উদ্বেগ, স্বাধীনতা ও সোরেন কিয়ের্কেগার্ডের দর্শন

সোরেন কিয়ের্কেগার্ড (Søren Kierkegaard) ছিলেন গম্ভীর মুখ, দাড়ি-গোঁফে ঢাকা এক দুঃখভারাক্রান্ত দার্শনিক, যিনি অস্তিত্বের যন্ত্রণা নিয়ে অনবরত ভাষণ দিচ্ছেন। কিন্তু এই ডেনিশ মুখোশের আড়ালে যিনি, তিনি মোটেও এতটা বিষণ্ন নন। সোরেন কিয়ের্কেগার্ড ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী, প্রবল আবেগি, এবং প্রায়ই দুষ্টু এক চিন্তাবিদ। জীবনের অসংগতি আর হাস্যকর দ্বন্দ্বকে তিনি আমাদের সামনে এনে দাঁড় করাতে চেয়েছেন কল্পনা, ব্যঙ্গ, এমনকি হাসির ভেতর দিয়েই। তাঁর আহ্বান খুব সোজা। জীবনকে যেমন তেমনভাবে মেনে নেওয়া নয়, বরং তার অযৌক্তিকতাকে চোখে চোখ রেখে দেখা, এবং প্রয়োজনে তাতে হেসে ওঠা।
সোরেনের লেখালেখি অস্তিত্বের প্যারাডক্সগুলোর এক সাহিত্যিক অনুসন্ধান। দর্শন এখানে গল্প, ছদ্মনাম, ভাঙা ভাঙা কণ্ঠস্বরের এক মঞ্চ। Either/Or-এর কথাই ধরা যাক। সেখানে তিনি কাল্পনিক চিঠি, ডায়েরি, নৈতিক বক্তৃতার আড়ালে মানুষের চিরন্তন টানাপড়েনকে উন্মোচন করেন। ভোগ আর দায়িত্ব, আনন্দ আর কর্তব্য, বিশ্বাস আর সংশয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মানসিক কাঁপুনিটাই তাঁর মূল বিষয়। কোনো একপাক্ষিক সমাধান তিনি দেন না। বরং দেখান, বেছে নেওয়াটাই আসল সমস্যা। আর সেই বেছে নেওয়ার ভারটাই মানুষকে মানুষ করে তোলে।
এই গভীরতা সত্ত্বেও সোরেনের দর্শন সেই ভার হালকা করতে জানতেন। ব্যঙ্গ, আত্ম-বিদ্রুপ, সূক্ষ্ম হাস্যরস তাঁর লেখার ভেতরে সারাক্ষণ নড়াচড়া করে। তিনি যেন পাঠকের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলেন, হ্যাঁ, বিষয়টা সিরিয়াস, কিন্তু এতটাও নয় যে মুখ গম্ভীর করে বসে থাকতে হবে। তিনি আমাদের গভীরভাবে ভাবতে বলেন কীভাবে আমরা বাঁচি, কীভাবে সিদ্ধান্ত নিই, কীভাবে বিশ্বাস করি। কিন্তু সেই ভাবনাটা যেন কেবল কপালের ভাঁজে নয়, কোথাও একটা হালকা হাসির রেখাও রেখে যায়।
সোরেন কিয়ের্কেগার্ড ১৮১৩ সালে কোপেনহেগেনের এক বিত্তশালী পরিবারে জন্ম নেন। কিন্তু এই আরামদায়ক সামাজিক অবস্থান খুব তাড়াতাড়িই অর্থহীন হয়ে পড়ে। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সের মধ্যেই তিনি হারান তাঁর সাত ভাইবোনের মধ্যে ছয়জনকে, সঙ্গে দু’জন অভিভাবককেও। কার্যত তিনি একা হয়ে পড়েন পৃথিবীর ভিড়ে। মৃত্যুর সঙ্গে এই অকাল ও নির্মম মুখোমুখি হওয়া তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে স্থায়ীভাবে বদলে দেয়। ছোটোবেলা থেকেই আত্মঅনুসন্ধান, ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল, কিন্তু ব্যক্তিগত শোক সেই আকর্ষণকে এক গভীর, অন্ধকার কেন্দ্রে টেনে নিয়ে যায়। জীবনের ক্ষয় আর ভাঙনের অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তার প্রধান লেন্স হয়ে ওঠে।
