ইফতারের প্রস্তুতি নেওয়ার মুহূর্তে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ, নিভে যায় দুই প্রাণ

সৌদিআরবের রিয়াদে প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাটির কাছে আল-খারজের একটি ক্লিনিং মেইন্টেনেন্স কোম্পানির আবাসন ব্যবস্থা। সেখানে ওই কোম্পানির কর্মীরা বসবাস করেন। এই আবাসিক এলাকাতে রবিবার (৮ মার্চ) বিকালে ইফতারের প্রস্তুতি নেওয়ার আগ মুহূর্তে আঘাত হানে ক্ষেপণাস্ত্র। এতে দুইজন বাংলাদেশি নিহত হন আর আহত হন ১০ জন। আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর, তার শরীরের ৭২ শতাংশ পুড়ে গেছে। সৌদি আরবের রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সুত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা আহতদের চিকিৎসার বিষয়ে খোঁজ রাখছেন।
এই হামলার কথা স্বীকার করেছে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি)। তারা জানিয়েছে, সৌদির আল-খারজেসহ বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের রাডার সিস্টেম লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। আল-খারজেই হতাহতের ঘটনাটি ঘটেছে। এই ঘটনায় নিহত বাংলাদেশিরা হলেন— কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি উপজেলার জালালপুরের পশ্চিম ফিকামার এলাকার রইস উদ্দিনের ছেলে বাচ্চু মিয়া ও টাঙ্গাইলের সখিপুর উপজেলার কচুয়ার কীর্তনখোলা এলাকার মো. সুরজত আলীর ছেলে মো. মোশাররফ হোসেন।
দূতাবাস সূত্রে জানা যায়, ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বাচ্চু মিয়ার দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী কর্মীরা জানান, বিকাল সাড়ে চারটার দিকে সবাই সাধারণত ইফতারের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। এসময় আলখারাজ এলাকার আলহারাদ সড়কের পাশে শিল্প এলাকায় আলতোয়েক অপারেশন অ্যান্ড মেইনট্যানেন্স কোম্পানির শ্রমিক আবাসনে ৬০ জন বাংলাদেশি কর্মী বাস করতেন। তারা সবাই আলখারজ মিউনিসিপ্যালিটি এলাকায় কীটনাশক স্প্রে করেন। ঘটনার সময় তারা তাদের কক্ষে অবস্থান করছিলেন।
কর্মীরা জানান, বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে আকস্মিকভাবে একটি ক্ষেপণাস্ত্র বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। এসময় রুমের বাইরে কয়েকজন অবস্থান করছিলেন। তারা বিস্ফোরণে আহত হন। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশসহ অন্যান্য সংস্থা ঘটনাস্থলে এসে নিহতদের মরদেহ এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠায়।
দূতাবাস সুত্রে জানা গেছে, বাকি কর্মীদের নিরাপদ দূরত্বে আলউরুদ এলাকায় একটি সরকারি মিউনিসিপ্যালিটির শ্রমিক আবাসনে স্থানান্তর করা হয়েছে। আবাসনে স্থানান্তরিত কর্মীদের সঙ্গে দূতাবাসের কর্মকর্তারা সাক্ষাত করে দূতাবাসের পক্ষ থেকে সব ধরণের সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কর্মীদেরকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং যেকোনও প্রয়োজনে বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ঢাকার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, ইতোমধ্যে দূতাবাসের পক্ষ থেকে আলখারজ অঞ্চলের পুলিশ প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মৃতদেহের দ্রুত পোস্টমর্টেম সম্পন্ন করে বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়ে সহয়তা চাওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সৌদি আরবে নিহত ২ জনের লাশ সৌদি কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে দেশে আনা হবে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক জানিয়েছেন, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আজ পর্যন্ত ৪ জন বাংলাদেশি শহীদ হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, “বাহরাইনে ১ জন, দুবাইয়ে ১ জন, সৌদি আরবে ২ জনসহ মোট চারজন নিহত হয়েছেন এই যুদ্ধে। আজও আমরা সৌদিতে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি। টাঙ্গাইলের যিনি মারা গিয়েছেন তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি।”
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে হতে তার পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা এবং সহযোগিতা, সামগ্রিক আশ্বাস এবং তাদের পরিবারের লাশ যেন তাদের কাছে আমরা পৌঁছে দিতে পারি সে বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। কিশোরগঞ্জের যিনি মারা গিয়েছেন তার পরিবারের সঙ্গেও আমরা কথা বলেছি।”
এছাড়া তিনি আরও বলেন, “এ পর্যন্ত আমাদের কাছে যে তথ্য আছে— তাতে প্রায় ১৪ জনের মতো আহত হয়েছেন। তাদেরকে আমাদের সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসগুলো পূর্ণাঙ্গ সেবা দিয়ে যাচ্ছে।”
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, “আমাদের বাংলাদেশি প্রবাসী ভাইয়েরা যারা মধ্যপ্রাচ্যে আছেন তাদের প্রতি আমাদের একটা আহ্বান থাকবে যেহেতু এখনকার এই সংকটের ক্ষেত্রে আমাদের কোন হাত নাই— তাদের প্রতি আমাদের নির্দেশনা বা পরামর্শ হচ্ছে যতটুকু সম্ভব সংঘাতপূর্ণ এবং বিশেষ করে যে স্থানগুলো আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে সেই সমস্ত এলাকাগুলো এড়িয়ে চলার জন্য।” সতর্কতার সাইরেনসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলো যে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন সেগুলো মেনে চলার আহবান জানান তিনি।
দূতাবাস সুত্রে জানা গেছে, আহতদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর। তাদের মধ্যে একজন টাঙ্গাইলের সবুজ মিয়া বর্তমানে আল খারজ কিং খালেদ হাঁসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার উরুর হাড় ভেঙ্গে গেছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রিয়াদের কিং সাউদ মেডিক্যাল সিটিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। গুরুতর আহত অপর দুইজন হলেন— ময়মনসিংহের মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন এবং নরসিংদীর অনিক মিয়া। তারা বর্তমানে সুলাইমান আল হাবিব হাসপাতালে ভর্তি আছেন। মামুনের শরীরে ৭২ শতাংশ পুড়ে গেছে, পায়ের গোড়ালি ভেঙ্গে গেছে। অনিক মিয়া মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছেন এবং বর্তমানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) অজ্ঞান অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছেন। তবে তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছে চিকিৎসকরা।
আহত অন্যান্যদের মধ্যে ৭ জনের পরিচয় জানা গেছে। এরা হলেন— নারায়ণগঞ্জের সাকিবুল হাসান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কামরুল মিয়া, নরসিংদীর রেজাউল করীম রাব্বি, শফিক (বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি), নরসিংদীর আব্দুল জলিল, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোবারক হোসাইন এবং কুমিল্লার রাসেল মিয়া। এদের মধ্যে কারও আঘাতই গুরুতর নয় বলে জানিয়েছে চিকিৎসকরা। দুই-একদিনের দিনের মধ্যে চিকিৎসা শেষে রিলিজ দেওয়া হবে এবং রাসেল মিয়াকে ইতোমধ্যে রিলিজ দেওয়া হয়েছে।


