Uncategorized

নাসিমা আনিসের সাক্ষাৎকার

[নাসিমা আনিসের জন্ম ১৯৬২ সালের ১৬ নভেম্বর, বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলায়। তিনি এ বছর কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। 
উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে: বৃহন্নলা বৃত্তান্ত, নীলক্ষেত টু আজিমপুর স্কুল, চন্দ্রভানুর পিনিস, সাহসী খোকার গল্প, কুয়াশা কুয়াশা ভোর, ডুবসাঁতার, কলোনি এবং এমন মানুষ হতে চেয়েছিল।
ছোটোগল্প দিয়ে সাহিত্যে প্রবেশ, কিন্তু প্রথম গ্রন্থ উপন্যাস। তৃতীয় লিঙ্গ নিয়ে লেখা তার প্রথম উপন্যাস ‘মোহিনীর থান’ ২০০৬ সালে দৈনিক আজকের কাগজ (বর্তমানে জেমকন) প্রবর্তিত তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার পান।
এছাড়াও ‘চন্দ্রভানুর পিনিস’ উপন্যাসের জন্য দৈনিক সমকাল প্রবর্তিত নবীন কথাসাহিত্য পুরস্কার ২০০৯; চাঁদপুর সাহিত্য মঞ্চ আয়োজিত মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সাহিত্য পুরস্কার ২০২০; রণজিৎ বিশ্বাস-অভিষেক স্মৃতি সম্মাননা ২০২১; এবং বাংলা একাডেমির প্রবর্তিত আবু রুশদ সাহিত্য পুরস্কার ২০২৪ পেয়েছেন।
তিনি আজিমপুর গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি, ইডেন কলেজ থেকে এইচএসসি এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন চট্টগ্রাম কলেজ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। শিক্ষকতা করেছেন তিরিশ বছর।]

সেঁজুতি বড়ুয়া: প্রথমেই আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি এ বছর কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ার জন্য। খবরটা শুনে কী মনে হয়েছিলশুধুই ব্যক্তিগত আনন্দের, নাকি এত বছরের লেখালেখির স্বীকৃতি?

 নাসিমা আনিস: ধন্যবাদ, সেঁজুতি। আমার লেখক জীবন ২৩ বছরের—খুব দীর্ঘ নয়, আবার কমও নয়। আমি কখনো পুরস্কারের জন্য বিন্দুমাত্র ব্যস্ত ছিলাম না, তাই পুরস্কার পেয়ে বিস্মিত হয়েছি। হ্যাঁ, ব্যক্তিগত আনন্দই বেশি উপভোগ করছি। স্বীকৃতির কথা ততটা মনে আসেনি। আমি লিখছি, আমার লেখা কোনো না কোনোভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছাচ্ছে এটাই বড়ো। পাঠকই লেখকের স্বীকৃতি।

সেঁজুতি বড়ুয়া: আপনি পুরস্কারকে ব্যক্তিগত আনন্দের জায়গা থেকে দেখলেন, সেখান থেকে জানতে চাই, পুরস্কার কি লেখককে দায়বদ্ধ করে, নাকি আরো স্বাধীন করে?

নাসিমা আনিস: কোনোটাই করে না। লেখক লেখেন তার সামর্থ্য বা যোগ্যতা অনুসারে। সেখানে পুরস্কার কোনো ভূমিকা রাখে বলে মনে হয় না।

সেঁজুতি বড়ুয়া: আপনার লেখায় সময় ও সমাজের স্পষ্ট উপস্থিতি লক্ষ্য করি। এটা কি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে, নাকি সচেতন নির্মাণ?

নাসিমা আনিস: ভালো প্রশ্ন। আমি যখন কিছু পড়ি, প্রথমেই চাই সময়টাকে ধরতে। তখন সেই সময়ের আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে আমার যে পূর্বধারণা থাকে, তা আমাকে এগিয়ে রাখে লেখাকে সহজে আত্মস্থ করতে। এছাড়া লেখার সময় একটু সচেতন থাকি।

সেঁজুতি বড়ুয়া: নারী হিসেবে আপনার লেখায় নারী-চরিত্র কি বাস্তব জীবন থেকে উঠে আসে, নাকি কল্পনাপ্রসূত?

