নাম ঘোষণা করেও পুরস্কার না দেওয়ার দায় কার?

পুরস্কারের তালিকায় নাম ঘোষণা করেও পুরস্কার না দেওয়ার মতো ঘটনা এবারই প্রথম ঘটায়নি বাংলা একাডেমি। তবে এর আগে ঘোষণা দিয়ে স্থগিত করলেও এবার সেই ঘোষণাটুকুও না দেওয়ায় পুরস্কার গ্রহণ করতে অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে ফিরে যেতে হয়েছে কবি মোহন রায়হানকে। এর আগে কখনও নাম ঘোষণা করে পরের তালিকায় নাম বাদ দেওয়া, নাম ঘোষণা করে পুরস্কার নেওয়া জন্য আসতে নিষেধ করার মতো ঘটনাগুলোর সাক্ষী এই বাংলা অ্যাকাডেমিই। বৃহস্পতিবারের (২৬ ফেব্রুয়ারি) ঘটনার পর আবারও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে, বাংলা অ্যাকাডেমির যোগ্যতা নিয়ে। প্রশ্ন উঠেছে, মহাপরিচালকের অবস্থান নিয়ে। কবি, সাহিত্যিক ও সমালোচকরা বলছেন— ঘোষণার পর নানা সমালোচনা উঠলে সেগুলো সামাল দিতে না পেরে নিজেদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার এই দায় এককভাবে বাংলা একাডেমিরই।
এবছর ২৩ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। সেখানে কবিতায় মোহন রায়হানের নাম ঘোষণা হয়। নির্ধারিত দিনে তিনি পুরস্কার গ্রহণের জন্য অনুষ্ঠান স্থলেও উপস্থিত হন। তাকে জানানোর ন্যূনতম সৌজন্যটুকু করা হয়নি। এবারই প্রথম নয়, ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৪’ -এর জন্য গত বছর ২০২৫ সালের ২৩ জানুয়ারি ১০ জন কবি ও লেখকের নাম ঘোষণা করা হয়। বাংলা একাডেমির নির্বাহী পরিষদের অনুমোদনে মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজমের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে এ পুরস্কার ঘোষণা করেন। পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন— কবিতায় মাসুদ খান, কথাসাহিত্যে সেলিম মোরশেদ, নাটক ও নাট্যসাহিত্যে শুভাশিস সিনহা, প্রবন্ধ/গদ্যে সলিমুল্লাহ খান, শিশুসাহিত্যে ফারুক নওয়াজ, অনুবাদে জি এইচ হাবীব, গবেষণায় মুহম্মদ শাহজাহান মিয়া, বিজ্ঞানে রেজাউর রহমান, মুক্তিযুদ্ধে মোহাম্মদ হাননান এবং ফোকলোরে সৈয়দ জামিল আহমেদ।
এরপর পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল শিশুসাহিত্যে ফারুক নওয়াজকে বাদ দিয়ে। যাদিও আগেই নাম ঘোষণার পর স্থগিত হওয়া ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৪’ প্রত্যাখ্যান করেন কথাসাহিত্যিক সেলিম মোরশেদ।
দেশের সংস্কার হবে, বাংলা একাডেমির সংস্কার কেন নয়? প্রশ্ন তুলে তৎকালীন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ফেসবুকে জানিয়েছিলেন, বাংলা একাডেমি পুরস্কারের জন্য ঘোষিত নামের তালিকা স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি এটাও বলা প্রয়োজন, যে আজব নীতিমালা এ ধরনের উদ্ভট এবং কোটারি পুরস্কারের সুযোগ করে দেয়, সেগুলা দ্রুত রিভিউ করা আমাদের প্রথম কাজ। পাশাপাশি বাংলা একাডেমি কীভাবে পরিচালিত হবে, কোন সব নীতিতে চলবে— এই সব কিছুই দেখতে হবে। একাডেমির আমূল সংস্কারের দিকে আমরা যাবো এখন।
শুধু নাম স্থগিত নয়, পুরস্কার ঘোষণা দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে, পুরস্কারপ্রাপককে পুরস্কার না নেওয়ার জন্য আসতে অনুগ্রহ করা ও পুরস্কার বাসায় পৌঁছে দেওয়ার মতো কাজও করেছে বাংলা একাডেমি। ২০১৬ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণার পর থেকে অনুবাদে নিয়াজ জামানকে দেওয়া পুরস্কার নিয়ে শুরু হয় তোলপাড়। কী করে বঙ্গবন্ধুর খুনি মেজর ডালিমকে প্রশংসা করে লেখা কলামের লেখককে এই পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হলো! সে বিষয়ে সমালোচনার ঝড় যখন তুঙ্গে তখন বাংলা একাডেমি বলছিল, এটা কারও একক ভুল নয়, সম্মিলিত ভুল। পুরস্কারেরর জন্য ৩০ জনের সুপারিশ কমিটি থেকে পাঁচ জনের বাছাই কমিটি ঘুরে অনুমোদন কমিটির কাছে নাম আসে। এখানে ভুলটি বাংলা একাডেমির একার নয়।
