অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণে সরকার কাজ করছে: পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেছেন, অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণ বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। দেশের উন্নয়নের সুফল যেন প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছায়, সে লক্ষ্যেই সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিবেশ সুরক্ষা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সোমবার (৯ মার্চ) রাজধানীতে আয়োজিত এক সেমিনারে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বেসরকারিখাতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা’ শীর্ষক এই সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা চেম্বার মিলনায়তনে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন, সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল গ্রাজুয়েশন প্রজেক্ট (এসএসজিপি)-এর অতিরিক্ত সচিব ও প্রকল্প পরিচালক এ এইচ এম জাহাঙ্গীর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আকতার হোসেন।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। তিনি বলেন, সম্প্রতি শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি, অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, শিল্পখাতে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে দেশের বেসরকারিখাতের অগ্রগতি তেমন আশাব্যঞ্জক নয়।
তিনি বলেন, জ্বালানির বড় অংশ আমদানি নির্ভর হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের শিল্পখাতের জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
এ পরিস্থিতিতে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজীকরণ, রফতানি বহুমুখীকরণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এছাড়া রাজস্ব ব্যবস্থাপনার অটোমেশন, প্রত্যক্ষ করের আওতা বৃদ্ধি, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমানো এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেন তাসকীন আহমেদ।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার
তাসকীন আহমেদ বলেন, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে আনতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি প্রত্যাহার, সুদের হার কমানো, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি সহজ করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন অপরিহার্য।
টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং অনশোর ও অফশোর গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারেরও আহ্বান জানান তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক সংকটের বিষয়ে সরকার সচেতন এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, করজাল সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমরা সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি। ফলে স্থানীয় ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি
বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মঞ্জুর হোসেন বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জন করতে হলে প্রথমে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। এজন্য উৎপাদনশীল খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, এসএমই খাতের অর্থায়নের জন্য নতুন পদ্ধতি ও বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে। শুধু ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
এসএসজিপি প্রকল্পের অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম জাহাঙ্গীর বলেন, এলডিসিভুক্ত থাকার কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা পেয়েছে। চলতি বছর এলডিসি উত্তরণের কথা থাকলেও গত মাসে সময়সীমা তিন বছর বাড়ানোর জন্য আবেদন করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আকতার হোসেন বলেন, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশে রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সংকট অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি বলেন, বাজারে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ করা বা হঠাৎ করে সুদের হার কমিয়ে দিলে অর্থনীতিতে আরও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
সেমিনারের আলোচনায় অংশ নিয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার বলেন, সরকারের রাজস্ব আহরণে শুল্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে এবং কর কাঠামোয় মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, কৃষি খাত দ্রুত বাণিজ্যিকীকরণের দিকে যাচ্ছে, তবে চাল উৎপাদন কম লাভজনক হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, রেমিট্যান্স ছাড়া অর্থনীতির অন্যান্য খাতে আমরা তেমন স্বস্তিতে নেই। ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিজিএমইএর পরিচালক ও সুরমা গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে ঝুঁকি রয়ে গেছে, কারণ এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নেই।
যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম রিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, ব্যবসা পরিচালন ব্যয় কমাতে উদ্ভাবনী নীতি প্রণয়ন এবং মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি।
মুক্ত আলোচনায় ঢাকা চেম্বারের প্রাক্তন পরিচালক এ কে ডি খায়ের মোহাম্মদ খান, স্ট্যান্ডিং কমিটির আহ্বায়ক সালাহউদ্দিন ইউসুফসহ ব্যবসায়ী নেতারা বক্তব্য দেন।
সেমিনারে ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মানসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।



