Uncategorized

চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের দাপট বেড়েছে

বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা, পাল্টা শুল্ক, মার্কিন ভোক্তা ব্যয়ে চাপ— সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল ছিল কঠিন এক বছর। যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে সামগ্রিক আমদানি কমেছে, চাহিদা সংকুচিত হয়েছে, বছরের শেষ দিকে গতি আরও শ্লথ হয়েছে। তবুও এই প্রতিকূলতার মধ্যেই বাংলাদেশ দেখিয়েছে ব্যতিক্রমী সাফল্য। বাজার ছোট হলেও সেখানে বাংলাদেশের উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান ও শক্তিশালী হয়েছে।

মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের অধীনস্থ অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) সর্বশেষ  পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট তৈরি পোশাক আমদানি হয়েছে ৭৭ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ কম। পরিমাণের হিসাবে (স্কয়ার মিটার সমতুল্য বা এসএমই) আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ মার্কিন বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কিছুটা সংকুচিত হয়েছে। তবে এই মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশ ব্যতিক্রম। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে— যা আগের বছরের তুলনায় ১১ দশমিক ৭১ শতাংশ বেশি। শুধু মূল্য নয়, পরিমাণের দিক থেকেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের বাজার অংশ দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশে। 

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশ একটি নির্ভরযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক সোর্সিং গন্তব্য হিসেবে অবস্থান শক্ত করছে। বিশেষ করে চীনের বাজার অংশ কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট সুযোগের একটি অংশ বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পেরেছে। 

দাম কম রেখেই বাজার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ 

বিশ্ববাজারে গড় ইউনিট মূল্য বেড়েছে ২ দশমিক ০৩ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশের গড় ইউনিট মূল্য সামান্য কমে ৩ দশমিক ১০ ডলার থেকে ৩ দশমিক ০৮ ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক মূল্য ধরে রেখেই বাংলাদেশ রফতানি বাড়াতে পেরেছে।

এটি প্রমাণ করে— বাংলাদেশ শুধু কম দামের উৎস নয়, বরং নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবেও ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করছে। 

সামগ্রিক চিত্র: আমদানি কমেছে, দাম বেড়েছে

২০২৫ সালের জানুয়ারি-ডিসেম্বর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট তৈরি পোশাক আমদানি হয়েছে ৭৭ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ কম। 

পরিমাণের হিসাবে (স্কয়ার মিটার সমতুল্য বা এসএমই) আমদানি কমেছে আরও বেশি— ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ বাজারে মোট পোশাকের চাহিদা সংকুচিত হয়েছে। তবে গড় ইউনিট মূল্য বেড়েছে ২ দশমিক ০৩ শতাংশ, যা নির্দেশ করে— কম পরিমাণে হলেও তুলনামূলক বেশি দামে আমদানি হয়েছে।

বিশেষ করে ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল ছিল। বছরের দ্বিতীয়ার্ধে আমদানি প্রবাহ প্রথমার্ধের তুলনায় ধীর হয়ে পড়ে। শেষ তিন মাসে বাজারে আমদানির গতি কমে যাওয়ায় সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি চাপে পড়ে।

প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশের উত্থান 

সামগ্রিক মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশের রফতানি ছিল উজ্জ্বল। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। এটি দেশটির ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বার্ষিক রফতানি আয় এবং ২০২৪ সালের তুলনায় ১১ দশমিক ৭১ শতাংশ বেশি। শুধু ডিসেম্বর মাসেই আমদানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। পরিমাণের দিক থেকেও বাংলাদেশ এগিয়েছে। জানুয়ারি-ডিসেম্বর সময়ে এসএমই ভিত্তিতে রফতানি বেড়েছে ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ কেবল মূল্য নয়, প্রকৃত পরিমাণেও বাজার সম্প্রসারণ হয়েছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের বাজার অংশীদারিত্ব দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশে। 

চীনের অংশ কমে তৈরি হয়েছে সুযোগ 

মার্কিন বাজারে দীর্ঘদিনের শীর্ষ সরবরাহকারী চীন ২০২৫ সালে বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে। দেশটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি কমেছে ৩৫ শতাংশের বেশি। ডিসেম্বর মাসে পতন ছিল ৫৫ শতাংশেরও ওপরে। 

বাণিজ্য নীতিগত চাপ, পাল্টা শুল্ক এবং সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্যকরণের কৌশলের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে। এই শূন্যতার একটি বড় অংশ ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ দখল করেছে। 

প্রতিযোগীদের চিত্র

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান পোশাক সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ভিয়েতনাম, যার বাজার অংশ ২১ দশমিক ৫০ শতাংশ। এরপর রয়েছে চীন (১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ), বাংলাদেশ (১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ), ভারত (৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ), কম্বোডিয়া (৬ দশমিক ২০ শতাংশ) এবং ইন্দোনেশিয়া (৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ)। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, চীনের অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। মার্কিন বাজারে চীনের অংশ ক্রমেই কমছে। বিপরীতে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম মূল্য, ইউনিট মূল্য এবং পরিমাণ— তিন সূচকেই প্রায় সমান্তরাল প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে, যদিও ভিয়েতনামের মোট অংশ এখনও বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বড়। 

