কি করলে ওয়াশিংটন-তেহরান চুক্তিতে পৌঁছাবে, জানালো ইরানি কর্মকর্তা

তৃতীয়বারের মতো আলোচনার টেবিলে বসেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। দু’পক্ষেরই প্রচেষ্টা চুক্তিতে পৌঁছানো। কি করলে ওয়াশিংটন ও তেহরান চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে তা স্পষ্ট করেছেন ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তার মতে, ওয়াশিংটন নিউক্লিয়ার ও নন নিউক্লিয়ার ইস্যু আলাদা করতে পারলেই চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে। তিনি বলেছেন, জেনেভায় তৃতীয় দফার আলোচনার সময় দু’পক্ষের গ্যাপগুলো আরও কমানো প্রয়োজন। খবর রয়টার্সের।
প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থাটি জানিয়েছে, ওমানের মধ্যস্থতায় বৃহস্পতিবার জেনেভায় বৈঠকে বসেছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্প জামাতা জেরার্ড কুশনার। সকালে আলোচনার একটি সেশন শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কয়েক দশক ধরে বিরোধের পর এ আলোচনা এমন সময়ে হচ্ছে যখন কিনা মধ্যপ্রাচ্যে বৃহৎ সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে। চুক্তি না করলে ইরানে হামলার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র।
তীব্র ও গম্ভীর আলোচনা
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যিদ বদর আলবুসাইদি জানান, আলোচনার টেবিলে উভয় পক্ষ সৃজনশীল ও ইতিবাচক ধারণা বিনিময় করেছে। তিনি অগ্রগতির আশা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আলোচনাকে ‘তীব্র ও গম্ভীর’ বলে বর্ণনা করেছেন।
ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “নতুন কিছু ধারণা এসেছে, যেগুলো তেহরানের সঙ্গে পরামর্শ করা প্রয়োজন। তবে, এখনও কিছু ফাঁক রয়ে গেছে, সেগুলো কমানো দরকার।”
ওয়াশিংটনের বিশ্বাস, তেহরান পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে চায়। তারা চাই, ইরান যেন সব ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। তবে, এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জ্বালানি তৈরি করে। একইসঙ্গে এটি অস্ত্রের ওয়ারহেড তৈরির উপাদানও উৎপাদন করতে পারে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক বোমা তৈরির ইচ্ছা থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে। বৃহস্পতিবারের আগে তেহরান থেকে বলা হয়েছিলো, তারা আলোচনায় নমনীয়তা দেখাবে। গত রবিবার রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তেহরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার স্বীকৃতির বিনিময়ে অনির্দিষ্ট নতুন ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনাকে আরও বিস্তৃত করে অন্যান্য বিষয়েও নিয়ে যেতে চায়। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং অঞ্চলটির সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তাদের সমর্থন।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, “ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকৃতি একটি বড় সমস্যা। তবে, এটি সমাধান করতে হবে। কারণ, এ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শুধুমাত্র আমেরিকাকে আঘাত করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।”
বৃহস্পতিবার প্রেস টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘায়ি বলেন, “পারমাণবিক ইস্যু এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ওপর আলোচনা হবে। তেহরান নমনীয়তা দেখিয়েই আলোচনার টেবিলে বসছে।”
এবারের আলোচনায় যদি কোনও অগ্রগতি না ঘটে তাহলে আগামী দিনগুলোতে সংঘাতের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্টের পরিচালক আলি ভাইজ। অবশ্য তিনি আশাও ব্যক্ত করেছেন। তার মতে, বৃহস্পতিবার অধিবেশন মুলতবি হওয়ার পরও আলোচনা চলবে, যা ইঙ্গিত দেয় অগ্রগতির কিছু সুযোগ রয়েছে।
ট্রাম্পের হুমকি
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ইরানের হাতে ১০ থেকে ১৫ দিনের সময় আছে। যদি তারা চুক্তিতে না পৌঁছায় তাহলে তাদের জন্য খুব খারাপ অবস্থা অপেক্ষা করছে। স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণেও তিনি ইরান প্রসঙ্গ টেনেছেন। সম্ভাব্য আক্রমণের যুক্তি উপস্থাপন করে তিনি কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান। তবে, তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না।
গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে মিলিত হয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছিল। প্রতিক্রিয়ায় তেল আবিবেও হামলা চালিয়েছিল তেহরান। এরপর গত জানুয়ারিতে ইরানের বিক্ষোভের সময় ট্রাম্প চাপ হস্তক্ষেপের হুমকিও দেন।
এরপর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বাড়ান ট্রাম্প। ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে জেট ফাইটার, যুদ্ধজাহাজ ও ক্যারিয়ারসহ মোতায়েন করেছে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে এ অঞ্চলে সবচেয়ে বড় সামরিক উপস্থিতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রতিক্রিয়ায় ইরানও হুমকি দিয়ে রেখেছে। হামলা হলে পাল্টা জবাবের কথা জানিয়েছে তারা। যা একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। এর জেরে অনেক দেশ মধ্যপ্রাচ্যের কিছু স্থানে তাদের কূটনৈতিক কর্মীদের পরিবারের সদস্য এবং অপ্রয়োজনীয় কর্মচারীদের ফিরিয়ে নিচ্ছে। এমনকি নাগরিকদের ইরানে ভ্রমণ না করতে পরামর্শ দিচ্ছে। এ তালিকায় অস্ট্রেলিয়া, সার্বিয়া, পোল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন, সাইপ্রাস, ভারত, সিঙ্গাপুর, জার্মানিসহ আরও কিছু দেশ রয়েছে।



