Uncategorized

খামেনির মৃত্যুসহ ইরানে ইসরায়েলের হামলার দ্বিতীয় দিনে যা যা জানা গেলো

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার বিষয়টি তেহরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করার পর দ্বিতীয় দিন শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা-পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে।  ইরানের সরকার পতনের লক্ষ্যে হামলার দ্বিতীয় দিনে ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা এখন ‘তেহরানের হৃদপিণ্ডে’ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রবিবার বলেছেন, ইরান যদি প্রতিশোধের হুমকি বাস্তবায়ন করে তাহলে তেহরানকে ‘এমন শক্তি দিয়ে আঘাত করা হবে যা আগে কখনও দেখা যায়নি’। তিনি ইরানের জনগণকে আহ্বান জানিয়েছেন, ‘তোমাদের দেশ ফিরিয়ে নাও’।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন খামেনির হত্যাকে ‘মানবিক নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক আইনের সব নিয়মের নির্লজ্জ লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছেন।

শনিবারের প্রাথমিক হামলায় ইরানের বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহসহ অন্তত ৪০ জন কমান্ডার নিহত হয়েছেন বলে ইসরায়েল দাবি করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা পরিষদের বৈঠক চলাকালে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আবদুলরাহিম মুসাভি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ, বিপ্লবী গার্ডের প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর এবং প্রতিরক্ষা পরিষদের প্রধান আলি শামখানিসহ একাধিক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। আরও নিহতের নাম আসতে পারে বলে জানানো হয়েছে।

খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এই পরিষদে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি এজেই এবং সিনিয়র ধর্মীয় নেতা আলিরেজা আরাফি রয়েছেন। তারা সর্বোচ্চ নেতার উত্তরসূরি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করবেন।

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৫০-এ দাঁড়িয়েছে বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা এইচআরএএনএ (হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি) জানিয়েছে, শনিবারের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলায় ইরানের ১৮টি প্রদেশে অন্তত ১৩৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ২০০ জন আহত হয়েছেন।

তেহরানে শোকাহত মানুষ। ছবি: এপি

প্রতিশোধ হিসেবে ইরান ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। দুবাই, কাতারের রাজধানী দোহা, বাহরাইন ও কুয়েতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। তেল আবিবের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রায় ৪০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৯ জন নিহত হয়েছেন। কাতারে তিনজন ও কুয়েতে একজন নিহতের খবর পাওয়া গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, চলমান সংঘাতে তাদের ৩ সেনা নিহত ও আরও ৫ জন আহত হয়েছে।

বাহরাইনে অবস্থিত একটি ঘাঁটিতে প্রায় ৩০০ ব্রিটিশ সেনার কাছাকাছি কয়েকশ গজের মধ্যে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাত হেনেছে বলে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি জানিয়েছেন।

ইসরায়েল, কাতার, সিরিয়া, ইরান, ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইন তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়ায় লাখ লাখ যাত্রী বিমানবন্দরে আটকে পড়েছেন বা ফ্লাইট অন্যত্র ঘুরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

জাহাজগুলো জানিয়েছে, ইরানি নৌবাহিনীর পরিচয় দিয়ে একটি রেডিও সম্প্রচারে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে তেলের দাম তীব্রভাবে বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে তেহরান থেকে প্রণালির অবস্থা নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিপিং রুট।

ইরান খামেনির হত্যার প্রতিশোধে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় কয়েকটি শহরে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা এখন তেহরানের হৃদয়স্থলে ইরানি ‘শাসনের’ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে।

রবিবার সকালে মধ্য ইসরায়েল ও অধিকৃত পশ্চিম তীরের কিছু অংশে একাধিকবার সাইরেন বেজেছে। দোহা, দুবাই ও মানামায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলের এরবিল বিমানবন্দরের কাছেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের সেনা রয়েছে।

দুবাইয়ে ইরানের ড্রোন হামলা। ছবি: এপি

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘আমাদের লাল রেখা’ অতিক্রম করেছেন এবং তারা ‘পরিণতি ভোগ করবেন’। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে বলেছেন, ইরান যেন প্রতিশোধ না নেয়, নইলে তাদের ‘আগে কখনও না দেখা শক্তি’ দিয়ে আঘাত করা হবে।

ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলি লারিজানি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী’দের সতর্ক করে বলেছেন, তারা যদি কোনও পদক্ষেপ নেয় তাহলে কঠোর জবাব পাবে। তিনি জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে ট্রাম্প ইরানের জনগণকে সরকার দখলের আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘এটি ইরানের জনগণের জন্য দেশ ফিরে পাওয়ার একক সর্বশ্রেষ্ঠ সুযোগ’।

তেহরানের কেন্দ্রস্থলে হাজার হাজার মানুষ খামেনির মৃত্যুতে শোক পালন করছেন। ১৯৮৯ সাল থেকে দেশ শাসন করা এই নেতার ছবি হাতে কালো পোশাক পরা শোকার্তরা ‘আমেরিকা মুর্দাবাদ’ ও ‘ইসরায়েল মুর্দাবাদ’ স্লোগান দিচ্ছেন। তবে কিছু মানুষ ছাদে দাঁড়িয়ে আনন্দ করছেন, বাঁশি বাজাচ্ছেন ও উল্লাস করছেন।

ইরানের সমর্থনে বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। পাকিস্তানের করাচিতে মার্কিন কনস্যুলেটে হামলার চেষ্টা হয়েছে। এ সময় সংঘর্ষে ৯ জন নিহত হন। ইরাকের বাগদাদের মার্কিন দূতাবাস অঞ্চলে প্রবেশের চেষ্টা হয়েছে। ভারত-শাসিত কাশ্মীরেও হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান তাদের ‘পরমাণু কর্মসূচি পুনর্গঠনের’ চেষ্টা করায় এই হামলা চালানো হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার অনুরোধে সোমবার জাতিসংঘের পারমাণবিক সংস্থা একটি জরুরি বৈঠক ডেকেছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button