চূড়ান্ত লড়াইয়ের পথে বাঙালির অগ্রযাত্রা

আজ ১ মার্চ। মহান স্বাধীনতার মাসের প্রথম দিন। ইতিহাসের পাতা বলছে, এই মাসেই বাঙালির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম চূড়ান্ত রূপ নেয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে। ইতিহাসের পাতায় এই মাসটি কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা নয়, বরং বাঙালির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের চূড়ান্ত রূপ এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির এক মহাকাব্যিক সময়।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের যে স্ফুলিঙ্গ বাঙালির হৃদয়ে জ্বলে উঠেছিল, তা ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ঐতিহাসিক ছয় দফা এবং ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এক প্রদীপ্ত শিখায় পরিণত হয়। সেই সংগ্রামের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে আসে একাত্তরের মার্চ, যা বাঙালির জীবনে নিয়ে আসে স্বাধীনতার অমোঘ বার্তা।
১৯৭১ সালের ১ মার্চ দেশজুড়ে আন্দোলন ছিল তুঙ্গে। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এক বেতার ভাষণে ৩ মার্চের নির্ধারিত গণপরিষদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। তিনি যুক্তি দেন, একটি প্রধান দল পিপলস পার্টিসহ কয়েকটি দল অধিবেশনে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানোয় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ঘোষণাটি প্রচার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফুঁসে ওঠে ঢাকা। সে সময় তৎকালীন ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম) পাকিস্তান বনাম বিশ্ব একাদশের ক্রিকেট ম্যাচ চলছিল। খবর পাওয়ামাত্র দর্শকরা খেলা ছেড়ে রাজপথে নেমে আসেন। পল্টন, গুলিস্তানসহ পুরো ঢাকা শহর মুহূর্তেই বিক্ষোভের নগরীতে পরিণত হয়। আন্দোলন আর দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, রূপ নেয় স্বাধীনতার সংগ্রামে।
১ মার্চের সেই স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভই মূলত স্বাধীনতার দাবিকে অনিবার্য করে তোলে। এরপর টানা ২৫ দিনের উত্তাল সময় পার করে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হামলা চালায়। শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। এর আগে ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান, বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান-এ ঐতিহাসিক ভাষণে জাতিকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান শেখ মুজিবুর রহমান।
২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।
বাঙালির আত্মমর্যাদা, বীরত্ব আর শৌর্যবীর্যের প্রতীক এই মার্চ মাসটি প্রতিবছর আমাদের মনে করিয়ে দেয় শোষণমুক্ত এক নতুন মানচিত্রের জন্মকথা। মার্চ তাই শুধু স্মৃতির মাস নয়, এটি বাঙালির আত্মমর্যাদা ও মুক্তির চূড়ান্ত অঙ্গীকারের মাস।



