Uncategorized

স্কুল শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক: আঁচল ফাউন্ডেশন

বিদায়ী বছরে সারা দেশে মোট ৪০০ জন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় স্কুল শিক্ষার্থী আছেন; যা ১৯০ জন এবং মোট পরিসংখ্যানের ৪৭ দশমিক ৪০ শতাংশ।

শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) আঁচল ফাউন্ডেশন পরিচালিত শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা: ক্রমবর্ধমান সংকট শীর্ষক সমীক্ষার এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন– যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের কনসালট্যান্ট ফরেন্সিক সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. আনিস আহমেদ, যুক্তরাষ্ট্রের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সৈয়দ মাহফুজুল আলম, টাঙ্গাইল মেডিক্যাল কলেজের সহকারী পরিচালক ডা. মারুফ আহমেদ খান, প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর সোহেল মামুন এবং আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট তানসেন রোজ।

আঁচল ফাউন্ডেশন জানায়, দেশের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে ১০০টি স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে প্রতি বছরের মতো ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে। 

সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত বছর আত্মহত্যা করা ৪০০ জনের মধ্যে ১৯০ জন স্কুল শিক্ষার্থী। এই চিত্র বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা সাধারণত কৈশোরের সূচনালগ্নে থাকে, যখন মানসিক ও আবেগীয় বিকাশ অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে অবস্থান করে। কলেজ পর্যায়ে ৯২ জন বা ২২ দশমিক ৮ শতাংশ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৭ জন বা ১৯ দশমিক ১০ শতাংশ এবং মাদ্রাসায় ৪৪ জন বা ১০ দশমিক ৭২ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।

লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণ

লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সর্বমোট ৪০৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৪৯ জন বা ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী এবং ১৫৪ জন বা ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ পুরুষ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। আরেকটু গভীর পর্যালোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার হার পুরুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। স্কুলে ১৩৯ জন নারী ও ৫১ জন পুরুষ; কলেজে ৫০ জন নারী ও ৪২ জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পুরুষ শিক্ষার্থীর সংখ্যা সামান্য বেশি; যেখানে ৪১ জন পুরুষের বিপরীতে ৩৬ জন নারী শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। মাদ্রাসায় ২৪ জন নারী ও ২০ জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছে। এই পার্থক্য ইঙ্গিত করে যে কৈশোরে মেয়েরা সামাজিক ও পারিবারিক চাপ, সম্পর্কগত টানাপোড়েন এবং আবেগীয় সংকটে বেশি ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে, যেখানে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে পুরুষ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থান ও আত্মপরিচয় সংকট বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

কারণভিত্তিক বিশ্লেষণ

কারণভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হতাশা ২৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং অভিমানে ২৩ দশমিক ৩২ শতাংশ সবচেয়ে বড় দুটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। হতাশার ক্ষেত্রে নারী ৬২ জন বা ৫৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ ও পুরুষ ৫০ জন বা ৪৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ, অভিমানে নারী ৫৮ জন বা ৬১ দশমিক ৭০ শতাংশ ও পুরুষ ৩৬ জন বা ৩৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। একাডেমিক চাপে ৭২ জন আত্মহত্যা করেছে; যার অধিকাংশই স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থী; যেখানে নারী শিক্ষার্থীদের সংখ্যাই সর্বাধিক। এটা শতাংশের হিসেবে ৭০ দশমিক ৮৩ শতাংশ। প্রেমঘটিত কারণে ৫৩ জন বা ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ, পারিবারিক টানাপোড়েনে ৩২ জন বা ৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ, মানসিক অস্থিতিশীলতায় ২৫ জন বা ৬ দশমিক ২০ শতাংশ এবং যৌন নির্যাতনের কারণে ১৪ জন বা ৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। সাইবার বুলিংয়ের কারণেও একজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।

বিভাগভিত্তিক চিত্র

বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ১১৮ জন বা ২৯ দশমিক ২৪ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব, নগরায়ণ, প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা এবং পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। চট্টগ্রাম বিভাগে ৬৩ জন তথা ১৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ, বরিশাল বিভাগে ৫৭ জন বা ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং রাজশাহী বিভাগে ৫০ জন তথা ১২ দশমিক ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এ পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে, এটি কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত একটি সংকট।

