আহসান এইচ মনসুরের দেড় বছরে রিজার্ভ বেড়েছে ১২ বিলিয়ন ডলার

গভর্নর হিসেবে আহসান এইচ মনসুরের দায়িত্বের শেষ দিন বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারে (আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে)। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, গ্রস হিসাবে রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। দেড় বছরের ব্যবধানে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ বৃদ্ধি করে দায়িত্ব ছাড়লেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
কোথা থেকে কোথায়
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেওয়ার দিন দেশের গ্রস রিজার্ভ ছিল ২৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম৬ অনুযায়ী ২০ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। এর আগে ৩১ জুলাই আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সপ্তাহে গ্রস রিজার্ভ ছিল ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম৬ হিসাবে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ সরকার পরিবর্তনের সময় থেকে দায়িত্ব ছাড়ার দিন পর্যন্ত বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। তবে এই সময়ে মাঝপথে বড় ধাক্কাও ছিল। ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর রিজার্ভ নেমে দাঁড়ায় ২৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে (বিপিএম৬ অনুযায়ী ১৮ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন), যা ছিল ওই সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থান।
পতনের পটভূমি
২০২১ সালে দেশের রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল। এরপর বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে চাপ এবং নীতিগত দুর্বলতার কারণে রিজার্ভে ধারাবাহিক পতন শুরু হয়। ২০২২ সাল থেকে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার করে রিজার্ভ কমেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়।
২০২৪ সালের এপ্রিল নাগাদ নিট রিজার্ভ নেমে আসে মাত্র ১২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে। অথচ ২০২৩ সালের জুনে তা ছিল ১৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার এবং একই বছরের ডিসেম্বরে ১৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন। ২০২৪ সালের ১৩ মে গ্রস রিজার্ভ দাঁড়ায় ২৩ দশমিক ৭১ বিলিয়নে (বিপিএম৬ অনুযায়ী ১৮ দশমিক ১৯ বিলিয়ন)। জুন শেষে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে গ্রস রিজার্ভ ২৬ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন এবং বিপিএম৬ হিসাবে ২১ দশমিক ৭৯ বিলিয়নে পৌঁছায়।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে আবারও চাপ বাড়ে। বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ, ডলারের বাজারে অস্থিরতা এবং আস্থাহীনতার কারণে ১১ নভেম্বর রিজার্ভ নেমে যায় ১৮ দশমিক ৪৬ বিলিয়নে (বিপিএম৬)।
রেমিট্যান্স সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানো
২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশ ভয়াবহ রেমিট্যান্স সংকটে পড়ে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রবাসীরা ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে সমস্যায় পড়েন। অনেকেই ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে হুন্ডির পথে ঝুঁকেন। ফলে ওই মাসে রেমিট্যান্স নেমে আসে মাত্র ১৯০ কোটি ডলারে, যেখানে জুনে ছিল ২৫৪ কোটি ১৬ লাখ ডলার—এক মাসে ৬৩ কোটির বেশি কমে যায়।
কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চিত্র বদলাতে শুরু করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলতি অর্থবছরে (জুলাই-২৩ ফেব্রুয়ারি) প্রবাসী আয় এসেছে ২১ হাজার ৯৯৯ মিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৮ হাজার ৩৮ মিলিয়ন ডলার—প্রায় ২১ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। শুধু ফেব্রুয়ারির ১ থেকে ২৩ তারিখ পর্যন্ত এসেছে ২ হাজার ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি।
বাজার থেকে ডলার কেনা ও বিনিময় হার
রিজার্ভ পুনর্গঠনে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনেছে। ২৪ ফেব্রুয়ারি ৮টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৮৭ মিলিয়ন ডলার কেনা হয় ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে। ফেব্রুয়ারি মাসে মোট কেনা হয়েছে ১ হাজার ৫৩৫ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট কেনা হয়েছে ৫ হাজার ৪৬৮ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলার।
সরকার পরিবর্তনের পর ডলারের বিনিময় হার কিছুটা ওঠানামা করলেও শেষ পর্যন্ত ১২৩ টাকার আশপাশে স্থিতিশীল হয়, যা বাজারে আস্থা ফেরাতে ভূমিকা রাখে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
গভর্নর পরিবর্তন ও নীতির প্রভাব
রাজনৈতিক অস্থিরতা, রেমিট্যান্সে ধস, হুন্ডির বিস্তার এবং বৈদেশিক ঋণের চাপে যখন অর্থনীতি টালমাটাল, তখন দায়িত্ব নেন আহসান এইচ মনসুর। তার আগে গভর্নর ছিলেন আবদুর রউফ তালুকদার। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নিয়ে বাস্তবমুখী বিনিময় হার নীতি, রেমিট্যান্স প্রণোদনা কার্যকর রাখা, আমদানি ব্যবস্থাপনায় সংযম এবং বাজারভিত্তিক ডলার ব্যবস্থাপনা জোরদার করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, কঠোর কিন্তু বাস্তবভিত্তিক নীতির কারণে ধীরে ধীরে আস্থা ফিরে আসে। প্রবাসী আয় বাড়ে, রপ্তানি আয় স্থিতিশীল হয় এবং বাজার থেকে ডলার কেনার সক্ষমতা তৈরি হয়। এর ফলেই ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে রিজার্ভে ধারাবাহিক উন্নতি দেখা যায়।
মূল্যায়ন
দেড় বছরের ব্যবধানে বিপিএম৬ হিসাবে প্রায় ১০-১২ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ বৃদ্ধি শুধু সংখ্যাগত অর্জন নয়; এটি ছিল আস্থা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া। ২০২১ সালের ৪৮ বিলিয়ন ডলারের চূড়া থেকে ২০২৪ সালের তলানিতে নেমে আসা অর্থনীতিকে আবার স্থিতিশীলতার পথে ফেরানো সহজ কাজ ছিল না।
বিদায়ের দিনে ৩২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ রেখে গেলেন আহসান এইচ মনসুর। সামনে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ, আমদানি চাপ ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার চ্যালেঞ্জ থাকলেও—এই পুনরুদ্ধার ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি শক্ত ভিত তৈরি করে দিল বলেই মনে করছেন।



