বিষণ্ন প্রেমের কবি লতিফ জোয়ার্দার

নব্বই দশকের শুরুর দিকে লতিফ জোয়ার্দারের সাথে আমার পরিচয় হয়। পাবনা শহরের হামিদ রোডে একটা পুরাতন ভবনে পাবনা থিয়েটার নাট্য গ্রুপের অফিস ছিল। অফিসটি চালাতেন নাট্যকার সুলতান মুহাম্মদ রাজ্জাক। রাজ্জাক ভাই নিজে কবিতা লিখতেন। তবে তার মূল পরিচয় ছিল নাট্যকার হিসেবে। রাজ্জাক ভাই ‘কবিকণ্ঠের আসর’নামে কবিতার পাঠচক্র পরিচালনা করতেন। সেই আসরে এক সময় আমি নিয়মিত সদস্য ছিলাম। সেখানে লতিফ জোয়ার্দার নিয়মিত আসতেন এবং নিজের লেখা কবিতা পাঠ করতেন। সেই থেকে একানব্বই সাল পর্যন্ত লতিফ জোয়ার্দার কবিতা লিখে গেছেন। তিনি মূলত প্রেমের কবিতা লিখতেন। সেই সময় তার লেখা ‘স্বপ্নেরা ঘর বানায়’নামে একটি কবিতা তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।
একানব্বই সালের পরে কবিতা পাঠের আসরের সাথে আমার আর সম্পর্ক থাকে না। এই সংযোগ বিচ্ছিন্নতা হয় মূলত লেখাপড়া জনিত কারণে। জানতে পারি, লতিফ জোয়ার্দারকেও সেই আসরে আর দেখা যায় না।
শুধু সেই আসরেই নয়, লতিফ জোয়ার্দারকে আর কোথাও দেখা যায় না। ২০০৫ সাল থেকে আবার তিনি নতুন করে লেখালেখি শুরু করেন। মাঝখানের এই তের বছরের দীর্ঘ বিরতির কোনো ব্যাখ্যা নেই। ২০০৭ সালে লতিফ জোয়ার্দারের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এক সুন্দরের অপমৃত্যু’প্রকাশিত হয়।
প্রশ্ন হলো, লতিফ জোয়ার্দারকে আমরা কোন দশকের কবি বলে বিবেচনা করব? অবশ্য লতিফ জোয়ার্দার নিজে মনে করেন তিনি শূন্য দশকের কবি। এর আগে তার যে লেখালেখি, সেসব তিনি বাতিল করে দিয়েছেন। দীর্ঘ বিরতি দিয়ে লতিফ জোয়ার্দার প্রথম দশকে মানে শূন্য দশকে যখন নতুনভাবে যাত্রা শুরু করলেন তখন তার পরিচয় কেবল কবিতেই আর সীমাবদ্ধ থাকলো না। এই সময়ে কবিতার পাশাপাশি তিনি গল্প-উপন্যাসও লিখে গেছেন সমান তালে। এ পর্যন্ত তিনি এগারোটি উপন্যাস লিখেছেন এবং ছয়টি ছোটোগল্প গ্রন্থ। ‘ভূত বড়ো অদ্ভুত’এবং ‘ড্রাগন এলো দেশে’ নামের দুটি শিশুতোষ উপন্যাসও রয়েছে তার। ২০১১ সালে ‘শূন্যের গল্প’, শিরোনামে একটি গল্পসংকলন প্রকাশ করেন। এছাড়া তিনি ‘সবুজ স্বর্গ’এবং ‘চৌকাঠ’ নামে একসময় দুটি ছোটকাগজ সম্পাদনা করতেন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে তার কবি পরিচয়ই প্রধান হয়ে উঠেছে।
২০০৭ সালে প্রকাশিত ‘এক সুন্দরের অপমৃত্যু’র পরে আরও দশটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তার। যথা: ছুঁয়ে দিবো জলের শরীর (২০০৮৯), আহত আঁধার (২০১১), যে শহরে তুমি নেই সে শহর অন্ধ বধির (২০১৪), মন এক বেদনার কারখানা (২০১৭), এক রাজসিক কীর্তির কথা মনে পড়ে যায় (২০১৮), নির্বাচিত ১০০ কবিতা (২০১৯), নিষিদ্ধ প্রিয়ার চুম্বন (২০২০), সুখগুলো সাদা শার্টের বুক পকেটে রাখি (২০২২) ও তাপসী পাহান (২০২৪)।
