দুর্বল প্রস্তুতি নিয়েই শুরু হয়েছে অমর একুশে বইমেলা

নানা অনিশ্চয়তা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে শুরু হওয়া অমর একুশে বইমেলার দ্বিতীয় দিনেও প্রস্তুতির ব্যাপক ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে। গতকাল (২৬ ফেব্রুয়ারি) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। বরাবরের মতো রাজধানীর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শুরু হয়েছে সর্বজন প্রিয় অমর একুশে বইমেলা। তবে বইমেলার মতো এতো বড় উৎসব অনেকটা দুর্বল প্রস্তুতি নিয়েই শুরু হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অগোছালো মেলা প্রাঙ্গণ
শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিনে বইমেলা ঘুরে দেখা যায়, অনেক বইয়ের স্টল এখনও নির্মাণাধীন। যেগুলো তৈরি হয়েছে সেগুলো গোছানো হয়নি। আবার অনেক স্টলে দেখা যায় অল্প কিছু বই এনে রেখেছেন, পাশাপাশি স্টল প্রস্তুতের কাজও চলছে। কেবল স্টল প্রস্তুতই না, মেলার ভেতরে স্টলের সামনের রাস্তাও অনেক জায়গায় তৈরি করা হয়নি পুরোপুরি। এখনও চলছে প্রস্তুতির কাজ। এতে করে ধূলোময় হয়ে উঠেছে মেলার পরিবেশ। আবার এই ধূলো নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষের কোনও পদক্ষেপও চোখে পড়েনি।
এদিকে বইমেলায় যে লিটলম্যাগ চত্ত্বর করা হয়েছে তার বেশিরভাগ স্টলই ফাঁকা পড়ে আছে। এই চত্ত্বর প্রাঙ্গণের মাটিও রয়েছে অগোছালো— উঁচুনিচু। যা প্রস্তুতি ঘাটতির প্রতিফলনই বলা চলে।
বইমেলার এমন পরিবেশ যথাযথ প্রস্তুতির ঘাটতি বলেই মনে করছেন বইমেলায় আসা দর্শনার্থীসহ মেলায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন প্রকাশনার প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ।
ক্ষুব্ধ প্রকাশকরা
অন্যপ্রকাশের পরিচালক সিরাজুল কবির চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “পরিবেশের যে অবস্থা— সেটা বড় একটা সমস্যা। আমার স্টলসহ বিভিন্ন স্টলের সামনে ময়লা-আবর্জনা, মাটির স্তুপ, ইট পড়ে আছে। অনেককেই বলতে শুনেছি এগুলোকে কোথায় ফেলবে কেউই জানে না। কর্তৃপক্ষ থেকে কাউকে বলা হচ্ছে না যে— এই ময়লা আবর্জনাগুলো কোথায় ফেলা হবে। এটা একটা সমস্যা। অনেক ধুলোবালি আছে, কিন্তু পানি ছিটানোর ব্যবস্থা আমরা এখনও পর্যন্ত দেখতে পাইনি।”
এসময় স্টলের স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, “অনেক স্টলের সামনে যথেষ্ট জায়গা রয়েছে, সুন্দর হাঁটার পথ রয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে তেমনটা নেই। তবে আমরাও তো সমান সুবিধাটা পেতে চাই।”
বইমেলা কী পরিকল্পনাহীনভাবে শুরু হয়েছে এমনটা মনে করছেন কিনা জানতে চাইলে সিরাজুল কবির বলেন, “অবশ্যই পরিকল্পনাহীনভাবে হয়েছে। আপনি এত বড় একটা জিনিস করবেন, যারা এটার স্টেকহোল্ডার তাদের সঙ্গে-তো বসতে হবে। এটা কাদের জন্য করা হচ্ছে? আমরা যারা প্রকাশক তাদের জন্যই-তো করা হচ্ছে। তাদের সঙ্গে-তো বসা উচিত ছিল।”
