কঠিনতম পরীক্ষার মুখে খামেনি-পরবর্তী ইরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কয়েক ঘণ্টার বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষ প্রায় সব নেতৃত্বই প্রাণ হারিয়েছেন। তবে যে বিশাল নিরাপত্তা বলয় এই শাসনব্যবস্থাকে দীর্ঘ চার দশক ধরে টিকিয়ে রেখেছে, সেই ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি এখনও অক্ষত। খামেনি-পরবর্তী ইরানে এই বাহিনী এখন তাদের অস্তিত্বের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ খবর জানিয়েছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর গঠিত আইআরজিসি কেবল ২ লাখ সদস্যের একটি আধা-সামরিক বাহিনীই নয়, এটি ইরানের একটি সমান্তরাল সরকার ও বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি। তাদের নিজস্ব সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা বিভাগ এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মতো প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বিস্তার করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, আইআরজিসিকে পুরোপুরি পরাজিত করা না গেলে তারা অবৈধ কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর হামলা অব্যাহত রাখবে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা বাশা রিপোর্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলবাশা বলেন, খামেনির মৃত্যু এই শাসনের ভেতরে থাকা চরমপন্থি ও সামরিক মনোভাবাপন্ন অংশকে আরও শক্তিশালী করবে। এই মুহূর্তে ক্ষমতা নেওয়ার মতো কোনও সুসংগঠিত বিরোধী দল ইরানে নেই। ফলে সংস্কারের বদলে ইরান একটি রুদ্ধদ্বার সামরিক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আইআরজিসি ও পুলিশ বাহিনীকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে ‘শান্তিপূর্ণভাবে মিশে যাওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, আইআরজিসির অনেক সদস্য আর যুদ্ধ করতে চাচ্ছেন না এবং সাধারণ ক্ষমা খুঁজছেন। তবে আইআরজিসি একটি চরমপন্থি আদর্শিক বাহিনী হওয়ায় তাদের পক্ষ ত্যাগের সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
শনিবার হামলার পরপরই তেহরানের রাস্তায় চেকপোস্ট বসিয়ে কড়া পাহারা শুরু করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে স্বেচ্ছাসেবী আধা-সামরিক বাহিনী বাসিজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অবস্থান নিয়েছে।
এদিকে, চেইন অব কমান্ড বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া ঠেকাতে আইআরজিসি তাদের ‘মোজাইক ডিফেন্স’ কৌশল পুনরুজ্জীবিত করেছে। এই কৌশলে স্থানীয় কমান্ডাররা কেন্দ্রীয় নির্দেশ ছাড়াই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা বিদেশি আক্রমণ মোকাবিলায় ইরানকে আরও সহনশীল করে তোলে।
খামেনির মৃত্যুতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনির নাম শোনা গেলেও প্রবীণ নেতাদের মতো তার সেই প্রভাব নেই।
অন্যদিকে, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে ইরানের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে আইআরজিসির প্রভাব বাড়ায় দেশটি একটি সামরিক একনায়কতন্ত্রের দিকে মোড় নিতে পারে। এক্ষেত্রে আইআরজিসির দুই সাবেক কমান্ডার, জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সচিব আলি লারিজানি এবং বর্তমান পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ ক্ষমতার প্রধান দাবিদার হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন।
আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা দেশের ভেতর ও বাইরের সব ষড়যন্ত্র রুখে দিতে এবং আক্রমণকারীদের শাস্তি দিতে বদ্ধপরিকর। তবে বিশ্লেষক সাইদ গোলকার বলেন, যদি আইআরজিসির মাথাগুলো কেটে ফেলা হয়, তবে এর শরীর কাঁপতে শুরু করবে।



