Uncategorized

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রান্তিক মানুষেরা কেন মাদকের জালে? 

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান—কারও কাছে এটি ইতিহাসের জীবন্ত দলিল, কারও কাছে বিনোদনের কেন্দ্র। কিন্তু এর ভেতরেই গড়ে উঠেছে এক প্রান্তিক জনপদ, যেখানে অভাব আর অনিশ্চয়তাকে পুঁজি করে আবর্তিত হয় মাদকের কারবার। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই উদ্যানের আলো-আঁধারিতেই পার হয় শত শত ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের জীবন। 

নারায়ণগঞ্জ থেকে শৈশবে পাচার হয়ে আসা ৬০ বছর বয়সী এক নারী গত ৫৩ বছর ধরে এই উদ্যানেই রয়েছেন। নিজের জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “৫৩ বছর ধইরা এই পার্কেই পইড়া আছি।” এই উদ্যানেই তার বিয়ে হয়েছিল— একটি মেয়ে হয়েছে, সেই মেয়েরও এখন বিয়ে হয়ে গেছে। নিজের মতো জীবন যেন মেয়েকে বয়ে বেড়াতে না হয়, সেটাই ছিল তার ইচ্ছা। তিনি বলেন, “মেয়েরে কোনোদিন পার্কে আনিনাই। এখন বিয়া হওয়ার পরে, বাচ্চা হওয়ার পরে মাঝেমধ্যে আসে।” 

আরেকজন রাজু (ছদ্মনাম), বয়স ২৬। জন্ম এই উদ্যানেই, বাবা-মা দুজনকেই হারিয়েছেন এখানে। একমাত্র বোনের বিয়েও দিয়েছেন এই উদ্যানে। লালবাগের একটি স্কুলে কিছুদিন পড়েছিলেন বটে, কিন্তু শেষমেশ ফিরে এসেছেন উদ্যানেই— কারণ এটাই তার জন্মস্থান। 

গল্পটা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া অগণিত মানুষের। এখানে জন্ম নেয়, বিয়ে হয়, কেউ কেউ মরেও যায়। আবার কারও কারও ক্ষেত্রে চিত্রটা ভিন্ন।  

জীবন যখন মাদকের চক্রে বন্দী 

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অভাবের তাড়নায় উদ্যানের প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ জন মানুষ ক্ষুদ্র মাদক বিক্রেতা হিসেবে যুক্ত হয়েছে, যার একটি বড় অংশই কিশোর ও যুবক। শুরুতে ফুল বা পানির বোতল বিক্রি করলেও বাড়তি আয়ের হাতছানিতে তারা জড়িয়ে পড়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশায়। ছিন্নমূল শিশুদের কাজে লাগিয়ে একটি সুশৃঙ্খল সিন্ডিকেট এই চক্র নিয়ন্ত্রণ করছে।

কেন এই পথে শিশুরা? 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের এক শিক্ষার্থী একদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১২ বছর বয়সী এক ছেলেকে দেখেন। ওই শিক্ষার্থীর দাবি, ছেলেটি আগে জহুরুল হক হলের ক্যান্টিনে কাজ করতো। কেন এই পথে এলো জিজ্ঞেস করলে ছেলেটি বলে, “ভাই, ক্যান্টিনে যা পেতাম সেটায় চলতো না— আর ছোট বলে আরও কম দেওয়ার চেষ্টা করতো।  

আরও কয়েকজন তরুণ বিক্রেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “তাদের আর কোনও গতি নেই।”  

“এটা না করলে খাবো কী?”— প্রশ্ন রাখেন তাদেরই একজন।  

বড় অভিযান, তবু ফল নেই 

২০২৫ সালের ১৩ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যার পর উদ্যানের নিরাপত্তা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও পুলিশ দফায় দফায় উচ্ছেদ অভিযান চালালেও কয়েকদিন পরই মাদক সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে বলে দাবি করেছেন অনেকে। 

কেন এসব অভিযানে কাজ হচ্ছে না— এই প্রশ্নে ডিএমপির রমনা জোনের উপ-কমিশনার মাসুদ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বহুদিন থেকে যে সিন্ডিকেটগুলো এখানে আছে তারা কাজে লাগায় উদ্বাস্তু নারীদের। আমরা গত ২ মাসে আমরা প্রায় শ’খানেকের মতো মাদকব্যাবসায়ীই শুধু ধরেছি।” 

যাদের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। 

তিনি আরও বলেন, “দশটা ধরলে দেখি আরও দশটা চলে আসে।”   

শাহবাগ থানার সূত্রে জানা যায়, গত দুই মাসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শহীদ মিনার ও আশপাশের এলাকা থেকে মোট ৭৩ জন ছিন্নমূল মানুষ ও মাদক বিক্রেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। 

অন্ধকার ও কারফিউর প্রভাব 

গবেষক পারভেজ আলমের ‘ডিজঅ্যাপিয়ারিং পাবলিক স্ফিয়ারস’ (২০১৬)-এর তথ্যমতে, “২০১৪ সালে পুলিশ ছবির হাটের বেশ কিছু স্থাপনা ভেঙে দেয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও ছবির হাট বড় ধাক্কা খায় যখন পুলিশ সব চায়ের দোকান বন্ধ করে দেয়— এই দোকানগুলোই ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দেওয়া তরুণদের প্রধান বসার জায়গা। অভিজিতের হত্যাকারীকে ধরতে না পারলেও, তার মৃত্যুর পর পুলিশ সফলভাবে বিকাল পাঁচটার পর পার্কে কারফিউ জারি করে। 

“কারফিউ জারির পর সর্বজনীন পরিসরটি ধীরে ধীরে মরতে শুরু করে। কিছুদিন পুলিশি শিথিলতার সুযোগ নিয়ে তরুণরা সন্ধ্যার পরও পার্কে থেকেছে, কিন্তু পার্কের বড় একটা অংশ রাতে অন্ধকারে ডুবে যাওয়ায় জায়গাটি আবার পুরনো চেহারায় ফিরতে শুরু করে— মাস্তান আর মাদক ব্যবসায়ীদের আখড়া।” 

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কেবল পুলিশি অভিযান নয়, বরং উদ্যানের সঠিক ব্যবস্থাপনা, ছিন্নমূল শিশুদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে না পারলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এই অন্ধকার জগত দূর করা সম্ভব হবে না। 




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button