বয়সভিত্তিক তথ্যচিত্র

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণ দেখা গেছে, ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার ৬৬ দশমিক ৫০ শতাংশ; যা মোট আত্মহননকারীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। তাদের মধ্যে ১৯০ জন নারী ও ৭৮ জন পুরুষ। কৈশোরকালীন আবেগীয় অস্থিরতা, পরিচয় সংকট, প্রেমঘটিত টানাপোড়েন, একাডেমিক চাপ এবং সামাজিক তুলনা সব মিলিয়ে এ বয়সটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ২২ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে; যেখানে পুরুষের সংখ্যা ৫১ এবং নারীর সংখ্যা ৪০। ১ থেকে ১২ বছর বয়সী ৪৪ জন বা ১০ দশমিক ৯ শতাংশ শিশুর আত্মহত্যা আমাদের জন্য গভীর হৃদয়বিদারক বাস্তবতা। এত অল্প বয়সে এমন চরম সিদ্ধান্ত সমাজের নৈতিক ও মানসিক দুর্বলতাকেই তুলে ধরে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বিশদ চিত্র

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ৭৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪৪ জন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের, ১৭ জন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের, মেডিক্যাল কলেজের ৬ জন ও ১০ জন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থী। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীর চেয়ে পুরুষ শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার বেশি; যা মোট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ। এটি অনেকটাই প্রতিযোগিতা, সেশনজট, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী ও পুরুষ সমান হারে আত্মহত্যা করেছে; যা মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের উদ্বেগজনক চিত্র।

স্কুল শিক্ষার্থীদের মধ্যে অভিমান ও একাডেমিক চাপ প্রধান কারণ

১৯০ জন স্কুল শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ ৩২ দশমিক ৬১ শতাংশ শিক্ষার্থী অভিমানের কারণে আত্মহত্যা করেছে। একাডেমিক চাপ ছিল দ্বিতীয় প্রধান কারণ; যা মোট ঘটনার ২৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এছাড়া হতাশা থেকে আত্মহত্যা করেছে ১৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থী। প্রেমঘটিত কারণে আত্মহত্যার হার ৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং পারিবারিক টানাপোড়েনে ৮ দশমিক ৪২ শতাংশ। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে ৪ দশমিক ২২ শতাংশ এবং মানসিক অস্থিতিশীলতার কারণে ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণে বোঝা যায়, আবেগনিয়ন্ত্রণ ও পারিবারিক সহায়তার ঘাটতি স্কুল পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

স্কুল শিক্ষার্থীদের মধ্যে অভিমান ও একাডেমিক চাপ প্রধান কারণ

১৯০ জন স্কুল শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ ৩২ দশমিক ৬১ শতাংশ শিক্ষার্থী অভিমানের কারণে আত্মহত্যা করেছে। একাডেমিক চাপ ছিল দ্বিতীয় প্রধান কারণ; যা মোট ঘটনার ২৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এছাড়া হতাশা থেকে আত্মহত্যা করেছে ১৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থী। প্রেমঘটিত কারণে আত্মহত্যার হার ৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং পারিবারিক টানাপোড়েনে ৮ দশমিক ৪২ শতাংশ। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে ৪ দশমিক ২২ শতাংশ এবং মানসিক অস্থিতিশীলতার কারণে ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণে বোঝা যায়, আবেগনিয়ন্ত্রণ ও পারিবারিক সহায়তার ঘাটতি স্কুল পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা মোকাবেলায় আঁচল ফাউন্ডেশনের পাঁচ প্রস্তাবনা

১. সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে মনোসেবার এবং শিক্ষার্থীদের মেন্টাল হেলথ স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা।

২. শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা বা উদ্বেগের চিহ্ন শনাক্ত করতে শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রশিক্ষণ।

৩. আত্মহত্যা ও মানসিক সমস্যার ওপর সামাজিক স্টিগমা কমাতে সংবাদ, পোস্টার ও সামাজিক মাধ্যম প্রচারণা।

৪. প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাইকো সোশ্যাল প্রশিক্ষণের আওতায় আনা।

৫. অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংযোগ ঘটাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ক কর্মসূচির আয়োজন করা।




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button