Uncategorized

আবেগ, আতঙ্ক আর সামাজিক নিয়ন্ত্রণের টানাপোড়েন 

স্কুল শেষে ধানমন্ডির একটি কোচিং সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকিতে দেখা যায় ১৫ বছর বয়সী মারজিয়াকে (ছদ্মনাম)। সহপাঠীর সঙ্গে মেসেঞ্জারে নিয়মিত আলাপ করতো সে। বিষয়টি পরিবার জানতে পারার পর তার ওপর নেমে আসে কঠোর বিধিনিষেধ। ফোন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ, কোচিং কমিয়ে দেওয়া, এমনকি স্কুল থেকে বাড়ি ফেরা— সবই এখন পরিবারের কড়া নজরদারিতে। 

মারজিয়া বলে, “আমরা শুধু কথা বলতাম। ও আমার বন্ধু, আমরা একই ক্লাসে পড়ি। কিন্তু মনে হচ্ছে আমরা বড় কোনও অপরাধ করে ফেলেছি। এ নিয়ে বাড়িতে আমাকে প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকতে হচ্ছে।”

অন্যদিকে লালবাগের ১৬ বছর বয়সী রিফাত (ছদ্মনাম) জানায়, পড়াশোনা নিয়ে আলোচনার সূত্রে একটি ফেসবুক গ্রুপে তার সম্পর্কের শুরু। রিফাতের ভাষ্য, “অনলাইনে কথা বলা সহজ। আমরা লুকিয়ে কথা বলি। কিন্তু সবসময় ভয়ে থাকি যে পরিবার জানলে বড় সমস্যা হবে।” 

এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের জীবনে আকর্ষণ, বন্ধুত্ব বা প্রেম মনস্তাত্ত্বিক বিকাশেরই একটি স্বাভাবিক অংশ। তবে বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই সম্পর্কগুলোকে দেখা হয় সন্দেহ আর নিয়ন্ত্রণের চোখে। 

ডিজিটাল দুনিয়া ও বদলে যাওয়া বাস্তবতা 

কিশোর-কিশোরীরা এখন ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে বন্ধুত্বের গণ্ডি পেরিয়ে প্রেমে জড়াচ্ছে। বিবিএস-এর ২০২৫-২৬ সালের আইসিটি জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ পরিবার এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এছাড়া পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৪৮.৯ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় যে, ডিজিটাল প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের জীবনে কতটা গভীরভাবে গেঁথে গেছে। 

অন্যদিকে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ২০২৫ সালের জুলাই মাসের তথ্য বলছে, দেশে মোট ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি ৫৯ লাখ ৯০ হাজারে পৌঁছেছে। হাতের নাগালে স্মার্টফোন ও সস্তা ডেটা প্যাক কিশোরদের অনলাইন উপস্থিতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। 

যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং 

অনলাইন জগৎ সবসময় নিরাপদ নয়। ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে (বিএমজে) প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের প্রায় ৮৮ শতাংশ মাধ্যমিক শিক্ষার্থী ইন্টারনেট ব্যবহার করে এবং তাদের অর্ধেকেরও বেশি জীবনের কোনো না কোনো সময় অনলাইনে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। 

গবেষণায় দেখা গেছে— ৫৩ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন গ্রুমিংয়ের (ফাঁদে ফেলা) শিকার। ৩৮ শতাংশ সাইবার ফ্ল্যাশিংয়ের (অযাচিত নগ্ন ছবি পাঠানো) শিকার। ৩৫ শতাংশ সেক্সটিং বা আপত্তিকর মেসেজ পাঠানোর চাপে ছিল। আর ১২ শতাংশ সেক্সটোরশন বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার। 

ইউনিসেফের ২০২৫ সালের এক জরিপ বলছে, অপপ্রচার ও সাইবার বুলিং তরুণ প্রজন্মের মানসিক চাপের অন্যতম প্রধান কারণ। বেসরকারি মানবাধিকার কর্মীদের মতে, বাংলাদেশে প্রায় ৩২ শতাংশ শিশু অনলাইনে সহিংসতা বা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে।