এই শোকের ভেতর থেকেই সোরেন চারপাশের সচ্ছল, ভদ্র, খ্রিষ্টান মধ্যবিত্ত জীবনকে এক ধরনের ভ্রান্তি হিসেবে দেখতে শুরু করেন। তাঁর চোখে এই জীবন ছিল এক আরামদায়ক পর্দা, যা মানুষকে অস্তিত্বের প্রকৃত প্রশ্নগুলো থেকে দূরে রাখে। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারেন, মৃত্যু সবার জন্য অপেক্ষা করে আছে, আর তা যে কোনো মুহূর্তে এসে পড়তে পারে। এই সর্বক্ষণ উপস্থিত মৃত্যুবোধই সম্ভবত তাঁকে নিরবচ্ছিন্ন কাজের দিকে ঠেলে দেয়। সময় নষ্ট করার অবকাশ তাঁর ছিল না। মৃত্যুচিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে তিনি লেখাকেই জীবনের প্রধান কাজ বানিয়ে নেন।
১৮৪৩ থেকে ১৮৫৫ সালের মধ্যে সোরেন প্রকাশ করেন ২০টিরও বেশি বই, যেখানে তিনি তাঁর দর্শন ও আধুনিক জীবনের সমালোচনা নির্মাণ করেন। এই বিপুল প্রকাশনার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ ডায়েরি লেখক। তাঁর জার্নালগুলো তাঁর দার্শনিক অনুসন্ধানের ভেতরের মানচিত্র, যেখানে সন্দেহ, ভয়, বিশ্বাস আর আত্মসংলাপ একসঙ্গে ধরা দেয়।

১৮৪৩ সালে প্রকাশিত ‘Either/Or’ ছিল তাঁর প্রথম বড় বই। এখানে তিনি নান্দনিক এবং নৈতিক জীবনযাপনের ধারণাকে একেবারে নতুন ভঙ্গিতে তুলে ধরেন, কাল্পনিক চিঠিপত্রের একটি সংকলনের মাধ্যমে। পরের বছরই আসে ‘Philosophical Fragments’, যা তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে বিশ্বাস ও সত্যের প্রশ্নকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে। ১৮৪৬ সালে প্রকাশিত ‘Concluding Unscientific Postscript’ এই ধারাকেই বিস্তৃত করে, বিশেষ করে সত্য ও ব্যক্তিসত্তার সম্পর্ক নিয়ে তাঁর ভাবনাকে গভীর করে তোলে।
এই সব লেখায় সোরেন বারবার যুক্তি দেন যে উপরিভাগের ধর্মীয় বিশ্বাস মানুষকে এক ধরনের নকল জীবনে আটকে রাখে, যেখানে সমাজের নিয়ম মেনে চলাই মুখ্য, নিজের অস্তিত্বের প্রশ্ন নয়। প্রকৃত পরিতৃপ্তি আসে তখনই, যখন মানুষ জীবনের কঠিন সত্যগুলোর মুখোমুখি হয়। বিশৃঙ্খলা, যন্ত্রণা, মানব অবস্থার অযৌক্তিকতা এড়িয়ে গেলে চলবে না। বরং সেগুলোর ভেতর দিয়েই আবেগ ও উদ্দেশ্য নিয়ে বাঁচার জন্য সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সোরেন বিমূর্ত ধর্মতত্ত্ব ও শুষ্ক দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই সাহিত্যিক কৌশল ব্যবহার করেন, যেন পাঠককে অনিশ্চয়তার ভেতরে দাঁড় করানো যায়। তাঁর লেখায় একাধিক কণ্ঠ, ভাঙা দৃষ্টিভঙ্গি, আত্মবিরোধী অবস্থান দেখা যায়, কারণ বাস্তব জীবনও তেমনই। অর্থ খোঁজার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ ও দায়িত্বের উপর তাঁর জোরই পরবর্তীতে অস্তিত্ববাদের ভিত্তি তৈরি করে।
