বাংলাদেশের বুকে যেন এক টুকরো জাপান

চার লেন সড়কের দুই পাশ দিয়ে ছুটছে যানবাহন। তার মধ্যে সড়কের বিভাজকে বেড়ে উঠেছে ফুলের গাছ। গাড়ি ছুটে চলায় দমকা বাতাস আছড়ে পড়ে। বাতাসের মৃদু ঝাপটায় দুলে ও নেচে ওঠে নানা রঙের ফুল। যেন তারা নেচে-দুলে পথচারী ও যাত্রীদের সঙ্গে নীরবে কথা বলে, হাসি বিনিময় করে নিত্যদিন। এ যেন এক অন্যরকম সড়ক। এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্যপট মুহূর্তেই বদলে দেয় যাত্রাপথের অনুভূতি।
দেশের অন্যতম ব্যস্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চিত্র এটি। ভাওয়ালের ঐতিহ্যবাহী শাল-গজারি বনের বুক চিরে ছুটে গেছে এটি। প্রতিদিন হাজারো যানবাহনের কোলাহলে মুখর সড়কটি এখন আর কেবল যাতায়াতের পথ নয়, বরং প্রকৃতির রঙিন সাজে সেজে উঠেছে। তার বুক চিরে রূপের পসরা সাজিয়ে বসেছে বসন্ত। মহাসড়কটির বিভাজকের গাজীপুরের বিভিন্ন অংশের কোথাও ফুটেছে রক্তরাঙা পলাশ, কোথাও শুভ্র, হালকা বা গাঢ় গোলাপি জাপানি ক্যাসিয়া রেনিজেরা। যেন ফুলের সৌন্দর্যে মিশে গেছে সড়ক।
গাজীপুরের হোতাপাড়ায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ডিভাইডারে ফুটে থাকা সাদা ও গোলাপি রঙের কাঞ্চন ফুল দেখে অনেকেই একে জাপানের বিখ্যাত ‘চেরি ব্লসম’ বা সাকুরার সঙ্গে তুলনা করছেন। বসন্তের আগমনে এই মনোরম দৃশ্য পথচারী ও ভ্রমণপিপাসুদের দৃষ্টি কাড়ছে, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ভাইরাল হয়েছে।
যাতায়াতের সময় যাত্রীরা এসব দেশি-বিদেশি ফুল দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন। কেউ যানবাহন থামিয়ে ছবি তুলছেন, কেউ করছেন ভিডিও। আবার কেউ বাস কিংবা মাইক্রোবাসের জানালা দিয়ে তাকিয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। দূর-দূরান্ত থেকে ফুলের সৌন্দর্য দেখতে আসছেন অনেকেই। সড়কের আশপাশে দাঁড়িয়ে ফুলের সঙ্গে ছবি তুলছেন। কেউ ভিডিও করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের জয়দেবপুর থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত ৮৭.১৮ কিলোমিটার অংশ ২০১৬ সালের ২ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে চার লেনে উন্নীত করে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এটি চার লেনে উন্নীত করার সময় এক লেনের গাড়ির হেডলাইটের আলো যাতে বিপরীত লেনের গাড়িতে না পড়ে, সেজন্য বিভাজকের ওপর দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছ রোপণ করা হয়। এসব ফুলগাছের মধ্যে ছিল নয়নাভিরাম সোনালু, কাঞ্চন, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, কদম, পলাশ, বাগান বিলাশ, হৈমন্তী, কুর্চি, টগর, জবা, কদম, বকুল, কবরী, জারুল ও জাপানি চেরী গোত্রের ক্যাসিয়া রেনিজেরা।
প্রায় তিন-চার বছর আগে পলাশ, জারুল, সোনালু, রাধাচূড়া, বাগানবিলাস, কদম, বকুল ও জবা ফুল ফুটে মুগ্ধ করে যাত্রীদের। গত বছর কিছু গাছে অল্প কিছু জাপানি ক্যাসিয়া রেনিজেরা ফুটেছিল। এবার শীত বিদায় নেওয়ার পর ওই তিন প্রজাতির ক্যাসিয়া রেনিজেরা ফুটতে শুরু করে। চেরিগুলো বসন্তের শুরুতে মেলে ধরতে শুরু করে তাদের মোহনীয় সৌন্দর্য। তুলোর মতো হালকা সাদা, হালকা গোলাপি ও গাঢ় গোলাপি ফুলে বিশেষ করে গাজীপুরের হোতাপাড়ার সড়ক বিভাজক রূপ নিয়েছে এক টুকরো জাপানে। বিশেষ করে সালনা, রাজেন্দ্রপুর, হোতাপাড়া, ভবানীপুর, বাঘেরবাজার, মাস্টারবাড়ি, নয়নপুর এলাকায় সবচেয়ে বেশি ফুল দেখা যাচ্ছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত প্রায় ৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়কের প্রায় ১৩ ফুট প্রশস্ত বিভাজকে রোপণ করা হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছ ও বৃক্ষ। শহরের কোলাহল পেরিয়ে এই সড়কে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সবুজের সমারোহ আর ফুলের বর্ণিল ছটা, যা যাত্রীদের মনে এনে দেয় এক ধরনের প্রশান্তি। বিশেষ করে শ্রীপুর উপজেলার বিভিন্ন অংশে এই সৌন্দর্য আরও বেশি চোখে পড়ে এবং ধীরে ধীরে ময়মনসিংহ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে ফুলের এই শোভা।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তা, যানবাহনচালক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুরো সড়কের বিভাজকজুড়েই ফুলের গাছ আছে। চৌরাস্তা থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফুল ফোটে। বিভাজকে নীল কাঞ্চন, কামিনী, কৃষ্ণচূড়া, জোড়া টগর, রাধাচূড়া, অগ্নিশ্বর, পলাশ, গৌরীচূড়া, কনকচূড়া, কনকচাঁপা, কদম, কাঠবাদাম, জারুল ও রক্তকরবীসহ নানা প্রজাতির ফুলগাছ আছে। এসব গাছে বছরজুড়েই পর্যায়ক্রমে ফুল ফোটে। ফলে ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে সড়কটি নতুন নতুন রঙে সেজে ওঠে।
এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সড়ক ও ফুল বাগানের কথা ছড়িয়ে পড়েছে। ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিদিন মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে মানুষের ভিড় বাড়ছে। কেউ কেউ সরাসরি বিভাজকের ওপর ওঠে ছবি তুলছেন, আবার কেউ মহাসড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে ভিডিও ধারণ করছেন। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
অনেক দর্শনার্থী মহাসড়কের এই দৃশ্যের ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে লিখছেন, ‘এইটা কিন্তু জাপান না। প্রাণের শহর গাজীপুরের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক সেজেছে নতুন রূপে।’
আরকেজন ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, সৌন্দর্যের যেন অপমৃত্যু না হয়। সৌন্দর্য উপভোগ করা আমাদের অধিকার এবং রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। তাই দয়া করে ছবি তুলতে গিয়ে কেউ গাছের ক্ষতি করবেন না, ফুল ছিঁড়বেন না। রাস্তায় ভিড় করে ঝুঁকি সৃষ্টি করবেন না। প্রকৃতির এই উপহারটুকু নষ্ট না করি।
অনেকেই এ দৃশ্যকে জাপানের চেরি ব্লসমের সঙ্গে তুলনা করছেন। ফেসবুকে এই ফুলের সড়কের ছবি-ভিডিও দেখে এটি দেখতে এসেছেন কাপাসিয়া সেন্ট্রাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থী তামান্না সরকার এবং মোহনা সরকার। তারা জানিয়েছেন, ফেসবুকে সড়কের এমন দৃশ্য দেখে শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ী থেকে তারা দুজন এসেছেন। সড়ক বিভাজকে ফুটে থাকা ফুলের বাগান আসলেই অনেক সুন্দর। ছবি তুলেছেন, আনন্দ করেছেন। এ যেন এক টুকরো জাপান বললেন তারা।
দর্শনার্থী মৌসুমী সরকার বলেন, ‘দেখে মনে চচ্ছে মহাসড়কে একখণ্ড জাপান ভেসে উঠেছে। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা দরকার। সেলফি নিতে বা ভিডিও করতে অনেকে সড়কের এক পাশ থেকে রোড ডিভাইডারের ওপর চলে যান। এটি নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশ বা সড়ক বিভাগ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।’
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অমিত হাসান বলেন, ‘ফেসবুকে ছবি দেখে সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসেছি। এটি আমার মতো অনেককেই আকর্ষণ করেছে। দেখে মনে হচ্ছে আমরা শীত প্রধান কোনও দেশে বসবাস করছি। এমন পরিবেশ মানব মনের ভেতরে লুকানো সহজ সরল সৌন্দর্যকে বিকশিত করে তোলে। এমন দৃশ্য শুধু ঢাকা-ময়শনসিংহ মহাসড়কে নয়, দেশের সব মহাসড়কে থাকলে সবার মানসিক সৌন্দর্য ফুটে উঠতো। যান্ত্রিক জীবন, হানহানি, মারামারি, একে অপরের দোষ ত্রুটি খোঁজার মানসিকতাও অনেকাংশে লোপ পেতো।’
সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মহাসড়কের সড়ক বিভাজকে অন্তত ১২ ফুট জায়গা রয়েছে। সেই স্থানে ২০১৫ সালের দিকে রোপণ করা হয়েছে এসব ফুলের গাছ। প্রথম দিকে ফুল ফোটার দৃশ্যগুলো আধিক্য না থাকলেও বর্তমানে গাছগুলোর পরিপক্বতা বাড়ায় ফুলের সমারোহ বেড়েছে। রাতে একপাশে চলা পরিবহনের আলো অপর পাশের চলা পরিবহনের চালকদের চোখে পড়ে যেন কোনও বিপত্তি সৃষ্টি না হয়, সেজন্যই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভাওয়ালের শালবনে নতুন মাত্রা এনে দিতে পারে সেজন্যই এ ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। এখন দুটোই সার্থক হয়েছে।
গাজীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মুহাম্মদ তারিক হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মহাসড়ক দৃষ্টিনন্দন করতে ২-৫ মিটার প্রস্থের স্থানে তিনটি সারিতে এবং ১-২ মিটার প্রস্থের স্থানে একটি সারিতে বিভিন্ন প্রজাতির কয়েক হাজার চারা রোপণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকায় গাছগুলোতে বিভিন্ন রকমের ফুল ফোটায় সবার নজর কাড়ছে। সৌন্দর্যবর্ধনে এগুলোর পরিচর্যা করা হয়। গাছগুলো পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবদান রাখছে। সবাই অন্যরকম এক অনুভূতি পাচ্ছে।’



