ইরানে সীমিত হামলার পর বড় আঘাতের পরিকল্পনা ট্রাম্পের

ইরান যদি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগের দাবিতে নতিস্বীকার না করে, তবে দেশটিতে বড় ধরনের সামরিক হামলার কথা ভাবছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনার সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ের সীমিত হামলা কিংবা কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় কাজ না হলে আগামী মাসগুলোতে ইরানি নেতৃত্বকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে ব্যাপকতর আক্রমণের পরিকল্পনা বিবেচনায় রয়েছে তার। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস এ খবর জানিয়েছে।
আগামী বৃহস্পতিবার জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি শেষ মুহূর্তের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সামরিক সংঘাত এড়ানোর এটিই চূড়ান্ত সুযোগ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এই আলোচনা ব্যর্থ হলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে ট্রাম্প ইতোমধ্যে উপদেষ্টাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও ট্রাম্প একটি প্রাথমিক হামলার দিকেই ঝুঁকে আছেন। এর মূল উদ্দেশ্য হবে ইরানের নেতাদের এটা বুঝিয়ে দেওয়া যে, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা তাদের পুরোপুরি ত্যাগ করতে হবে। হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর্পস (আইআরজিসি)-এর সদর দফতর, পারমাণবিক স্থাপনা এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রোগ্রাম।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার উপদেষ্টাদের জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপগুলো যদি তেহরানকে দাবি মানতে বাধ্য করতে না পারে, তবে চলতি বছরের শেষের দিকে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান চালানোর পথ তিনি খোলা রাখবেন।
গত বুধবার হোয়াইট হাউজের সিচুয়েশন রুমে ইরানের ওপর হামলার পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন, সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ এবং হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস।
বৈঠকে জেনারেল কেইন সামরিক অভিযানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তবে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের অভিযানের সময় তিনি যতটা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, ইরানের ক্ষেত্রে ততটা হতে পারেননি। কারণ হিসেবে তিনি ইরানের ভৌগোলিক জটিলতা ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও হামলার ঝুঁকি ও জটিলতা নিয়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কড়া প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেন।
ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ফক্স নিউজকে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে কোনও চুক্তির একমাত্র শর্ত হবে জিরো এনরিচমেন্ট বা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করা। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, এনপিটি চুক্তির আওতায় পারমাণবিক জ্বালানি তৈরির অধিকার থেকে তেহরান পিছিয়ে আসবে না।
দুই পক্ষের এই অনড় অবস্থানের মাঝে একটি ‘সম্মানজনক’ সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছেন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি। প্রস্তাব অনুযায়ী, ইরান কেবল চিকিৎসা ও গবেষণার জন্য অত্যন্ত সীমিত পরিমাণে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাবে। তবে ট্রাম্প বা ইরান কোনও পক্ষই এতে শেষ পর্যন্ত রাজি হবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।
কূটনৈতিক আলোচনার সমান্তরালে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে গত ২৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দুটি বিমানবাহী রণতরী, কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান, বোমারু বিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন ইরানের দোরগোড়ায়। এর মধ্যে অত্যাধুনিক রণতরী জেরাল্ড আর ফোর্ড বর্তমানে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইসরায়েল উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে যুদ্ধের উদ্দেশ্য নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন এই হামলার লক্ষ্য কেবল পারমাণবিক অস্ত্র রোধ করা। আবার মার্কো রুবিওর মতো উপদেষ্টারা বলছেন, এর মাধ্যমে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ধ্বংস করা, হামাস ও হিজবুল্লাহর প্রতি সমর্থন বন্ধ করা এবং ইরানি বিক্ষোভকারীদের সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।
তবে সামরিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, আমেরিকার এই হামলা সাধারণ ইরানিদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী আবেগের জন্ম দিতে পারে, যা উল্টো খামেনি সরকারকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে অংশ নেওয়া ইউরোপীয় কর্মকর্তারাও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, সামরিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানকে তাদের ‘প্রতিরোধের প্রতীক’ হয়ে ওঠা পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সরানো যাবে কি না।
হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র আনা কেলি এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রেসিডেন্টের চিন্তাভাবনা নিয়ে সংবাদমাধ্যম জল্পনা করতেই পারে, কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত কী করবেন তা কেবল তিনিই জানেন।