তবে সোরেনের অস্তিত্বগত উদ্বেগ তাঁর উত্তরসূরিদের চেয়েও গভীর। তিনি দেখেছিলেন, মানুষের শৃঙ্খলা ও অর্থের আকাঙ্ক্ষার সামনে মহাবিশ্ব সম্পূর্ণ উদাসীন। এই বৈপরীত্য, এই অযৌক্তিকতাকে গ্রহণ না করলে তাঁর মতে প্রকৃত ধর্মীয় বিশ্বাস সম্ভব নয়। বিশ্বাস এক ধরনের প্যারাডক্স। তবু এই বিশ্বাসের উৎস তিনি খুঁজে পাননি প্রতিষ্ঠিত গির্জার কাঠামোর মধ্যে। শৈশবে বাবার কাছ থেকে শোনা সরল গসপেল শিক্ষাতেই তিনি সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছিলেন।
‘Either/Or’-এ সোরেন কিয়ের্কেগার্ড দুটি পরস্পরবিরোধী জীবনভঙ্গিকে মুখোমুখি দাঁড় করান। নান্দনিক ও নৈতিক। তাঁর চোখে এগুলো মানুষের ভেতরের দুই মৌলিক প্রবণতার প্রতীক, যাদের মধ্যে টানাপড়েন চিরস্থায়ী, কিন্তু একা একা দু’টিই অসম্পূর্ণ। এখানে কোনও মসৃণ সমন্বয় নেই। আছে কেবল এক অনিবার্য সিদ্ধান্ত। এটা না ওটা।
নান্দনিক পরিসরে সোরেন রাখেন ব্যক্তিগত আবেগ, সৃজনশীলতা, আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ মূল্য। জীবন এখানে মুহূর্তের তীব্রতায় ধরা পড়ে। অনুভবই শেষ কথা। এর বিপরীতে নৈতিক পরিসর দাঁড়িয়ে থাকে সামাজিক দায়, নৈতিক বিধি, আর সার্বজনীন কর্তব্যের উপর। এখানে দায়িত্বের ধারাবাহিকতা মুখ্য। সোরেনের কাছে এই দুই জগৎ এক ছাতার তলায় আনা যায় না। এগুলো জীবনযাপনের প্রশ্নে এক স্থায়ী দ্বিধা তৈরি করে। কোন পথে হাঁটব।
এই দ্বন্দ্বকে তিনি গল্পের ভেতর দিয়ে দেখান। কাল্পনিক চিঠির মাধ্যমে। নান্দনিক জীবনের প্রতিনিধি ‘A’, এক নামহীন তরুণ। তার জীবন আনন্দ, প্রলোভন আর বিনোদনের চারপাশে ঘোরে। ফলাফলের তোয়াক্কা তার নেই। ভবিষ্যৎ তার কাছে এক অস্পষ্ট শব্দ, বর্তমানই একমাত্র বাস্তবতা।
নৈতিক জীবনের কণ্ঠস্বর জাজ ভিলহেল্ম। সংযম, পরিশ্রম, আত্মত্যাগ তার মূল বিশ্বাস। নাগরিক ও পারিবারিক দায় পালনই তার কাছে জীবনের অর্থ। ভিলহেল্মের চোখে নান্দনিক জীবনের তাৎক্ষণিক সুখ নৈতিকভাবে ফাঁপা। এই ভোগবাদ শেষ পর্যন্ত মানুষকে নিয়ে যায় হতাশায়, অর্থহীনতায়।
চিঠির এই বিন্যাসে সোরেন দ্বন্দ্বটাকে জীবন্ত করে তোলেন। চরিত্ররা নিজেরাই কথা বলে। পাঠক কোনো দূরবর্তী বিশ্লেষণ পড়ে না। সে ঢুকে পড়ে দুই দর্শনের ভেতরে। অনুভব করে সংঘর্ষটা সরাসরি। যুক্তির পাশাপাশি মানসিক টানাপড়েনও স্পষ্ট হয়।
এই চিঠিগুলো মানসিক মানচিত্র। নান্দনিক ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর থেকে ভাবনা, অনুভূতি, অর্থ নির্মাণের প্রক্রিয়া ধরা দেয়। কে কীভাবে জীবনের মানে বানায়, কোন মূল্যকে কেন্দ্রে রাখে, সবটাই ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়।