নাসিমা আনিস: প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দুই অভিজ্ঞতাই কাজ করে, কল্পনার খুব দরকার হয় না। এ সমাজে নারীকে অনেক কিছুর মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এই যাত্রার বেশির ভাগই অনভিপ্রেত, অসুখকর। কোনো নারীর পারিবারিক জীবনে যদি কম সাফারিং থাকে, তাকে তার পারিপার্শ্ব পুষিয়ে দেয় ব্যাপকভাবে। একটা সময় মনে হয় এসব আর শুনতে চাই না, দেখতে চাই না।

সেঁজুতি বড়ুয়া: আমরা যে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, লেখক হিসেবে তা নিয়ে কি কোনো দায়বোধ কাজ করে?

নাসিমা আনিস: সারা বিশ্বই ভয়াবহ রকমের অস্থির। আমাদের দেশে তা আরও বেশি। কোনো সচেতন মানুষই এর দায় এড়াতে পারে না। আমি সামান্য লিখতে পারি, লেখার মাধ্যমেই চেষ্টা করি কিছু বলতে।

সেঁজুতি বড়ুয়া: আপনি কি মনে করেন সাহিত্য সমাজকে বদলাতে পারে, নাকি মানুষকে তার ঘরটুকু দেখায়?

নাসিমা আনিস: প্রথমে বলি, নিজের ঘরটুকু বলতে আপনি কী বোঝাতে চান? লেখকের অভিজ্ঞতাই তো! লেখক সারা জীবন নিজের কথাই বলে, তার বলয় তো ছোট নয়! তার অনেক কিছু বলার আছে, সেটা অনেকের চেয়ে আলাদা বলেই তা বলতে চান।

সাহিত্য সরাসরি সমাজ বদলে অংশ নেয় না। মনোযোগী পাঠকের মননে দীর্ঘমেয়াদি ছাপ ফেলে। তখন কিছু কাজ হয়। শক্তিশালী সাহিত্য ইতিহাস পাল্টে ফেলার ক্ষমতা পর্যন্ত রাখে!

বলছি না, সাহিত্য পাঠকের খোলনলচে বদলে দেয় রাতারাতি, কিন্তু প্রভাব পড়ে।

একটা গল্প বলি, আমার উপন্যাস ‘মোহিনীর থান’ পড়ে আমার এক কলিগ তার বাচ্চাকে হিজড়াদের কোলে তুলে দেওয়ার আগে তাদের ঘরে বসতে দিয়েছিলেন, আপ্যায়ন করেছিলেন, অথচ তিনি আগে হিজড়াদের দেখলে ভয় পেতেন।

সেঁজুতি বড়ুয়া: আপনার আখ্যানভঙ্গি বেশ স্বতন্ত্র। এর পেছনে কোনো লেখক বা সাহিত্যধারার প্রভাব কাজ করেছে? এর আগে আপনি ‘কাগজ সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলেন। মোহিনীর থান লিখতে গিয়ে আপনার লক্ষ্য কী ছিল? শুধু একটি গল্প বলা, নাকি এর ভেতর দিয়ে সমাজের এমন অস্বস্তিকর বা আড়ালে থাকা বাস্তবতাকে সামনে আনা, যেগুলো নিয়ে আমরা সাধারণত কথা বলি না?

নাসিমা আনিস: আমি প্রচুর ছোটোগল্প পড়ি, পড়ি আর ভাবি কতভাবে একটা গল্প উপস্থাপন করা যায়, লেখক কত রকম করে ভাবেন!

আমার মননে ছোটগল্পের প্রভাব বেশি, যাইহোক ‘মোহিনীর থান’ নিয়ে খুব বেশি হলে একটি গল্পই লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ভেতরে ঢুকে আমি বেদনায় কুঁকড়ে যাই। আপনি বললেন না অস্বস্তি, বাস্তবিকই এক ক্ষমাহীন অপরাধবোধ কাজ করেছে তখন। মনে হয়েছে, ভদ্রবেশী আমরা ওদের কতটা আলাদা করে রেখেছি। তারা আমাদের বিশ্বাস পর্যন্ত করে না। কত রকমের বঞ্চনার শিকার হলে তারা এমন হয়, ভাবুন!

সেঁজুতি বড়ুয়া: আখ্যানের ভেতরে এই বেদনা ও নির্মাণের জায়গা থেকে জানতে চাই, লেখার সময় কোনটিকে বেশি গুরুত্ব দেন, অভিজ্ঞতা নাকি ভাষার সৌন্দর্য?