লতিফ জোয়ার্দারের কবিতা চিত্রকল্পময়। কবিতায় তিনি অবিরলভাবে রূপক আর চিত্রকল্পের পসরা সাজান। এই সব চিত্রকল্প কবি একদিকে চেনা পরিমণ্ডল থেকে আহরণ করেন, আবার অবলীলায় তিনি পরাবাস্তব চিত্রকল্পের আশ্রয়ে কবিতার শরীর নির্মাণ করেন। তার কবিতায় সৌন্দর্য নির্মাণের প্রয়াস সহজেই লক্ষণীয়। এছাড়া তার কবিতার যে স্বর তা কোমল এবং মাধুর্যময়।
জোয়ার্দারের কবিতায় নৈরাশ্যের একটা অনুরণন আছে। মূল্যবোধের অবক্ষয়, জীবনের হতাশা, ক্লান্তি তার কবিতায় ছায়া ফেলে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে প্রেম তার কবিতার প্রধানতম অন্বিষ্ট। এবং তার মধ্যে এক প্রবল প্রেমিক পুরুষের বসবাস, প্রেমিকাকে না দেখলে যার কাছে পৃথিবীর সবকিছু মিথ্যা হয়ে যায়।
“তোমাকে না দেখলে প্রতিদিন এই শহর ভিজে যায়/অলৌকিক যন্ত্রণায় কাতর হয় সন্ধ্যার কফি হাউজ। /ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে থমকে থাকে গাড়ির বহর/শাহবাগের কবিদের আড্ডায় বিষণ্নতা এসে ভিড় করে। /তোমাকে না দেখলে সীমাহীন অস্থিরতায় তোলপাড় হয় প্রতিটি দৈনিকের সাহিত্য পাতা।”
(কফি হাউস)।
কবি জীবনের অন্তর্গত ভাবনায় প্রেমের বিস্তার সর্বগ্রাসী। কিন্তু কবির এই প্রেম বিষাদময়। ব্যথাদীর্ণ মন নিয়ে নিজেকে নিঃশেষ করে কবি প্রেমের বন্দনা করেন। কবি তার প্রেমিকাকে রাধার অনুষঙ্গে কল্পনা করতে চান। রাধার সঙ্গে কৃষ্ণের যে প্রেম, বিরহ ছিল তার প্রধান উপজীব্য। কবি তার প্রেমিকাকে রাধার সঙ্গে তুলনা করে প্রেমের বিষাদময়তাকেই উদ্যাপন করতে চেয়েছেন রাধা কবিতায়।
“যে প্রণয়-শিল্পে একদিন তুমি হয়েছিলে রাধা
সেখানে হয়ত আমিও ছিলাম। যে গোলাপ
ফুটেছিল মলিন মৃত্তিকার বুকে। তোমার
নীলাভ দৃষ্টি তাকে অবলোকন করে মাড়িয়ে গেছে
এখন আর তোমাকে দেবার মতো অবশিষ্ট কিছুই নেই
আমার। অন্তহীন পথের যাত্রী আমি। ভালোবাসা
এখন শবযাত্রার মতো পালিয়ে যায় শ্মশান ঘাটে।”
(রাধা)।
প্রেমের জন্য কবির রয়েছে অবারিত তৃষ্ণা। এই তৃষ্ণার কোনো উপশম নেই। শাশ্বত প্রেমের হাতছানিতে ছুটে বেড়ান তিনি। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেই প্রেমের দেখা মেলে না। দেবদাসের জন্য পার্বতীর বুকে জমা ছিল ভালোবাসার অথই সমুদ্র। কিন্তু দেবদাস সেই সমুদ্রের তল খুঁজে পায়নি। কবি আকাঙ্ক্ষা করেন তাকেও পার্বতীর মতো কেউ আজীবন ভালোবেসে যাক। তিনি দেবদাস নন, কিন্তু প্রত্যাশা করেন একজন পার্বতী তার জন্য পথ চেয়ে থাকুক জীবনভর।