এই দ্বান্দিক কাঠামো গড়ে সোরেন কোনও পক্ষ নেন না। না নৈতিকতার পক্ষে সরাসরি ওকালতি, না ভোগবাদের সাফাই। তাঁর উদ্দেশ্য অন্য। পাঠককে এই টানাপড়েনের ভেতরে টেনে আনা। তাকে বাধ্য করা নিজের জীবনের প্রশ্নটা নিজেই তুলতে। আমি কী ধরনের জীবন বেছে নিচ্ছি। এই সাহিত্যিক কৌশল কল্পনাকে কাজে লাগায়, কিন্তু লক্ষ্য থাকে একটাই। জীবনের অর্থ কোথায়, আর সেই অর্থের জন্য আমি কতটা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
এইভাবে দেখলে, ভোগবাদী নান্দনিক মানুষটি আনন্দের পেছনেই ছুটে, আর জীবনের বড়ো প্রশ্নগুলো থেকে সচেতনভাবেই চোখ ফেরায়। কিন্তু সোরেন কিয়ের্কেগার্ড মনে করতেন, নিজেকে ব্যস্ত রাখাই কোনো মুক্তি নয়। অস্তিত্বগত উদ্বেগকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না, কারণ উদ্বেগ নিজেই মানব অবস্থার ভেতরে গাঁথা। মানুষ স্বাধীন। এই স্বাধীনতাই তাকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে দেয়, যা ভবিষ্যৎকে গভীরভাবে বদলে দিতে পারে। কিন্তু এই স্বাধীনতার মূল্য আছে। নিজের জীবনের দায় নিজের কাঁধে নিতে হয়। আর ঠিক তখনই, যখন আমরা জীবনের কঠিন মোড়ে এসে দাঁড়াই, আমি কে, কীভাবে বাঁচব, এই প্রশ্নগুলো সামনে আসে, তখনই গভীর উদ্বেগ জন্ম নেয়।
সোরেনের মতে, মানুষের স্বাধীনতার সঙ্গে অনিশ্চয়তা আর অনুশোচনার সম্ভাবনা অবিচ্ছেদ্য। জীবনের সিদ্ধান্তগুলো জটিল। কখনোই নিশ্চিত হওয়া যায় না, ঠিক পথটা বেছে নিয়েছি কিনা। ভুল করলে তার ফল হতাশা পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। এই অনিশ্চয়তা, এই ঝুঁকিই মানুষের ভেতরে উদ্বেগ তৈরি করে। এটা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। এটা মানুষ হওয়ার খরচা।
কিন্তু সোরেন এই উদ্বেগকে পলায়নসুলভ মনে করেননি। বরং তিনি একে বলেছিলেন স্বাধীনতার মাথা ব্যথা। এই দৃষ্টিতে উদ্বেগ স্বাধীনতা আর আত্মসচেতনতার চিহ্ন। উদ্বেগ আছে মানে আমরা যন্ত্র নই। একবার যদি আমরা এই উদ্বেগকে স্বীকার করি, তাকে কাজে লাগানো যায়। তখনই সম্ভব হয় আবেগি ও সত্যিকারের জীবন, যেখানে অনিশ্চয়তা আর ভঙ্গুরতাকে জেনেই আমরা বাঁচি।
নান্দনিক মানুষ উদ্বেগ থেকে পালায়। সে তাড়না আর বিনোদনের পেছনে ছুটে, আনন্দে নিজেকে ডুবিয়ে নিজের অস্বস্তিকে চাপা দেয়। শরীরের সুখ সত্যিই সুখকর, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই এড়িয়ে যাওয়াই শেষে নিয়ে যায় শূন্যতায়। জীবন তখন অর্ধেক বাঁচে। তার বিপরীতে নৈতিক বিচারক উদ্বেগের মুখোমুখি হয়। দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত আর অঙ্গীকারের মাধ্যমে সে জীবনের ভার গ্রহণ করে। এই পথেই সে গভীর অর্থ খুঁজে পায়।