নাসিমা আনিস: অবশ্যই অভিজ্ঞতার। অভিজ্ঞতা পরম সম্পদ। আখ্যানের ভাষা আসে বিষয়কে অবলম্বন করে, ভাষার সৌন্দর্য আমার প্রিয় বিষয়।

সেঁজুতি বড়ুয়া: আজকাল তরুণদের মনোযোগ অনেক দ্রুত। ধীর ও গভীর লেখা তারা কি পড়ে বলে মনে করেন?

নাসিমা আনিস: দেখুন, কিছু সিরিয়াস পাঠক চিরকাল থাকেন। তবে তারা তরুণ কী বয়স্ক তা বয়স দিয়ে মাপা যায় না। সার্বিকভাবে পাঠচর্চা তরুণদের মধ্যে সংগত কারণেই কমে গেছে, যেমন বয়স্করাও অন্য মিডিয়া বেছে নিয়েছেন, হাতে হাতে এত বিনোদন থাকতে বই পড়বে কেন!

সেঁজুতি বড়ুয়া: সোশ্যাল মিডিয়া লেখককে যেমন দৃশ্যমান করেছে, তেমন কি ভঙ্গুরও করেছে?

নাসিমা আনিস: লেখকের যে রহস্য থাকে, অদেখার রহস্য, কত কৌতূহল—সেটা প্রায় চুকে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়া ভালো না খারাপ তা যেমন বলতে পারব না, তেমনি তাতে লেখক ভঙ্গুর হচ্ছে কিনা তাও বলতে পারছি না।

সেঁজুতি বড়ুয়া: সমসাময়িক কালের সাহিত্যে শহর ও গ্রামদুটোই কি সমান গুরুত্ব পাচ্ছে, নাকি কোনোটা বেশি?

নাসিমা আনিস: মনে হয় গ্রাম অনেকটাই উপেক্ষিত। অথচ সেখানে অনেক বেশি গল্প, অনেক বিচিত্র গল্প। বিচিত্র তাদের জীবন জীবিকা সংগ্রাম, তাই না!

সেঁজুতি বড়ুয়া: বাংলাদেশের নারী লেখকদের সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?

নাসিমা আনিস: নারী পুরুষ দুজনের একটাই বড় চ্যালেঞ্জ, তাদের জীবিকার জন্য লড়তে হয়। নারীকে বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে ঘরটাও সামলাতে হয়। এদিক দিয়ে আমাদের দেশের পুরুষরা খুব ভাগ্যবান!

সেঁজুতি বড়ুয়া: লেখালেখির শুরুতে আপনি যেমন ছিলেন, আর আজ আপনি যেমনএই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য কী?

নাসিমা আনিস: আমার বয়স বেড়ে চল্লিশ থেকে তেষট্টি হয়েছে। আর বইপত্র ও লেখকদের সঙ্গ, আর মমতা ও নির্মমতায় মেশানো এই পৃথিবীতে বসবাসের কারণে একটু অভিজ্ঞতাও বেড়েছে।

সেঁজুতি বড়ুয়া: অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত বেদনার সম্পর্কও থাকেব্যক্তিগত কষ্ট বা আঘাত লেখায় আনতে গিয়ে কখন বা কোথায় নিজেকে থামান?

নাসিমা আনিস: সততার সাথে বললে, থামাই। যেখানে পাঠক বিরক্ত হতে পারে, কিংবা মনে হয় আমার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে কিংবা লেখার সৌন্দর্য ম্লান হতে পারে তখন থামাই।

সেঁজুতি বড়ুয়া: আবার ফিরে যাই শুরুতে, এই পুরস্কারের পর পাঠকের কাছে আপনার নতুন প্রতিশ্রুতি কী?

নাসিমা আনিস: হয়ত আরেকটু সচল হতে চেষ্টা করব, প্রায় এক বছর মন খুব বিক্ষিপ্ত ছিল। এখন মনকে ধরেবেঁধে একত্র করব। বয়স বাড়ছে। সামনের কয়েকটা বছর লিখে যেতে চাই নিজেকে সামলে রেখে।

সেঁজুতি বড়ুয়া: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, এতক্ষণ সময় দেবার জন্য।

নাসিমা আনিস: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button