ইরানে ইসরায়েলের হামলা: রণকৌশলে সাফল্য, কৌশলগত অনিশ্চয়তা

ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধ শুরু হওয়ার তিন দিন পর দেখা যাচ্ছে যে, সামরিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বড় ধরনের সাফল্য পেলেও এক গভীর কৌশলগত অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য। সামরিক ও রণকৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও, এই যুদ্ধের চূড়ান্ত গন্তব্য কোথায়, তা নিয়ে রয়ে গেছে চরম অনিশ্চয়তা। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মন্তব্যের এমন পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে।
শনিবার রাতে হামলার শুরুর দিকেই ইরানের অবশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দিয়েছে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী। রাশিয়ার সরবরাহ করা অধিকাংশ সিস্টেম গত এক বছরে ইসরায়েলি হামলায় আগেই ধ্বংস হয়েছিল। ফলে এখন ইরানের আকাশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ ৪৮ জন নেতা নিহত হয়েছেন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর মাত্র একবারই উত্তরসূরী পরিবর্তন দেখা ইরানের জন্য এটি এক ভয়াবহ বিপর্যয়। খোদ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, তাদের সামরিক ইউনিটগুলো এখন কোনও কেন্দ্রীয় নির্দেশ ছাড়াই বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে।
খামেনির মৃত্যুতে সংবিধান অনুযায়ী একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল গঠনের কথা থাকলেও তাদের কাউকেই এখন পর্যন্ত জনসমক্ষে দেখা যায়নি। খামেনির সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী ইব্রাহিম রাইসি দুই বছর আগে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা গেছেন এবং খামেনির ছেলে মোজতাবার আইআরজিসি-র সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকলেও তার পথে অনেক বাধা রয়েছে। কোনও স্পষ্ট উত্তরসূরি না থাকায় ইরান প্রজাতন্ত্রের ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
ইরান বর্তমানে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে জবাব দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য এখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো (লঞ্চার) ধ্বংস করা। ইরানের কাছে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সীমিত হলেও ইরাক বা উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলার জন্য স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল মজুদ রয়েছে।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ইরান সরাসরি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমানের বেসামরিক স্থাপনা ও হোটেলে হামলা চালিয়েছে। এর ফলে এই দেশগুলো যারা যুদ্ধ থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিল, তারা এখন সরাসরি সংঘাতের পথে। ইতোমধ্যে পাঁচটি উপসাগরীয় দেশ ও জর্ডান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে তাদের ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ প্রয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এমনকি ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানিও ইরানের বিরুদ্ধে জোটে যোগ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।
রাশিয়া ও চীন ইরানের কৌশলগত অংশীদার হলেও খামেনির মৃত্যুর পর তারা কেবল মৌখিক নিন্দা জানিয়েই ক্ষান্ত হয়েছে। রাশিয়ার নিজেরই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেওয়ার ক্ষমতা নেই, আর চীন কেবল সস্তা তেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই সংকটে ইরানকে সম্পূর্ণ একাই লড়তে হচ্ছে।
ইরানের সাইবার অপারেশন বা প্রক্সি মিলিশিয়াদের কার্যক্রম এখনও সেভাবে দৃশ্যমান নয়। শুধু হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে। ইরাকের মিলিশিয়ারাও কিছুটা সংযত। তবে এই নীরবতা বড় কোনও প্রস্তুতির লক্ষণ কি না, তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও সৌদি নেতৃত্বাধীন ওপেক উৎপাদন বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে, তবুও বাজার অস্থিতিশীল। কাতার এলএনজি উৎপাদন বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদী সংকটের আশঙ্কা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর ভয়াবহ শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখলেও রাজনৈতিক ফলাফল এখনও অনিশ্চিত। পেন্টাগন মনে করছে, ইরানের নতুন নেতৃত্ব এখনও তাদের বিপ্লবী আদর্শ ও পশ্চিমাবিরোধী অবস্থানে অটল থাকতে পারে।
যেকোনও যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তার নিজস্ব গতিতে চলে। এই মুহূর্তে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হলো, এই অভিযানের কোনও স্পষ্ট সমাপ্তি নেই। যদি ইরানি জনগণ বর্তমান শাসনের অবশিষ্টাংশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং সরকার তা দমনে শক্তি প্রয়োগ করে, তখন যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা চালিয়ে তা ঠেকাবে কি না, সেই প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন অবলম্বনে।