তবু নৈতিক পরিসরও ঝুঁকিমুক্ত নয়। প্রশ্ন না করে কেবল কর্তব্য আর সামাজিক নিয়ম মেনে চললে জীবন ফাঁপা হয়ে উঠতে পারে। সমাজ বা কর্তৃপক্ষের দেওয়া বিধি মেনে নেওয়াই যদি সব হয়, তবে নিজের সত্তা গড়ে ওঠে না। তখন মানুষ নিয়ম মেনে চলে, কিন্তু নিজেকে খুঁজে পায় না।
এই কারণেই সোরেন মনে করতেন, কেবল ঐতিহ্য আর অনড় নৈতিক দাবির উপর দাঁড়ানো জীবন আবেগহীন হয়ে পড়ে। সেখানে আনন্দ নেই, সৃজনশীলতা নেই। মানুষ আটকে যায় বাহ্যিক উচিত আর কর্তব্যের জালে, অথচ সত্যিকারের আত্মপরিচয় অধরাই থেকে যায়। এমন অন্বেষী নৈতিক জীবন মানুষকে সেই স্বতঃস্ফূর্ততা থেকে বঞ্চিত করে, যা জীবনের অর্থ তৈরি করে।
তাহলে প্রকৃত সত্তা কোথায়। সোরেনের উত্তর স্পষ্ট। স্বাধীনতা আর দায়িত্বের মধ্যে সঠিক ভারসাম্যে। যেখানে নীতি আর কর্তব্য জীবনে কাঠামো দেয়, আবার একই সঙ্গে নিজের আবেগ আর বোধের জায়গা থেকে সামাজিক নিয়মকে প্রশ্ন করার স্বাধীনতাও থাকে। নৈতিক পরিসরকে সক্রিয়ভাবে গড়ে তোলাই তাঁর কাছে জীবনের সততা। আর এই পথ গড়ার অভিজ্ঞতাই উদ্বেগ। নিজের রাস্তা নিজে বানানোর অনুভব।
এতক্ষণ আমি সোরেন কিয়ের্কেগার্ডের নান্দনিক ও নৈতিক জীবনভঙ্গির সমালোচনা, এবং উদ্বেগকে মানব স্বাধীনতার অনিবার্য উপসর্গ হিসেবে তাঁর ব্যাখ্যা নিয়ে কথা বলেছি। কিন্তু এখানেই তাঁর প্রভাব শেষ নয়। বাস্তবে, অনেকেই তাঁকে আধুনিক অস্তিত্ববাদী দর্শনের সূচনাকারী বলে মনে করেন। কারণ তিনি যে প্রশ্নগুলো গভীরভাবে তুলেছিলেন, সেগুলোই পরবর্তী দার্শনিকদের চিন্তার ভিত গড়ে দেয়।
একটি স্পষ্ট উদাহরণ হলো তাঁর চিন্তার সঙ্গে Georg Wilhelm Friedrich Hegel-এর দর্শনের সংঘর্ষ। হেগেল তার কয়েক দশক আগেই এক সুবিন্যস্ত, যুক্তিনির্ভর দর্শন নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে বাস্তবতা থিসিস, অ্যান্টিথিসিস ও সিন্থেসিসের নিয়ম মেনে ধাপে ধাপে বিকশিত হয়। সোরেনের কাছে এই ব্যবস্থাবদ্ধ চিন্তা ছিল অত্যধিক বিমূর্ত এবং মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বিচ্ছিন্ন। তাঁর আপত্তি ছিল একেবারে মৌলিক। মানুষ কোনো তাত্ত্বিক সূত্রের অংশ নয়। তাই তিনি জোর দিয়ে বলেন, সত্য কোনো সর্বজনীন কাঠামোর বিষয় নয়। সত্য বিষয়গত। তা ব্যক্তির অভিজ্ঞতা আর দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভরশীল।
