মেলার বর্তমান দশার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার দায়ী : জি এইচ হাবীব

উমামা জামান মিম: মেলায় আপনার নতুন কী বই প্রকাশিত হচ্ছে?
জি এইচ হাবীব: অনূদিত কিছু প্রবন্ধের একটি সংকলন ‘মৃদুল মধুর সন্তরণ’।
প্রশ্ন: বইটি নিয়ে পাঠকদের কিছু বলুন? বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কি এই বইয়ের বিষয়বস্তুকে প্রভাবিত করেছে?
উত্তর: বইটি আসলে বিশ্বসাহিত্যের সৃজনশীল ও মননশীল কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই, যেমন: জেমস জয়েসের ইউলিসিস-এর একটি চীনা অনুবাদ, হেরোডোটাসের ইতিহাস, থুসিডাইডিসের পেলোপনেসীয় যুদ্ধের ইতিহাস, এমোস তুতুওলার তাড়িখোর; বিভিন্ন লেখক যেমন আন্তন চেখভ, দস্তয়েভস্কি, আর্তুর র্যাঁবো, খলিল জিবরান, ফ্রান্ৎস ফানোঁ প্রমুখকে নিয়ে আলোচনা; এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন: বিবর্তন, নারী খৎনা (Female Genital Mutilation), উচ্ছৃঙ্খল জনতার ‘ধ্বংসাত্মক’ কর্মকাণ্ড ইত্যাদি বিচিত্র বিষয় নিয়ে নানা লেখকের ইংরেজি প্রবন্ধের বাংলা অনুবাদ।
বিষয়বস্তুগুলোর দিকে তাকালে বলা যায় যে বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বা সমস্যার কিছু ছাপ এই প্রবন্ধগুলোয় রয়েছে।
প্রশ্ন: শুরু থেকেই মেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছিল, এমন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইভেন্টের প্রতি কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা আছে?
উত্তর: মেলাটি আসলে যথাসময়ে পহেলা ফেব্রুয়ারি শুরু হলেই সবচেয়ে ভালো হতো বলে মনে করি। সব কুল রক্ষা হতো। নির্বাচনের জন্য মাঝে কয়েকদিন বন্ধ থাকতে পারত। বর্তমান এই হযবরল দশার জন্য আমি মূলত অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়ী করব, কারণ বাংলা একাডেমি নামে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হলেও সরকার এই প্রতিষ্ঠানের নানা কাজে অযথা নাক গলায়, খবরদারি করতে চায়। যতদূর জানি, এই মর্মে সরকারি নির্দেশনা ছিল যে নির্বাচনের আগে মেলা করা যাবে না। দেশে দেখবেন সব কাজ চলে কিন্তু শিক্ষা সংস্কৃতি এসবের বেলায় এসে নানা গড়িমসি চলে।
প্রশ্ন: সময় কমিয়ে আনা ও রমজানের কারণে মেলায় কেমন প্রভাব পড়বে?
উত্তর: আগেই বলেছি, পহেলা ফেব্রুয়ারি শুরু হলে সবচাইতে ভালো হতো। রোজায় আগেও মেলা হয়েছে। সামনের দুয়েক বছর ফেব্রুয়ারি মাস জুড়েই রোজা থাকবে। এসবের মধ্যেই মেলা চলতে হবে। ঈদে কি লোকে বই উপহার দিতে পারে না? একসময় তো বিয়েতে জন্মদিনে বই উপহার দেবার খুব চল ছিল। যাই হোক, এখন এত নাটকের পর মাসের শেষে মেলা করলে, তার বাজে প্রভাব তো পড়বেই। লোকে তো বুঝতেই পারছিল না মেলাটা আদৌ হবে কিনা। আর, এত পরে মেলা শুরু করাতে সময় কমিয়ে আনা ছাড়া উপায় ছিল না। কারণ ঝড়-বৃষ্টির কথা মাথায় রাখতে হয়েছে। ইদের কথা মাথায় রাখতে হয়েছে। এসবের নেতিবাচক প্রভাব তো পরবারই কথা।
প্রশ্ন: গত বছর মেলা নিয়ে প্রকাশকদের হতাশা দেখেছি, অনেকের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল—এ বছর এমন কিছু আশঙ্কা আছে?
উত্তর: নিরাপত্তার আশঙ্কার কারণেই হয়তো মেলা নির্বাচনের পরে নেবার কথা বলা হয়েছিল সরকারের তরফ থেকে। কিন্তু সরকার না চাইলে যেমন দাঙ্গা হয় না, মেলার নিরাপত্তার বেলাতেও সেকথা অনেকটা খাটে। প্রশাসন বইমেলার যথাযথ গুরুত্ব অনুধাবন করলে, বইমেলাকে তারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করলে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা খুব বড়ো সমস্যা হওয়ার কথা না।
প্রশ্ন: একটি সুন্দর বইমেলা আয়োজন করতে কী কী পদক্ষেপ নিলে ভালো হয়?
উত্তর: সংক্ষেপে বললে, এজন্য দেশের শিক্ষা-দীক্ষা, সংস্কৃতি, গ্রন্থ পাঠের সংস্কৃতি, রাজনীতির প্রভৃতির উন্নতি হওয়া দরকার। বইমেলা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা না।
প্রশ্ন: মেলায় এবং সারা বছর যত বই প্রকাশিত হয় তার ডিজিটাল ডেটাবেইজ কি বাংলা একডেমি বা কোনো কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করতে পারে?
উত্তর: করতে পারা উচিত।
প্রশ্ন: বইমেলায় পাঠক-লেখক সম্পর্ক বা যোগাযোগের বর্তমান বাস্তবতা কী?
উত্তর: করুণ। বইয়ের ছবি বা বিজ্ঞাপন কেবল ফেসবুকে, দু’চারটা পত্রিকায় পোস্ট করলেই হয় না।
প্রশ্ন: প্রচুর বই ছাপা হচ্ছে কিন্তু বইয়ের মান ও সম্পাদনা নিয়ে প্রকাশকরা কতটা সচেতন বলে মনে করেন?
উত্তর: আমরা আমাদের কোন বিষয়গুলো নিয়ে সচেতন? প্রকাশকদের রুটি-রুজি বইয়ের ওপর নির্ভর করে। সেটা ভালো হলে তাদের ভালো, লেখকদেরও ভালো, পাঠকদেরও ভালো, জাতির ভালো। কিন্তু এই ভালো হওয়া-মন্দ হওয়ার ব্যাপারটা এত সরল নয়। তাছাড়া, আমাদের শিক্ষার অবস্থা কী? কোনটা ভালো বই কোনটা খারাপ, একটা ভালো বই কীভাবে নির্মাণ করতে হয়, সে ব্যাপারে আমাদের কতটা সচেতনতা ও শিক্ষা আছে সার্বিকভাবে? আবার এগুলো কেবলই প্রকাশকদের ওপর নির্ভর করে বলে আমার মনে হয় না। লেখক, প্রকাশক, রাষ্ট্র, রাজনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনীতি, আমাদের নৈতিক মূল্যবোধ সব কিছু এটার সঙ্গে জড়িত।
প্রশ্ন: কোন প্রকাশনী থেকে আসছে? মূল্য, প্রচ্ছদ ও স্টল নম্বর জানতে চাই।
উত্তর: গ্রন্থিক। দাম ৫০০৳। প্রচ্ছদ শিল্পী: রাজীব দত্ত। স্টল নম্বর: ৯৫২-৯৫৪।