একের পর এক এ ধরনের ঘটনার বিষয়ে সমালোচনা করে বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) কবি মারুফ রায়হান তার ফেসবুকে লেখেন, ‘‘আজ মোহন ভাইয়ের অসম্মানে মনে হচ্ছে আমিই অপমানিত হলাম, অথচ কদিন আগে তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্তি আমার কাছে ছিল শুধুই একটি সংবাদ। যদিও পুরস্কার ঘোষণার পর পরই দেখেছি, ফেসবুকে তাঁর কাব্যবিচার ও চরিত্র অবমাননা আরম্ভ হতে। পুরস্কার প্রত্যাশীদের ঈর্ষা ও পরশ্রীকাতরতা তাতে নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। মোহন রায়হান কেমন কবি কতটুকু কবি, সে বিবেচনা এখন মোটেও জরুরি নয়। প্রাসঙ্গিক হলো—— এ সমাজ যে প্রতিষ্ঠানকে জাতির মননের প্রতীক অভিধা দিয়ে শ্লাঘা অনুভব করেছে, সেটি কালেকালে যে বিনষ্ট ও বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী হয়ে উঠেছে, সেটি বুঝতে পেরে করণীয় নির্ধারণ করা। যদি সত্যিই আমরা দেশটাকে ভালোবাসি এবং তার অগ্রসরতা চাই। কবিতা অনেক রকম। কবিতা হতে পারে রাজনৈতিক কিংবা অরাজনৈতিক, সেজন্যে কবিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো চলে না। যে সমাজে এমনটা হয়, বুঝতে হবে সে সমাজ এখনও অশিক্ষিত, রুচিহীন, অসংস্কৃত কূপমণ্ডূকদের দখলে। সংকীর্ণ দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পুরস্কারের জন্য নমিনেশন দেওয়া, পুরস্কার উৎপাদন এবং প্রদান, এসবকিছুর সঙ্গে সাহিত্যের, প্রকৃত মর্যাদার এবং সুশোভন স্বীকৃতির বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই।’’
পুরস্কার যারা দেন তাদের কর্তব্য কী?
পুরস্কারের তালিকা করার সময়ে বিতর্ক এড়াতে ন্যূনতম বিবচেনায় নিতে হয় কোন বিষয়গুলো জানতে চাইলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এটা নিয়ে আমরা এখন ভাবছি, যেহেতু গতবারও ঘটেছে এবারও ঘটেছে। বিদ্যমান যে নীতিমালা, সেই নীতিমালা অনুযায়ী সম্পূর্ণ বিষয়টি বাংলা একাডেমির কমিটিগুলো করে। পুরস্কার ঘোষণার আগে মন্ত্রণলয়ও এটা জানতে পারে না। এখন আমরা চিন্তা করছি কোন কারণে এটা ঘটছে, এটা আমরা দেখবো।’’
কেন এরকম হলো জানতে চাইলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আযম বলেছিলেন, ‘‘মোহন রায়হানের কবিতা ও লেখালেখি সম্পর্কে কিছু অভিযোগ ওঠায় কর্তৃপক্ষ সেই অভিযোগ খতিয়ে দেখার স্বার্থে সাময়িকভাবে পুরস্কার স্থগিত করেছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়ে গেলে আমরা অবিলম্বে এটা জানাবো।’’
পরপর দুই বছর তালিকা করে স্থগিত করতে হলো, এটার পেছনে বাংলা একাডেমির দায় কতটা প্রশ্নে মোহাম্মদ আযম বলেন, ‘‘বাংলা একাডেমি আসলে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা, কিন্তু বাজেট সূত্রে কিংবা কিছু কর্মকাণ্ড সূত্রে এটি মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ সরকারের সঙ্গে যোগসূত্র আছে। অনেক কাজ আমরা নিজের মতো করে করতে পারি, আমরা গত বছর করেছি। কিন্তু কোনও কোনও ব্যাপার যখন এস্ট্রিমলি (চরমভাবে) পাবলিক হয়ে ওঠে, তখন সেটার ব্যাটারে সরকার ও মন্ত্রোলয়ের হস্তক্ষেপের বিষয়ও কিন্তু আছে। সেই হস্তক্ষেপ যখন ঘটে, তখন সেটার দায় বাংলা একাডেমির ওপর, বাংলা একাডেমির ডিজির ওপর। নির্বাহী পরিষদসহ স্বাধীন সত্তার বলে বাংলা একাডেমি স্বায়ত্তাশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে সেগুলোর দায় বাংলা একাডেমির ওপর অবশ্যই পড়ে। ফলে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে অবশ্যই সরকার ও মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপের সুযোগ আছে।
পুরস্কারের জন্য নাম ঘোষণার পর যদি অভিযোগ ওঠে এবং বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী পুরস্কার দেওয়া যায়— সেক্ষেত্রে সরকার বা মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে যাবে কিনা, এমন প্রশ্নে অধ্যাপক মোহাম্মদ আযম বলেন, ‘‘যদি পিছিয়ে না যাওয়া যেতো, তাহলে সবচেয়ে ভালো হতো সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশে এমন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বাস্তবে অস্তিত আছে, সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে জনসমর্থন কিংবা শক্তি, বাজেট কোনও প্রতিষ্ঠানের আছে?’’
পুরস্কার স্থগিতের পর সর্বশেষ নতুন কোনও সিদ্ধান্ত এখন আছে কিনা, জানতে চাইলে অধ্যাপক আযম বলেন, ‘‘এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আমি আশা করি, এর একটা ভালো সমাধান হবে।’’



