Uncategorized

পুলিশের পোশাক পরিবর্তন ঘিরে নতুন বিতর্ক 

পুলিশের পোশাক পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে আবারও ইউনিফর্ম পরিবর্তন করা হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটে ফের আলোচনায় এসেছে পুলিশের পোশাক। 

সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতির পর বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি কেবল পুলিশের সংস্কারের অংশ, নাকি এর পেছনে রয়েছে আর্থিক অপচয়, দুর্নীতি অথবা অন্য কোনও কৌশলগত উদ্দেশ্য। অনেকের মতে, ইউনিফর্মের রঙ বদলালে ইমেজে পরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু আচরণ ও পেশাদারত্বে পরিবর্তন না এলে জনআস্থা ফেরানো কঠিন। 

পুলিশের দুটি শীর্ষ সংগঠন, বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন বর্তমান পোশাক পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে। 

ইতিহাস ও পরিবর্তনের ধারা 

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ পুলিশের ইউনিফর্মে একাধিকবার আংশিক ও পূর্ণাঙ্গ পরিবর্তন আনা হয়েছে। শুরুতে পুলিশের পোশাকের রং ছিল খাকি। পরে তা পরিবর্তন করে নীল করা হয়। পাশাপাশি ব্যাজ, লোগো ও মনোগ্রাম হালনাগাদ করা হয়। বিশেষায়িত ইউনিট— ট্রাফিক, শিল্পাঞ্চল, ট্যুরিস্ট পুলিশ, এপিবিএন ও এসপিবিএনের জন্য আলাদা রং ও নকশার পোশাক চালু করা হয়। 

পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করেন, আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক মানে উত্তরণ এবং পেশাদার ইমেজ গড়ে তুলতেই এসব পরিবর্তন আনা হয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে দৃশ্যমান পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন বার্তা দেওয়ার কৌশলও দেখা যায়। ইউনিফর্ম সেই দৃশ্যমান বার্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।  

ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন 

সংশ্লিষ্টদের মতে, পোশাক পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত বিপুল ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমানে পুলিশে সোয়া দুই লক্ষাধিক সদস্য কর্মরত। প্রত্যেক সদস্যের জন্য সাধারণত দুই থেকে তিন সেট ইউনিফর্ম প্রয়োজন হয়। প্রতিটি সেটের পেছনে আনুমানিক ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। সব মিলিয়ে ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যাজ, টুপি, বেল্ট ও জুতার খরচ, গুদামজাতকরণ, নতুন লোগো সংযোজন এবং বিতরণ ব্যয়। পুরোনো পোশাক বাতিল হলে সেগুলো নিলামে বিক্রি করা হয়। তবে সরকারি ক্রয় ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও প্রায়ই সামনে আসে। যা বিতর্ককে আরও জোরালো করে। 

মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা 

মাঠপর্যায়ে কর্মরত অনেক পুলিশ সদস্যের অভিযোগ, পোশাক পরিবর্তনের সময় নানা বাস্তব সমস্যার মুখে পড়তে হয়। সঠিক মাপ পাওয়া যায় না, কাপড়ের মান ভালো হয় না, দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। জুতার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাদের মতে, ডিজাইন বদলানোর চেয়ে কাপড়ের মান, আরামদায়কতা এবং সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা বেশি জরুরি। দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আরামদায়ক পোশাকই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। 

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ইউনিফর্ম একটি বাহিনীর দৃশ্যমান পরিচয় বহন করে, এটি ব্র্যান্ড, ঐতিহ্য ও কর্তৃত্বের প্রতীক। তবে কেবল রঙ বা নকশা বদলালে জনআস্থা ফিরে আসে না। আচরণ, জবাবদিহি ও পেশাদারত্বই শেষ পর্যন্ত আস্থার মূল ভিত্তি। 

বারবার পরিবর্তনে একদিকে যেমন আর্থিক চাপ বাড়ে, অন্যদিকে বাহিনীর স্থিতিশীল পরিচয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়, পোশাক পরিবর্তন কি বাস্তব প্রয়োজন, নাকি প্রতীকী পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা? এই বিতর্কের চূড়ান্ত উত্তর হয়তো নির্ভর করবে নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত, স্বচ্ছতা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব চাহিদার ওপর। 

কর্মকর্তাদের বক্তব্য 

বিসিএস পুলিশ কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বিবৃতিতে জানায়, বর্তমান ইউনিফর্ম প্রত্যাশিত গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে এবং বিষয়টি পুনর্বিবেচনা জরুরি।  

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানের সই করা বিবৃতিতে বলা হয়, “পুলিশের পোশাক কেবল একটি আনুষ্ঠানিক পরিধান নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, জনআস্থা, নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদার প্রতীক। দীর্ঘদিন ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী ইউনিফর্ম জনগণের কাছে আস্থা ও নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। নতুন ইউনিফর্মে সেই স্বতন্ত্রতা ও ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি বলে অনেক নাগরিক ও পুলিশ সদস্য মত দিয়েছেন।” 

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “অন্তর্বর্তী সরকারের নির্ধারিত নতুন পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের গায়ের রং, দেশের আবহাওয়া এবং মাঠপর্যায়ের মতামত যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। কাপড়ের গুণগত মান, আরামদায়কতা ও আবহাওয়াগত উপযোগিতা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। দিন-রাতে দৃশ্যমানতার বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব না পেলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে প্রভাব ফেলতে পারে। সংগঠনটি মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও জনমতের ভিত্তিতে পূর্বের অধিক গ্রহণযোগ্য ও স্বতন্ত্র ইউনিফর্ম পুনর্বহালের আহ্বান জানিয়েছে।” 

একই দাবিতে মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বিবৃতি দেয় বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির সভাপতি কামরুল হাসান তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক মনিরুল হক ডাবলুর সই করা বিবৃতিতে বর্তমান পোশাক পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়। তাদের বক্তব্যও প্রায় একই। বর্তমান ইউনিফর্ম প্রত্যাশিত গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। 

পোশাক পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি দাবির বিষয়ে অবহিত; তবে এ বিষয়ে এখনই কোনও মন্তব্য করতে রাজি নন। 

মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বিকালে সাংবাদিকরা বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে জানতে চাইলে তিনি পরে জানাবেন বলে মন্তব্য এড়িয়ে যান। 




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button