ডিগ্রির ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে দক্ষতার মূল্য

প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় ১০ লাখ তরুণ উচ্চশিক্ষার পাঠ চুকিয়ে চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন। অথচ তাদের একটি বিশাল অংশ কয়েক বছরের পর বছর নিজেদের আবিষ্কার করছেন ‘শিক্ষিত বেকার’ হিসেবে।
উন্নত ও ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার কথা আমরা বলছি, আবার অপরদিকে দেশজুড়ে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—একদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী তরুণদের বেকারত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্প-কারখানা, নির্মাণখাত, আইটি সাপোর্ট, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল, প্লাম্বিং, অটোমেশন, এমনকি আধুনিক কৃষিখাতেও দক্ষ জনশক্তির অভাব দিন দিন প্রকট হচ্ছে। এই বাস্তবতায় যে প্রশ্নটির সুরাহা করার প্রয়োজন তা হচ্ছে —আমরা কি শুধুই সার্টিফিকেটধারী গ্রাজুয়েট তৈরি করবো, নাকি বিশ্ববাজারের উপযোগী দক্ষ কারিগর?
সবার আগে আমাদের জানতে হবে, এই সমস্যার সূত্রপাত কোথায়? আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। লর্ডমেকলে যে শিক্ষানীতি প্রবর্তন করেছিলেন, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল দক্ষ কারিগর তৈরি করা নয়, বরং ব্রিটিশ রাজ পরিচালনার জন্য অনুগত ‘কেরানি’ বা ‘অফিস সহকারী’ তৈরি করা। স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমরা সেই ‘থিওরি-ভিত্তিক’ পড়ালেখা থেকে পুরোপুরি বের হতে পারিনি। ফলে আমাদের উচ্চশিক্ষা আজও মূলত ‘অফিসার’ তৈরির কারখানা, ‘উদ্ভাবক’ তৈরির নয়। যার ফলশ্রুতিতে গত দুই দশকে আমাদের সমাজে উচ্চশিক্ষাকে সাফল্যের একমাত্র পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পরিবারগুলো সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে আগ্রহী, যা ইতিবাচক; কিন্তু সমস্যা হয় তখন, যখন শিক্ষার বিষয়বস্তু ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে সংযোগ থাকে না। ফলে বিপুলসংখ্যক তরুণ স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে বের হলেও তাদের দক্ষতা শিল্পখাতের প্রয়োজনের সঙ্গে মেলে না। অনেকেই তাত্ত্বিক জ্ঞান রাখেন, কিন্তু হাতে-কলমে কাজের অভিজ্ঞতা নেই। এর ফল—ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই। অন্যদিকে, কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, মেশিন অপারেটর, ফ্রিজ-এসি টেকনিশিয়ান, নেটওয়ার্ক টেকনিশিয়ান বা অটোমেশন অপারেটর সরাসরি উৎপাদন ও সেবাখাতে অবদান। তারা দ্রুত স্বনির্ভর হয়ে দেশের জিডিপিতে অবদান রাখতে পারেন। এতকিছুর পরেও অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, আমাদের সমাজে এখনও “কারিগরি কাজ”কে অনেক সময় কম মর্যাদার কাজ হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশের সমাজ একজন ডিগ্রিধারী বেকার পছন্দ করে তবুও আত্মনির্ভরশীল কারিগর নয়। আমাদের সমাজে এখন কারিগরি শিক্ষাকে এখনও ‘পিছিয়ে পড়া বা কম মেধাবীদের ক্ষেত্র’ হিসেবে দেখা হয়।
অন্যদিকে, উন্নত দেশগুলো তাদের বিশাল জনসংখ্যার প্রায় ৫০-৭০ শতাংশকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে বিশ্ব অর্থনীতি শাসন করছে। বিশ্বের কিছু উন্নত রাষ্ট্রের দিকে তাকালেই বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে। যেমন, জার্মানিকে বলা হয় কারিগরি শিক্ষার ‘মডেল’। তাদের বিখ্যাত ‘ডুয়াল এডুকেশন সিস্টেমের কারণে সেখানে বেকারত্বের হার খুবই কম। জার্মানির প্রায় ৫০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী মাধ্যমিক শিক্ষার পর সরাসরি কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষায় যোগ দেয়। ফলাফল হিসেবে দেখছি যে তাদের অটোমোবাইল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টর সারাবিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ইউরোপে আরেকটি উন্নত দেশ হচ্ছে সুইজারল্যান্ড। সে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো তাদের দক্ষ জনশক্তি। সেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রথাগত সাধারণ শিক্ষার বদলে কারিগরি শিক্ষা বেছে নেয়। ফলশ্রুতিতে সুইজারল্যান্ডে যুব বেকারত্বের হার বিশ্বের সর্বনিম্ন দেশগুলোর একটি (প্রায় ২-৩ শতাংশ)। এবার যদি এশিয়ার দেশগুলোর দিকে লক্ষ্য করি, তাহলে দেখবো সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের উন্নতির মূলমন্ত্র হলো ‘কারিগরি দক্ষতা’ বা মোনোজুকুরি (জাপানি শব্দ যার অর্থ হচ্ছে উচ্চমানের পণ্য তৈরির শিল্প)। জাপানের স্পেশালাইজড ট্রেনিং কলেজগুলোতে গ্র্যাজুয়েটদের চাকরির হার প্রায় ৯৮ শতাংশ। তাদের হাইস্কুল পর্যায়ের প্রায় ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কারিগরি কোর্সে ভর্তি হয়। ফলাফল হিসেবে দেখি ইলেকট্রনিক্স এবং রোবোটিক্স শিল্পে জাপান কয়েক দশক ধরে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আমরা যদি আমার নিকটবর্তী দেশ সিঙ্গাপুরের দিকে তাকাই, তাহলে দেখবো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সিঙ্গাপুরের দ্রুত উন্নতির প্রধান কারণ হলো তাদের ইনস্টিটিউট অব টেকনিক্যাল এডুকেশন। সিঙ্গাপুরের প্রায় ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী সেকেন্ডারি স্কুলের পর কোনও না কোনও কারিগরি বা ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করে। যার ফলে ছোট দেশ হয়েও বৈশ্বিক বাণিজ্য ও প্রযুক্তিতে শক্ত অবস্থান।