ভিয়েতনাম ১৬ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার রফতানি করে শীর্ষে রয়েছে, যা ১১ দশমিক ৭৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। অন্যদিকে চীনের অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। ২০২৫ সালে চীন থেকে আমদানি কমেছে ৩৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ডিসেম্বর মাসে পতন ছিল ৫৫ শতাংশের বেশি। পরিমাণের দিক থেকেও চীনের রপ্তানি ২৭ শতাংশের বেশি কমেছে।

এতে স্পষ্ট— যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীন দ্রুত অংশ হারাচ্ছে। বাণিজ্য নীতিগত চাপ, পাল্টা শুল্ক এবং ক্রেতাদের সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্যকরণের কৌশল এ প্রবণতার পেছনে কাজ করছে। 

ইউনিট মূল্যের প্রবণতা

বিশ্ববাজারে গড় ইউনিট মূল্য বেড়েছে ২ দশমিক ০৩ শতাংশ।

বাংলাদেশের গড় ইউনিট মূল্য সামান্য কমেছে (৩ দশমিক ১০ ডলার থেকে ৩ দশমিক ০৮ ডলার, -০.৫৪%)। অর্থাৎ বাংলাদেশ তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক মূল্য ধরে রেখেই রফতানি বৃদ্ধি করেছে।

চীনের ইউনিট মূল্য কমেছে ১১ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা বাজার ধরে রাখার চেষ্টা নির্দেশ করে।

ভিয়েতনামের ইউনিট মূল্য প্রায় স্থিতিশীল (-০.৯০%)। 

এই চিত্র বলছে— বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম মূল্য ও পরিমাণ— দুই ক্ষেত্রেই প্রায় সমান্তরাল প্রবৃদ্ধি দেখালেও ভিয়েতনামের মোট বাজার অংশ এখনও অনেক বড়।

সুযোগ ও সতর্কবার্তা

২০২৫ সাল ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা— পারস্পরিক শুল্ক আরোপ, বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস এবং মার্কিন ভোক্তা বাজারে চাপের প্রেক্ষাপটে। তবু বাংলাদেশ দ্বি-অঙ্কের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে। 

এটি প্রমাণ করে— বাংলাদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য সোর্সিং গন্তব্য। বিশেষ করে চীনের অংশ হ্রাস পাওয়ায় যে বাজার শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তার একটি অংশ বাংলাদেশ দখল করতে সক্ষম হয়েছে। 

তবে বছরের শেষ প্রান্তিকে সামগ্রিক বাজার দুর্বল হওয়া একটি সতর্কবার্তা। ২০২৬ সালে যদি মার্কিন বাজারে চাহিদা আরও কমে, তবে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। 

সব মিলিয়ে বলা যায়, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে বাংলাদেশ শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো— মূল্য প্রতিযোগিতা বজায় রেখে উচ্চমূল্যের পণ্যে বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং বাজার অংশীদারিত্ব আরও সম্প্রসারণ করা। 

সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

বছরের শেষ প্রান্তিকে মার্কিন বাজারে আমদানি প্রবাহ কিছুটা দুর্বল হয়েছে। যদি ২০২৬ সালে ভোক্তা ব্যয় আরও কমে বা শুল্ক চাপ বাড়ে, তবে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

তবে সামগ্রিক চিত্র বলছে— বাংলাদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত ও নির্ভরযোগ্য সোর্সিং গন্তব্য। 

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, সামগ্রিক বাজার সংকুচিত হলেও বাংলাদেশের পারফরম্যান্স তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। তবে বছরের শেষ প্রান্তিকে বাজারের দুর্বলতা আগামী দিনের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত। 

সব মিলিয়ে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশ ইতিবাচক অবস্থান ধরে রেখেছে। এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত— বাজার অংশ আরও বাড়ানো, উচ্চমূল্যের পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা টেকসই করা। 

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন বৈশ্বিক শুল্ক কার্যকর হয়েছে ১০ শতাংশ হারে। এর আগে গত শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আরোপিত পাল্টা শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করেন। 

গত সপ্তাহের রায় প্রকাশের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নির্দেশ দেন। পরে তিনি তা ১৫ শতাংশে উন্নীত করার হুমকি দেন। তবে সেই শুল্ক এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেননি তিনি। ফলে শেষমেশ শুল্ক কার্যকর হচ্ছে ১০ শতাংশ হারে। 

মার্কিন প্রশাসন ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের ১২২ নম্বর ধারা অনুযায়ী এই শুল্ক আরোপ করছে। এই আইনে ১৫০ দিন পর্যন্ত কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই প্রেসিডেন্টের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা আছে। 




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button