যুদ্ধ ও টিকে থাকার জন্য ইরানের প্রস্তুতি কেমন?

ইরানের আকাশে এখন ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সম্ভাব্য সামরিক হামলার হুমকি এবং দেশের অভ্যন্তরে তীব্র গণবিক্ষোভ, এই দ্বিমুখী সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির ভবিষ্যৎ এখন এক অভিজ্ঞ নেপথ্য কারিগরের হাতে। তিনি আলী লারিজানি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির এই বিশ্বস্ত সেনাপতিই এখন কার্যত দেশটি পরিচালনা করছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।
৬৭ বছর বয়সী লারিজানি রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) সাবেক কমান্ডার এবং বর্তমানে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান। গত কয়েক মাসে তার ক্ষমতা এতটাই বেড়েছে যে, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। পেজেশকিয়ান নিজেই প্রকাশ্য জনসভায় বলছেন, “আমি একজন ডাক্তার, রাজনীতিবিদ নই।” এমনকি ইন্টারনেটের ওপর থেকে বিধিনিষেধ সরানোর মতো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জন্যও প্রেসিডেন্টকে এখন লারিজানির দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।
ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের ছয়জন কর্মকর্তা এবং রেভল্যুশনারি গার্ডসের সদস্যদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, খামেনি একটি বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এর নাম দেওয়া হয়েছে ফোর লেয়ার্স অব সাকসেশন বা চার স্তরের উত্তরসূরি পরিকল্পনা।
এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলায় খামেনি নিজে বা শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব নিহত হলেও যেন রাষ্ট্রযন্ত্র অচল না হয়। খামেনি প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য অন্তত চারজন করে বিকল্প ব্যক্তির নাম চূড়ান্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে কারা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেবেন, সেই ক্ষুদ্র বৃত্তও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি কাতার সফরের সময় আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লারিজানি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “আমরা যুদ্ধের জন্য মরিয়া না, কিন্তু যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হলে আমরাও প্রস্তুত। গত সাত-আট মাসে আমরা আমাদের দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করে তা সংশোধন করেছি।”
ইরানের সামরিক প্রস্তুতির কিছু চিত্র এখন স্পষ্ট। এগুলোর মধ্যে রয়েছে:
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র: ইসরায়েলকে লক্ষ্যবস্তু করতে ইরাক সীমান্তের কাছে এবং মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে নিশানা করতে পারস্য উপসাগরের উপকূলে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি: সামরিক মহড়ার অংশ হিসেবে ইরান মাঝেমধ্যেই হরমুজ প্রণালি বন্ধের মহড়া দিচ্ছে, যা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান পথ।
বাসিজ মিলিশিয়া: অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনে প্রধান শহরগুলোর রাস্তায় সাদা পোশাকে বাসিজ মিলিশিয়া এবং বিশেষ বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
খামেনি নিজেও এক ভাষণে হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন যে, “বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এমন এক চপেটাঘাত খেতে পারে যে তারা আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না।”
ইরানি নেতৃত্বের মধ্যে এখন একটি আলোচনা বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে, আর তা হলো- যদি রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তবে কে হবেন ‘ইরানের ডেলসি রদ্রিগেজ’? ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো যখন বন্দি হন, তখন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে দেশ চালিয়েছিলেন। ইরানের ক্ষেত্রে এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে আলী লারিজানির নাম। তার পরেই আছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি।
খামেনি ১২ দিনের ইসরায়েল যুদ্ধের সময় আত্মগোপনে থাকাকালীন তার ধর্মীয় উত্তরসূরি হিসেবে তিনজনের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। লারিজানি সেই তালিকায় নেই, কারণ তিনি উচ্চপর্যায়ের শিয়া ধর্মীয় নেতা বা ‘আয়াতুল্লাহ’ নন। তবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও যুদ্ধের ময়দানে খামেনির প্রধান সেনাপতি হিসেবে লারিজানিই এখন অপ্রতিরোধ্য।
বিশ্লেষক ভালি নাসরের মতে, খামেনি এখন নিজেকে ‘শহীদ’ হিসেবে দেখতেও প্রস্তুত। তিনি তার উত্তরাধিকার ও ইসলামি ব্যবস্থার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ক্ষমতা বণ্টন করে দিচ্ছেন। তবে সংকটের এই মুহূর্তে লারিজানিই হয়ে উঠেছেন সেই ‘সুপার গ্লু’, যা ইরানের এই নড়বড়ে ব্যবস্থার সব অংশকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।