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে সাধারণ শিক্ষার সনদ বেকারত্বের বোঝা বাড়াচ্ছে। আমাদের সামনে এখন দুটি পথ—হয় আমরা সার্টিফিকেটধারী বেকারের সংখ্যা বাড়াবো, অথবা দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে বিশ্ব জয় করবো। যদি আমরা কারিগরি শিক্ষাকে আধুনিকায়ন করতে পারি এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারি, তবে এই বিশাল তরুণ সমাজই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, জার্মানি তাদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রতিবছর অন্তত ৪ লক্ষ দক্ষ কর্মী প্রয়োজন। বিশেষ করে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকাট্রনিক্স, আইটি সাপোর্ট এবং স্বাস্থ্যসেবা (নার্সিং) খাতে ব্যাপক চাহিদা। তারা ‘অপরচুনিটি কার্ড’ এর মাধ্যমে দক্ষ কর্মীদের সহজ ভিসা দিচ্ছে। জাপানে জনসংখ্যা কমে যাওয়ায় তারা বিদেশি টেকনিশিয়ানদের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। কেয়ারগিভিং, কনস্ট্রাকশন, অটোমোবাইল মেকানিক এবং কৃষি প্রযুক্তিতে তারা দক্ষ কর্মী খুঁজছে। এজন্য জাপানি ভাষা শেখা থাকলে সুযোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। দক্ষিণ কোরিয়া জাহাজ নির্মাণ এবং ভারী শিল্পে তারা বিশ্বের অন্যতম। ওয়েল্ডিং, পেইন্টিং এবং প্লাস্টিক মোল্ডিং দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের জন্য ই-৭ ভিসার মাধ্যমে সেখানে যাওয়ার বড় সুযোগ আছে। সৌদি আরব নিওম সিটির মতো মেগা প্রজেক্টের জন্য তাদের কয়েক লাখ সিভিল টেকনিশিয়ান, সোলার প্যানেল বিশেষজ্ঞ এবং টেলিকম ইঞ্জিনিয়ার প্রয়োজন। তারা এখন শ্রমিকদের ‘স্কিল ভেরিফিকেশন’ সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) তাদের স্মার্ট সিটি এবং এআই উদ্যোগের জন্য দক্ষ আইটি টেকনিশিয়ান ও সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন।
আমাদের সময়োপযোগী উদ্যোগ এবং সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে বিশ্ববাজারের চলমান এই সুযোগগুলোকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে সমৃদ্ধ করতে। একটা কথা মাথায় রাখতে হবে যে, শুধু বিদেশে যাওয়াই বড় কথা নয়, একজন অদক্ষ কর্মী মাসে যেখানে ৫০ হাজার টাকা পাঠাতেন, দক্ষ টেকনিশিয়ান হিসেবে তিনি অনায়াসেই ২ থেকে ৩ লাখ টাকা রেমিট্যান্স পাঠাতে পারবেন। তিনি দেশের অর্থনীতির জন্য গেম-চেঞ্জার হতে পারেন। তবে এই দক্ষকর্মী তৈরি করার কাজে অবশ্যই নারী পুরুষ নির্বিশেষে শামিল হতে হবে । তা না হলে একটি বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন যে, দেশে যত বেকারের সংখ্যা বাড়বো দেশের তরুণ সমাজ ততই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়বে। আর হতাশাগ্রস্ত তরুণ সমাজ স্বভাবতই ঝুঁকে পড়বে মাদক, জঙ্গিবাদসহ বিভিন্ন বে-আইনি কর্মকাণ্ডের দিকে। তরুণ সমাজের বিপথে যাবার মানেই হচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়া।
পরিশেষে বলা যায়, একবিংশ শতাব্দীর এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে কেবল একটি একাডেমিক সার্টিফিকেট বা ডিগ্রিকে সফলতার চাবিকাঠি মনে করা হবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় ভুল। ডিগ্রি হয়তো একজন মানুষকে ইন্টারভিউ বোর্ড পর্যন্ত পৌঁছানোর একটি ‘টিকিট’ দিতে পারে, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নিজের জায়গা করে নেওয়া এবং সেখানে টিকে থাকার শক্তি দেয় একমাত্র কারিগরি বা ব্যাবহারিক দক্ষতা।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ডিগ্রিকে যদি ‘যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি’ হিসেবে ধরা বন্ধ না করা হয়, তবে শিক্ষিত বেকারের মিছিল আরও দীর্ঘ হবে। তাই সমাধান হলো ডিগ্রিকে দক্ষতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা।
যদি আমরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল মুখস্থনির্ভর তাত্ত্বিক কাঠামো থেকে বের করে এনে হাতে-কলমে শিখবার সুযোগ তৈরি করতে পারি, তবেই সার্টিফিকেট হবে একটি কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা, কোনও দেয়ালে ঝোলানো স্রেফ শো-পিস নয়। সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর, কারণ আগামীর পৃথিবী শিক্ষিত বেকারের নয়, বরং দক্ষ কারিগরদের। আমরা বিশ্বাস করি, সেই দক্ষ জনশক্তির ওপর ভর করেই বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে এক অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে।
(লেখক: কলামিস্ট ও অ্যাকটিভিস্ট)