এই কারণেই সোরেনের দর্শনে সার্বজনীন নিয়মের চেয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ ও দায়িত্ব অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নিজের জীবনকে কীভাবে গড়ব, সেই সিদ্ধান্তের ভার কোনো বিমূর্ত যুক্তির হাতে তুলে দেওয়া যায় না। যুক্তিবাদী নিরপেক্ষতার এই প্রত্যাখ্যান পরবর্তীকালে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে Friedrich Nietzsche, Martin Heidegger, এবং Jean-Paul Sartre-এর মতো চিন্তাবিদদের উপর। তাঁরা সকলেই বিমূর্ত তত্ত্বের বদলে বাস্তব মানব অস্তিত্ব ও অভিজ্ঞতাকে চিন্তার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
নীৎশে সোরেনের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ধারণাকে আরও তীব্র করে তোলেন ‘Thus Spoke Zarathustra’ কিংবা ‘Beyond Good and Evil’-এর মতো রচনায়। হাইডেগারের ‘Being and Time’ মানব অস্তিত্বকে বিশ্লেষণ করে প্রামাণিকতা ও উদ্বেগের ধারণার মাধ্যমে, যার শিকড় আংশিকভাবে সোরেনেই নিহিত। আর সার্ত্রের বিখ্যাত ঘোষণা, অস্তিত্ব সারাংশের আগে আসে, মূলত সোরেনের সেই ধারণাকেই প্রতিধ্বনিত করে, যেখানে মানুষ নিজের জীবন ও মূল্যবোধ নিজেই গড়ে তোলে।
এখানেই শেষ নয়। জীবনের অযৌক্তিকতা আর যন্ত্রণার মুখে সোরেনের প্রতিক্রিয়াটাও ছিল ব্যতিক্রমী। তাঁর মতে, এর একমাত্র উপযুক্ত উত্তর হলো এক ধরনের ব্যঙ্গাত্মক গ্রহণ। তিনি একবার বলেছিলেন, সমগ্র অস্তিত্বই আমাকে হাসায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তীতে গভীর প্রভাব ফেলে অ্যাবসার্ড ধারার লেখকদের উপর, বিশেষ করে Albert Camus-এর ক্ষেত্রে। ‘The Myth of Sisyphus’-এ কামু সোরেনের এই ব্যঙ্গাত্মক চ্যালেঞ্জের প্রশংসা করেন অর্থহীনতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর এক সাহসী ভঙ্গি হিসেবে।
দর্শনের গ্রন্থ হিসেবে ‘Either/Or’ অস্তিত্ববাদের কয়েকটি মূল স্তম্ভ গড়ে তোলে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কেন্দ্রীয়তা, সিদ্ধান্ত ও দায়িত্বের অগ্রাধিকার, জীবনের অনিশ্চয়তা ও অযৌক্তিকতার স্বীকৃতি, এবং সেইসবের মাঝেও অর্থের প্রতি আবেগি অঙ্গীকার। এই জীবনঘনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গির জন্যই সোরেনকে অনেক সময় বিষণ্ন ডেন বলা হয়, যিনি অস্তিত্ববাদকে দুনিয়ার সামনে এনে দেন।
সোরেন নিজে হয়ত কল্পনাও করতে পারেননি তাঁর লেখার প্রভাব। প্রায় দুই শতাব্দী পরে তাঁর চিন্তা আমাদের নাড়া দেয়, কারণ মানুষের অবস্থান খুব একটা বদলায়নি। আজও আমরা একই অস্তিত্বগত প্রশ্নে জর্জরিত। একই পরস্পরবিরোধী টানের মধ্যে আটকে আছি। কীভাবে বাঁচব, এই প্রশ্ন এখনও খোলা। আর সেটাই বারবার নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে, ঠিক যেভাবে সোরেন চেয়েছিলেন।