“পার্বতীর ভালোবাসা কখনো কখনো অনুভব করি আমি/চারদিকে চোখ মেলে কোনো এক পার্বতীকে খুঁজে বেড়াই/দেবদাস আমি তো নই! তারপরও প্রেমিক আমি/তোমার বুকের অধরে প্রতিদিন জন্ম দেই অন্তহীন ব্যথার সরোবর।”
(পার্বতী)
কবির মধ্যে চিরকালের এক বিরহী প্রেমিকের বাস, যে প্রেমিক কখনো তার কাঙ্ক্ষিত নারীকে খুঁজে পায় না। কিন্তু এই অন্বেষণ কখনো শেষ হয় না। প্রতিটি শহরে, প্রতিটি নগরে বন্দরে কবি তার স্বপ্নের রমণীকে খুঁজে বেড়ান। এ যেন এক অন্তহীন যাত্রা। জীবনানন্দ দাশের মতো হাজার বছর ধরে পথ হেঁটে চলা। মানুষের এই যে অন্তর্গত তৃষ্ণা, এই যে অপূর্ণতা এর কোনো শেষ নেই। মানুষের কল্পনায় যার অধিষ্ঠান, তাকে বাস্তবে পাওয়া যায় না, কিন্তু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে যায়। মানুষ এক অলীক, ভ্রান্তির জগতে ঢুকে পড়ে, যেখানে সবকিছুর মধ্যেই যেন তার একান্ত মানবীকে দেখতে পায় সে। এই অনুভবেরই বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় নিম্নোক্ত চরণে:
“যে শহরে তুমি নেই সে শহর অন্ধ বধির। একলা পড়ে আছে স্মৃতিময় নীড়/এখানে কেবলই অসংখ্য ফ্ল্যাট বাড়ি বিপণি বিতান আর অচেনা মানুষের ভিড়/নিঃসঙ্গ আকাশ দেখি প্রতিদিন তোমায় মনে করে।”
(যে শহরে তুমি নেই সে শহর অন্ধ বধির)।
লতিফ জোয়ার্দার পাবনার এক ক্ষুদ্র জনপদ মুলাডুলিতে বসবাস করেন। আজীবন তিনি এই নিভৃত অঞ্চলে থেকেই সাহিত্য সাধনা করে যাচ্ছেন। মুলাডুলি বাজারের সাথে আত্মিক বন্ধনে বাধা পড়ে আছেন তিনি। একসময় এই মুলাডুলিতে বইমেলা আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ২০০৬ সালের বইমেলায় তার লেখা ‘নো মিসকল’উপন্যাস অভূতপূর্ব সারা ফেলেছিল।
প্রথম প্রেমের বেদনা তিনি বয়ে বেড়ান। কবি সেই প্রেমের ঘোরের মধ্যেই বাস করেন। হয়ত একারণেই তিনি বলতে পারেন, “এই বসন্তের শেষে আবার নতুন করে তুমি আমায় খুঁজবে/সেই যে অলীক যন্ত্রণার দহন! যেখানে তোমার ক্লান্তিমাখা মুখ/প্রগাঢ় দীর্ঘশ্বাস ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেদিন আমি পৌঁছে যাব নক্ষত্রলোকে। স্বপ্নের ভিতর অথবা স্বপ্নের বাইরে আমাকে খুঁজবে তুমি বিবর্ণ অন্ধকারে।”
(এই বসন্তের শেষে)।
লতিফ জোয়ার্দার আপাদমস্তক কবি। এখনো বিরামহীন কবিতা লিখে চলেছেন। জন কোলাহল ছেড়ে নীরবে নিভৃতে মফস্বলের এক ক্ষুদ্র লোকালয়ে বসে কবিতার সঙ্গে গৃহস্থালি করে যাচ্ছেন তিনি। ১ মার্চ এই কবির জন্মদিন। একজন নিষ্ঠাবান কবিকে জানাই জন্মদিনের শুভেচ্ছা।



