ট্রাম্পের ‘জয়’ ঘোষণা কি সময়ের ব্যাপার, নাকি চোরাবালি?

মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের ব্যাপক বিমান হামলার মাধ্যমে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করেছে। যুদ্ধের শুরুতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত একটি কূটনৈতিক সমাধান কিংবা ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ আশা করেছিলেন। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের বর্তমান পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ বলছে, এই লড়াই এক দীর্ঘস্থায়ী ও অনিশ্চিত সংঘাতের দিকে মোড় নিচ্ছে, যেখানে ‘জয়’ শব্দটির সংজ্ঞাই অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এখন প্রধান প্রশ্ন হলো, কে কতদিন এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে। ইরান ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর দিকে দুই হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বাহরাইনের পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট এবং সৌদি আরবের তেল স্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আক্রমণের চেষ্টা আঞ্চলিক নিরাপত্তায় গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের নিরাপত্তা বিশ্লেষক কেলি গ্রিকো মনে করেন, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দ্রুত ফুরিয়ে আসা মার্কিন বাহিনীকে শিগগিরই কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে ফেলতে পারে। পেন্টাগন ইতোমধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলারের জরুরি বাজেট প্রস্তাব করেছে, যার বড় অংশই ব্যয় হবে অস্ত্রের মজুত পুনরায় পূর্ণ করতে।
ট্রাম্প প্রশাসন আশা করেছিল, যুদ্ধের ধাক্কায় ইরানের অভ্যন্তরীণ সরকারবিরোধী আন্দোলন তীব্র হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির মৃত্যুর পর তেহরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের বদলে শোকমিছিলের আধিপত্য দেখা গেছে। চ্যাথাম হাউসের বিশেষজ্ঞ সানাম ভাকিল বলেন, বাহ্যিক আক্রমণ প্রায়ই অভ্যন্তরীণ বিরোধ কমিয়ে জাতীয়তাবাদী সংহতি তৈরি করে। ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো সংকটের সময়েও যথেষ্ট টেকসই হতে পারে।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ফেলো ত্রিতা পার্সির মতে, এই সংঘাতের প্রকৃত চালিকাশক্তি ইসরায়েল। ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব রুখতে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের কৌশলগত লক্ষ্যই এই যুদ্ধকে দ্রুত উসকে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই সামরিক চাপ ইরানিদের সামনে নতুন ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ তৈরি করবে। সমালোচকদের মতে, ইসরায়েলের এই কৌশল বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র প্রধান সামরিক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও সৌদি আরবের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা এখন সরাসরি ইরানি হামলার ঝুঁকির মুখে। আমিরাতি বিশ্লেষক আব্দুলখালেক আব্দুল্লা জানান, আকাশে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের উপস্থিতি তাদের কৌশলগত অবস্থানকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর করে তুলেছে। পাশাপাশি ইরাক ও লেবাননে ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা পুরো অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আলী ভায়েজ মনে করেন, যুদ্ধের পরিণতি নির্ভর করবে মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং ইরানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। তিনি সতর্ক করে বলেন, “এই যুদ্ধে ‘জয়’ ঘোষণা করা যতটা সহজ, বাস্তবে তা অর্জন করা ততটা নয়। ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো দ্রুত যুদ্ধ শেষ করে ক্ষয়ক্ষতি সীমিত করতে চাইবে, কিন্তু ইরান যদি রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকে, তবে তারাও নিজেদের বিজয়ী হিসেবে দাবি করবে।”
সূত্র: ডয়চে ভেলে, সিজিটিএন, দ্য ইকনোমিস্ট