এতক্ষণ আমি আলোচনা করেছি কীভাবে সোরেন কিয়ের্কেগার্ড নান্দনিক ও নৈতিক জীবনভঙ্গির সীমা উন্মোচন করেন, কীভাবে উদ্বেগকে তিনি স্বাধীনতার মূল্য হিসেবে বোঝান, এবং কীভাবে তাঁর চিন্তা পরবর্তী অস্তিত্ববাদকে প্রভাবিত করে। এবার আসা যাক বইটির অদ্ভুত শিরোনামে। ‘Either/Or’। এই নামটাই আসলে মানুষের অস্তিত্বগত অবস্থার সারসংক্ষেপ।
জীবন মানেই একের পর এক মোড়। প্রতিটা মোড়ে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, আর সেই সিদ্ধান্তই ভবিষ্যৎ গড়ে দেয়। কিন্তু এখানে কোনো সহজ উত্তর নেই। যেটাই বেছে নাও, ত্যাগ আর উদ্বেগ অনিবার্য। বিয়ে করলে উদ্বেগ আছে। না করলেও আছে। পেশাগত সাফল্যের জন্য ছুটলে উদ্বেগ। না ছুটলেও উদ্বেগ। পছন্দ বদলায়, উদ্বেগ বদলায় না।
এই কারণেই Either আর Or শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান দেয় না। এগুলো দেখায় যে মানুষ যাই বেছে নিক, উদ্বেগ তার সঙ্গেই থাকবে। উদ্বেগ হলো মানুষ হওয়ার অংশ। আর এই অযৌক্তিক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে সোরেনের মতে একমাত্র যুক্তিসংগত প্রতিক্রিয়া হলো হেসে ওঠা। জীবনের মুখের উপর হেসে ওঠা। নিজেকেও অত সিরিয়াসলি না নেওয়া। অর্থহীনতার ভেতরেই রস খুঁজে নেওয়া। তিনি লিখেছিলেন, সমগ্র অস্তিত্বই আমাকে হাসায়।
এই অযৌক্তিকতাকে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করার ভঙ্গিই পরবর্তীতে বিশ শতকের অ্যাবসার্ড সাহিত্যের ভিত তৈরি করে। এখানে এসে পড়েন Franz Kafka আর Albert Camus। কামুর ‘The Myth of Sisyphus’-এ এই দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। সেখানে তিনি যন্ত্রণা আর অর্থের প্রশ্ন নিয়ে গভীর চিন্তা করেন, গ্রিক পুরাণের সিসিফাসের কাহিনি ব্যবহার করে। দেবতাদের শাপে সিসিফাস চিরকাল একটি পাথর পাহাড়ের চূড়ায় ঠেলে তোলে, আর প্রতিবারই তা গড়িয়ে নীচে নেমে যায়।
এই রূপকে অন্ধ বিশ্বাসই আসলে অযৌক্তিক। কামু বলেন, আমাদের কল্পনা করতে হবে সিসিফাসকে সুখী হিসেবে। কারণ অর্থহীনতার মাঝেই যদি হাসতে শেখা যায়, তবে সুখ বাইরে থেকে আসতে হয় না। সেটা ভেতরেই তৈরি হয়।
এইখানেই Either/Or-এর মূল ইঙ্গিত। নান্দনিক ভোগবাদ পূর্ণ নয়। নৈতিক কর্তব্যও নয়। তবু আমাদের বেছে নিতে হয়। আবার বেছে নিতে হয়। জীবনের সঙ্গে সঙ্গে। কোনো চূড়ান্ত অর্থ নেই। তাই হয়তো হালকা হওয়াই ভালো। অস্তিত্বের অযৌক্তিকতার ভেতরেই এক ধরনের বিশ্বাসের ঝাঁপ দেওয়া।
সোরেন কিয়ের্কেগার্ড আমাদের সাহস দিয়েছিলেন অনিশ্চয়তা আর ভঙ্গুরতাকে মেনে নিয়ে আবেগি ও সৎভাবে বাঁচার। তবে কপালে ভাঁজ ফেলে নয়। চোখে একচিলতে দুষ্টু হাসি নিয়ে। শেষ পর্যন্ত কোনো প্রস্তুত উত্তর নেই। আছে শুধু সেই উত্তরগুলো, যেগুলো আমরা নিজেরাই বানাই। তাই পছন্দ করেন। স্বাধীনভাবে করেন। আর অযৌক্তিকতাকে মেনে নিয়ে, একটু হেসে, জীবনটা বেছে নেন।



