Uncategorized

কূটনীতির নতুন বসন্ত, নাকি সাময়িক উষ্ণতা?

একটি দৃশ্য কল্পনা করা যাক—দুই প্রতিবেশী ঘরের মাঝখানে দীর্ঘদিনের নীরবতা। দরজা বন্ধ, জানালা আধখোলা। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু কথা বলছে না। হঠাৎ একদিন দরজার সামনে রাখা হয় একটি ছোট্ট চিঠি যা সবার নজরে আসলো। এতে লেখা হলো “ভিসা সেবা আবার স্বাভাবিক হচ্ছে।” এই ছোট্ট সংবাদই যেন বড় কূটনৈতিক গল্পের সূচনা।

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের জাতীয় দৈনিকে এমনই খবর এলো বাংলাদেশ ও ভারতের ভিসা সেবা নাকি আবারও ধীরে ধীরে বাড়ানো হচ্ছে। বাংলাদেশ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর সুন্দর একটি ক্ষমতার পালাবদল দেখলো বিশ্ব। ক্ষমতায় এলো জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত নতুন রাজনৈতিক সরকার। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ছিল অস্থির। যদি এর অনেকগুলো সুনির্দিষ্ট কারণও ছিল। দুই দেশের ভেতরে নিরাপত্তা উদ্বেগ নিয়ে জনমনে যথেষ্ট সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিল তখন। উচ্চ বাক্যের পাশাপাশি সম্পর্কের অম্ল রসায়নও মঞ্চস্থ ছিল তখন। বন্ধ ছিল দুই-দেশের আলাপ করার বিস্তৃত কূটনৈতিক চ্যানেল। ভরসা ছিল শুধু মিডিয়া ডিপ্লোম্যাসি বা মিডিয়া সামনে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করা। তার ওপরে রাজনৈতিক টানাপোড়েন সব মিলিয়ে যে শীতলতা তৈরি হয়েছিল, সেটি কাটতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। কেউ কেউ এটিকে “বরফ গলা” বলছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বরফ কি সত্যিই গলছে, নাকি শুধু উপরিভাগে ফাটল ধরেছে?

কূটনীতিতে বড় ঘোষণা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ নয়। কখনও ছোট সিদ্ধান্তই বড় সংকেত দেয়। ভিসা সেবা স্বাভাবিক হওয়া তেমনই একটি সংকেত। সিলেটে ভারতের মিশনের সিনিয়র কর্মকর্তা অনিরুদ্ধ দাস যখন জানান যে পূর্ণাঙ্গভাবে ভিসা চালুর উদ্যোগ চলছে, তখন দিল্লি ও আগরতলায় বাংলাদেশের মিশনও সেবা বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়। এই পারস্পরিকতা কূটনীতির মৌলিক ভাষা—“আপনি এক ধাপ এগোলে আমিও এগোব।” অনেকটা সম্পূরক।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খারাপ হওয়ার অনেকগুলো কারণ উল্লেখ করা প্রয়োজন। প্রধানত হলো: শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার কড়া ভাষার বিবৃতি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়, দুইদেশের জনমতে বিরোধী অবস্থান, দূতাবাসে আক্রমণ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা, মিডিয়ার বাড়াবাড়ি সহ নানাবিধ বিষয়।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সবসময় শুধু রাষ্ট্রের সম্পর্ক নয়। এটি রাজনীতিরও সম্পর্ক। ক্ষমতার পালাবদল, নির্বাচন, রাজনৈতিক মেরুকরণ—সবকিছুই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি। নির্বাচনের আগে তা শেষ করতে তড়িঘড়ি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশির হাতে তুলে দেওয়া। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর শুল্কনীতি নিয়ে আদালতের নতুন রায়। ভারত নিজেদের স্বার্থে এসব ভালোভাবে নেইনি। আমরাও তাদের অবস্থান এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাদ দিয়ে শুধু রাজনৈতিক সম্পর্কের কেন্দ্র বিন্দুতে ছিলাম।

অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি সবই এখন কূটনীতির অংশ। গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা এসব শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়। এগুলো কৌশলগত অবস্থানও নির্ধারণ করে। ভারতের প্রধান উদ্বেগ হলো নিরাপত্তা। বাংলাদেশের প্রধান উদ্বেগ হলো সার্বভৌমত্ব ও জনমত। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে আস্থা। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা-এর সঙ্গে বৈঠক সেই বার্তাই দেয় দিল্লি “সব ডিম এক ঝুড়িতে” রাখতে চায় না।

অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সংখ্যালঘু নিরাপত্তার বিষয় তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ সম্পর্ক এখনও সংবেদনশীল। কথার ভেতরে বার্তা, বার্তার ভেতরে শর্ত।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ভারত বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে সুকৌশলে কাজ করেছে। যেমন, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, বেগম খালেদা জিয়া। সব সময় সম্পর্ক ছিল, কিন্তু স্বাচ্ছন্দ্য ছিল ভিন্ন। এটাই বাস্তবতা।  রাষ্ট্রের সম্পর্ক স্থায়ী, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা পরিবর্তনশীল। আজ বিএনপি-ভারত যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। চীনও যোগাযোগ রাখছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্র—ভারত, চীন, পশ্চিমা বিশ্ব—সবাই নজর রাখছে।

এই কূটনৈতিক গল্পের ভেতরে আরেকটি নীরব গল্প আছে তা হলো ভাষা ও শিক্ষা। কুকথার ফুলঝুরি সম্পর্ককে সবসময় অস্থিরতা তৈরি করে। দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে যখন কূটনীতির বাইরে ভাষা ব্যবহার করা হয়। তখন তৈরি হয় দ্বন্দ্ব ও সংঘাত। কেন এই প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ? কারণ কূটনীতি শেষ পর্যন্ত মানুষের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি—এসবই রাষ্ট্রের সফট পাওয়ার। যে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলরা নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা করতে পারে না বরং উসকানিমূলক কথা বলতে থাকে তখনই তার কূটনীতিও দুর্বল হয়ে পড়ে। একটি দেশের সাথে যেমন সম্পর্ক উন্নয়ন প্রয়োজন তেমনই নিজের স্বার্থে প্রতিবেশীর সাথে কৌশলী হয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করাও প্রয়োজন। মাঠ গরম করে মানসিক শান্তি পাওয়া যায় কিন্তু কূটনৈতিক বিজয় নয়। ভারত আমাদের তিন দিকে অবস্থিত। আবার ভারত ও আমাদের সাথে তাদের দীর্ঘতম সীমানা ভাগাভাগি করছে। ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক হওয়া উচিত ন্যায্য, সমতা ও জনগণের চাহিদার ভিত্তিতে। কোনও প্রলাপ দিয়ে নয়।

“বরফ গলছে”—এই বাক্যটি আকর্ষণীয়, কিন্তু অসম্পূর্ণ। বরফ কেন জমেছিল—এই প্রশ্নের উত্তর না দিলে সম্পর্ক স্থায়ীভাবে বদলায় না।

সমস্যাগুলো পরিচিত:

  • পানি বণ্টন
  • সীমান্ত হত্যা
  • বাণিজ্য ঘাটতি
  • রাজনৈতিক আস্থার সংকট
  • জনমতের দূরত্ব

এই সমস্যাগুলো সমাধান ছাড়া কূটনৈতিক বৈঠক শুধু প্রতীক হয়ে থাকে।

ইন্দো-বাংলা সম্পর্ক সবসময় আবেগ, রাজনীতি ও বাস্তবতার মিশ্রণ ছিল। ভিসা সেবা বাড়া, এনএসএ বৈঠক, রাজনৈতিক যোগাযোগ—এসব ইতিবাচক সংকেত। কিন্তু ইতিহাস বলছে, সংকেত মানেই সমাধান নয়। আজ সম্পর্ক এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে যেখানে কথা হচ্ছে, কিন্তু বিশ্বাস পুরোপুরি ফিরেনি। যেখানে দরজা খুলছে, কিন্তু সবাই সতর্ক। তাই প্রশ্নটি থেকেই যায়—ইন্দো-বাংলা সম্পর্কের ঢেউ কি কূটনৈতিক আলাপেই মিটবে? নাকি প্রয়োজন গভীর রাজনৈতিক আস্থা, জনসম্পর্ক ও বাস্তব সমস্যার সমাধান? এটা ঠিক বরফ গলার শব্দ আমরা শুনছি। কিন্তু বসন্ত এসেছে—এ কথা বলার সময় এখনও হয়নি।

লেখক: গণমাধ্যম শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button