বিচ্ছেদ ও মানসিক বিপর্যয়

ডিজিটাল দুনিয়ায় সম্পর্কের বিচ্ছেদ হয় হঠাৎ এবং তীব্র। ফোন বন্ধ রাখা বা ‘ব্লক’ করে দেওয়ার মতো বিষয়গুলো কিশোর মনে চরম বিষণ্ণতা তৈরি করে। 

রিফাত তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, “একদিন সামান্য একটা বিষয় নিয়ে আমাদের কথা কাটাকাটি হলো। এরপর ও আমাকে ব্লক করে দিলো। আমি আর কোনোভাবেই ওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। মানসিকভাবে আমি ভেঙ্গে পড়েছিলাম।” 

এছাড়া ডিজিটাল সম্পর্কের সঙ্গে সাইবার বুলিং, ব্ল্যাকমেইল, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ফাঁস করা এবং অনলাইন গ্রুমিংয়ের (ফাঁদে ফেলা) মতো মারাত্মক ঝুঁকিগুলোও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জোবেদা খাতুন বলেন, “এই বয়সে অনুভূতিগুলো খুব গভীর হয়। সামাজিক অপমান বা প্রত্যাখ্যান তাদের খুব বেশি কষ্ট দেয়। পারিবারিক সমর্থন না থাকলে তারা একা হয়ে পড়ে এবং অনলাইন বিচ্ছেদ বা সাইবার সমস্যাগুলো সামলাতে পারে না।” 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি সাতজন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে একজন কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। কৈশোর এমন এক সময়, যখন আবেগ থাকে তীব্র, গড়ে ওঠে নিজস্ব ব্যক্তিত্ব বা আত্মপরিচয় এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। 

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও লিঙ্গ বৈষম্য 

মারজিয়ার মা আফরোজা বেগম বলেন, “ও এখনো ছোট। এসব করলে পড়াশোনার ক্ষতি হবে। মেয়ে বলে আমাদের ভয়টা আরও বেশি।” 

এই ভয় কেবল পড়াশোনা নিয়ে নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং পরিবারের সম্মান রক্ষার প্রশ্নও। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা বেগম বলেন, “বাংলাদেশে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ওপর নজরদারি অনেক বেশি। ছেলেদের বন্ধুত্বকে স্বাভাবিক ধরা হলেও মেয়েদের ক্ষেত্রে তাকে পারিবারিক সম্মানের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। এই দ্বিমুখী আচরণ মেয়েদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। এমনকি গ্রামাঞ্চলে রটনার কারণে বাল্যবিবাহের ঝুঁকিও বাড়ে।” 

প্রতিরোধ ও সমাধানের পথ 

স্কুলগুলোতে এখনও ডিজিটাল নিরাপত্তা বা ব্যক্তিগত সীমারেখা নিয়ে কোনও শিক্ষা দেওয়া হয় না। ধানমন্ডি আইডিয়াল স্কুলের একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “শিক্ষার্থীরা সম্পর্কে জড়ায় এটা আমরা জানি, কিন্তু অভিভাবকদের আপত্তির কারণে আমরা এসব বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে পারি না।” 

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্পর্ক পুরোপুরি নিষিদ্ধ করলে তা কিশোরদের আরও গোপনে কাজ করতে প্রলুব্ধ করে, যা ব্ল্যাকমেইল ও সাইবার বুলিংয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। 

রিফাত যেমনটা বলেন, “অনলাইনে সবকিছুই বলে দেওয়া যায়। কিন্তু যখন কোনও সমস্যা দেখা দেয়, তখন কাউকে বলার মতো সাহস আর আমার থাকে না।” এই একাকিত্বই হয়তো বর্তমান সময়ের কিশোর-কিশোরীদের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি। 

অধ্যাপক সালমা বেগমের মতে, সমাধান কড়াকড়িতে নয়, বরং শিক্ষা ও খোলামেলা আলোচনায়। তিনি বলেন, “জীবন দক্ষতার শিক্ষা, সম্মতি সম্পর্কে ধারণা এবং সন্তান-পিতামাতার মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। ডিজিটাল যুগে তাদের অনুভূতিকে অপরাধ হিসেবে না দেখে সঠিক তথ্য দিয়ে গাইড করতে হবে।” 

কৈশোরের প্রেম হয়তো সাময়িক, কিন্তু এই সময়ে পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া সমর্থন বা অবহেলা তাদের সারা জীবনের মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলে। 




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button