কথাপ্রকাশের ইনচার্জ ইউনুস আলী বলেন, “এবারের বইমেলায় শুরু থেকে জটিলতা ছিল। অনেক প্রকাশক মনে করেছিলেন যে, ঈদের পরে মেলা অনুষ্ঠিত হবে। মেলা নিয়ে একাধিকবার তারিখও পরিবর্তন হয়েছে। এটা নিয়ে প্রকাশকদের মধ্যে একরকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। যে-কারণে প্রস্তুতিতে কিছুটা ভাঁটা পড়েছে। তবে আমাদের ৯০ শতাংশ কাজ কমপ্লিট হয়েছে।”
অয়ন প্রকাশনের ইনচার্জ তাহমিনা মমতাজ বলেন, “আমাদের স্টলের নাম্বার পেতে, মাপজোখ করতে দেরি হয়ে গিয়েছে। আমাদের প্রথমে প্যাভিলিয়ন ছিল। পরে সেটা ভেঙে স্টল করা হয়েছে। মাত্র তিনদিন ধরে আমরা স্টলের কাজ শুরু করেছি। আশা করছি দ্রুত কাজ শেষ হয়ে যাবে এবং সবগুলো বই আমরা স্টলে তুলতে পারবো।”
পাঠক প্রতিক্রিয়া
মেলায় ঘুরতে আসা আরাফাত হোসেন বলেন, “প্রতিবারই বইমেলায় একাধিকবার আসা হয়। এবার আজকেই প্রথম আসা হয়েছে। আমার মনে হচ্ছে প্রোপার প্রিপারেশন না নিয়েই মেলা শুরু করা হয়েছে। বেশিরভাগ বইয়ের দোকানগুলো প্রস্তুত হয়নি। আর প্রচুর ধূলাবালি। আরেকটু গুছিয়ে শুরু করা উচিত ছিল বলে আমার মনে হয়।”
আরেক দর্শনার্থী রিফাত হোসেন বলেন, “এবারের মেলা আমার কাছে অগোছালো মনে হচ্ছে। প্রতিবার যেরকম আমরা বুঝতে পারি— কোথায় কি আছে, এবার সেরকমটা না।”
তুলনামূলক দর্শনার্থী কম, তবুও আশায় প্রকাশকরা
এবারের বইমেলা অন্যবারের তুলনায় ভিন্ন। প্রতিবার ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ থেকেই শুরু হয় বইমেলা। জাতীয় নির্বাচনের কারণে এবার মেলা শুরু হয়েছে ফেব্রুয়ারির একেবারে শেষে। এবারের মেলার সময়সীমা মাত্র ১৮ দিন (১৫ মার্চ পর্যন্ত)। একই সঙ্গে পবিত্র রমজান মাস চলায় দর্শনার্থীদের উপস্থিতি অন্য বছরের তুলনায় প্রথম শুক্রবারে অনেক কম দেখা গেছে। তবে প্রকাশকরা আশা করছেন, আগামী কয়েক দিনে মেলা জমে উঠবে।
অন্যপ্রকাশের পরিচালক সিরাজুল কবির চৌধুরী বলেন, “সবকিছুর পরে যে মেলাটা হচ্ছে তাতে আমরা আশাবাদী। এটা প্রকাশকদের একটা সাকসেস, যে মেলাটা আমরা করতে পারছি। আজকে শুক্রবার মেলার দ্বিতীয়দিন। দেখা যাক সামনে কী হয়।”
এসময় দর্শনার্থীদের উপস্থিতি নিয়ে কথাপ্রকাশের ইনচার্জ ইউনুস আলী বলেন, “এবার রমজান মাসে মেলা হওয়ায় পাঠক ও দর্শনার্থীদের ভিড় তুলনামূলকভাবে অনেক কম। তবে আমরা আশা করছি, সামনের দিনে পাঠক এবং দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বাড়বে।”
উল্লেখ্য, অমর একুশে বইমেলা প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে। তবে ছুটির দিনে, শুক্রবার-শনিবার মেলা শুরু হবে সকাল ১১টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত চলবে বাঙালির এই প্রাণের উৎসব অমর একুশে বইমেলা।



