০ টাকা)। এর মধ্যে মেশিন ও ব্যাটারি মূলত আমদানি করতে হয়। ফলে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে চলে যাচ্ছে যা প্যাডেলচালিত রিকশার ক্ষেত্রে হয়নি। সরকার যদি এগুলো স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করতো তাহলে নতুন ব্যবসা স্থাপনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো। তৃতীয়ত, এগুলোর কোনও রেজিস্ট্রেশন নাই। ফলে নিয়ন্ত্রণ সহজ নয়। রেজিস্ট্রেশনের আওতায় এনে সরকার রাজস্ব বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। তবে এখানে অর্থনীতির যুক্তি কাজ করে না। রিকশার সংখ্যা অনেক বেড়ে গেলেও ভাড়া কমেনি।
ঢাকার অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি শহরের কর্মসংস্থানের বড় অংশ জুড়ে আছে। রিকশাচালক থেকে শুরু করে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী — এ মানুষগুলোই শহরের দৈনন্দিন অর্থনীতিকে সচল রাখে। ব্যাংক বা নীতিমালার বাইরে গিয়েও তারা নগদ অর্থের প্রবাহ নিশ্চিত করে। একজন রিকশাচালক গড়ে দিনে ৬০০–১৫০০ টাকা আয় করেন। অর্থাৎ, শুধু রিকশা থেকেই বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার নগদ অর্থ শহরের ভেতর ঘোরাফেরা করে — কোনও ব্যাংকিং চ্যানেল ছাড়াই। ঢাকার রাস্তায় হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়া থ্রি-হুইলার (ব্যাটারি চালিত অটো রিকশা) তুলে দিতে হলে দুটি বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে, এক) এরা পার্ক করবে কোথায় এবং এ দায়িত্ব কার? দুই) যদি রাস্তা থেকে এদের সরিয়ে দেওয়া হয় তাহলে পরবর্তী সময়ে যে প্রতিক্রিয়া হবে তা সামাল দিবে কে?
রিকশা, সিএনজি, সরকারি গাড়ি, ময়লার ভ্যান বা বেসরকারি বাহন — সবকিছুই এক অদ্ভুত রিয়েলিটি শো। ডানে বামে হর্ন বাজানো আর মাঝখানে আপনি — সব মিলিয়ে ঢাকা শহরের রাস্তায় চলাফেরা মানে এক ধরনের ‘লেভেল আপ’ অ্যাডভেঞ্চার। আমার কাছে পুরা শহরকেই এক আধুনিক ভিডিও গেম মনে হয়। এভাবেই মানুষ শেখে ধৈর্য্য, সাহস আর কখনও কখনও জীবন রক্ষা করার কৌশল। নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক – ঢাকাকে একটি আধুনিক নগর হিসেবে গড়ে তোলা হোক। একটা রসিকতা করে শেষ করি। স্রষ্টায় অবিশ্বাসী এক লোক ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে বাসায় যাচ্ছেন। বাসায় যেতে যেতে তিনি স্রষ্টায় বিশ্বাসী হয়ে উঠেন।
ঢাকা শহর যেহেতু চলছে তাহলে নিশ্চয়ই কেউ একে নিয়ন্ত্রণ করছেন। ধন্যবাদ স্রষ্টাকে, আমরা এখনও বেঁচে আছি।
লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক



