Uncategorized

অভিযানের খবর আগেই পেয়েছে সলিমপুরের সন্ত্রাসীরা, রাতেই ভাঙা হলো কালভার্ট

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযানে গিয়ে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে যৌথ বাহিনী। কোথাও রাস্তার ওপর রাখা হয়েছে বড় ট্রাক। কোথাও আবার ভেঙে ফেলা হয়েছে কালভার্ট। নালার স্ল্যাবও তুলে ফেলা হয়েছে একটি স্থানে। এতে নানা স্থানে বাধার মুখে পড়ে যৌথ বাহিনী।

সোমবার (৯ মার্চ) ভোর থেকে র‌্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবির সমন্বয়ে এ অভিযান চালানো হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ধারণা, অভিযানের খবর আগেই পেয়েছে জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসীদের একটি অংশ। তাই গতকাল রাতেই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে সন্ত্রাসীরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি যাতে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়। রাস্তার ওপর ট্রাক রেখে সড়কে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। একটি নালার স্ল্যাবও তুলে ফেলা হয়।

চট্টগ্রাম নগরের প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়ি এলাকাজুড়ে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। বায়েজিদ বোস্তামী থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটি। এর বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে ৩ হাজার ১০০ একর জায়গায় জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। সীতাকুণ্ড উপজেলায় হলেও নগরের কাছেই এই এলাকা। এলাকাটির পূর্ব দিকে রয়েছে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ বোস্তামী থানা। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এলাকাটি অপরাধীদের কাছে ‘নিরাপদ রাজ্য’ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে এখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার বাড়িতে অন্তত দেড় লাখ মানুষের বসবাস, যাদের অধিকাংশই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে বসতি গড়েছেন। জঙ্গল সলিমপুরে এখনও পাহাড় কেটে চলছে প্লট-বাণিজ্য। এই বাণিজ্য ও দখল টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে তোলা হয়েছে সন্ত্রাসী বাহিনী। সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে এসব সন্ত্রাসী। নগরীর সঙ্গে অবস্থান এই জঙ্গল সলিমপুরকে বলা হতো দেশের ভেতর আরেক রাজ্য। কারণ দেশের আইন ও নিয়মনীতিতে নয়, সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর নির্দেশেই চলছে সলিমপুর।

আজ ভোর থেকে র‌্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবির সমন্বয়ে এ অভিযান চালানো হয়

জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের দুটি পক্ষ রয়েছে। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অপর পক্ষে রোকন উদ্দিন। ইয়াসিন গত জানুয়ারিতে ওই এলাকায় অভিযানে যাওয়া এক র‍্যাব কর্মকর্তাকে হত্যার মামলায় প্রধান আসামি। জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় রয়েছে তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এখনও পাহাড় কেটে চলছে প্লট-বাণিজ্য। আর এই বাণিজ্য ও দখল টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে তোলা হয়েছে সন্ত্রাসী বাহিনী। এলাকাটিতে সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে এসব সন্ত্রাসী। র‌্যাবের ওপর হামলার আগে জঙ্গল সলিমপুরে গত বছরের অক্টোবরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে একজন নিহত হন। পরদিন সেখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলা ও মারধরের শিকার হন দুই সাংবাদিক।

পুলিশ ও জঙ্গল সলিমপুরের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইয়াসিন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সীতাকুণ্ডের তৎকালীন সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতা এস এম আল মামুনের অনুসারী ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ইয়াসিন নিজেকেও বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর অনুসারী দাবি করে আসছেন। তবে র‍্যাব কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে আসলাম চৌধুরী বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে তার কোনও অনুসারী নেই। ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কেউ জড়িত নন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আজ অভিযানের আগে যেসব প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে এর উদ্দেশ্য আলীনগরে যৌথ বাহিনীর প্রবেশ ঠেকানো। আলীনগরে প্রবেশের মূল রাস্তাতেই ট্রাকটি রাখা হয়। কালভার্টটিও আলীনগরের কাছে।

এ বিষয়ে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে ছিন্নমূল ও আলীনগর নামে দুটি গ্রাম রয়েছে। ছিন্নমূলের পরেই আলীনগর। ছিন্নমূল যাওয়ার পর আলীনগর ঢোকার আগে রাস্তায় একটি ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। যৌথ বাহিনীর লোকজন ট্রাকটি সরিয়ে সামনে যায়। কিছু দূর পরে সম্ভবত গতকাল রাতে একটি কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়েছে। পরে কালভার্টের ওই অংশ ইট-বালু দিয়ে ভরাট করে যৌথ বাহিনীর গাড়ি আলীনগরে প্রবেশ করেছে।’

অভিযান শুরুর আগে কীভাবে এসব ঘটলো জানতে চাইলে নাজমুল হাসান বলেন, ‘এটি অনেক বড় অভিযান। এখানে বিভিন্ন বাহিনীর লোকজন আছে। জঙ্গল সলিমপুর এলাকা যারা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের সিএনজি অটোরিকশার চালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন সোর্স আছে। কোনোভাবে হয়তো অভিযানের কথা আগেই জেনে গেছে তারা। তবে এখন আমাদের অভিযান চলমান আছে। বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযান শেষ হলে বিস্তারিত জানানো হবে।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, সকাল ৬টা থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে যৌথ বাহিনীর প্রায় ৪ হাজার সদস্য অংশগ্রহণ করেছেন। অভিযানের অংশ হিসেবে সকাল থেকে জঙ্গল সলিমপুরের চারপাশ ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতে বসানো হয় তল্লাশি চৌকি, যাতে অভিযান শুরুর পর কেউ পালিয়ে যেতে না পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে অভিযানে অংশ নেন। অভিযানের সময় সাংবাদিকদের জঙ্গল সলিমপুরের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

গতকাল রাতেই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে সন্ত্রাসীরা

গত জানুয়ারি মাসে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন র‍্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। এ ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় মামলা করে র‍্যাব। এতে মোহাম্মদ ইয়াসিন ছাড়াও ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া আসামি করা হয় অজ্ঞাতপরিচয় ২০০ জনকে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, র‌্যাব সদস্যরা আসামি ধরতে গেলে তাদের ওপর সন্ত্রাসী মোহাম্মদ ইয়াসিনের নির্দেশে রামদা, কিরিচ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালানো হয়। ছিনিয়ে নেওয়া হয় র‌্যাবের আটক করা এক আসামিকে। চার র‌্যাব সদস্যকে অপহরণ করে নিয়ে যায় আসামিরা। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। এ ঘটনার পর জঙ্গল সলিমপুরে সমন্বিত অভিযান চালানোর কথা বলা হয়। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তখন অভিযান চালানো হয়নি।

অভিযানের বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি ও শিল্পাঞ্চল) মো. রাসেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলছে। যৌথ বাহিনীর চার হাজার সদস্য এই অভিযানে অংশ নিয়েছেন। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সকালে জঙ্গল সলিমপুরের চারপাশ ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতে বসানো হয় তল্লাশি চৌকি, যাতে অভিযান শুরুর পর কেউ পালাতে না পারে।’

 




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button