Uncategorized

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে! 

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। গত এক বছরে এই প্রবণতা আরও উদ্বেগজনক বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, গত এক বছরে অন্তত সাতজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। বিশেষ করে ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে তিনজন শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন। 

বিশ্ববিদ্যালয় ও সহপাঠীদের মতে, প্রেমের সম্পর্কের অবনতি, মানসিক চাপ, বেকারত্বজনিত হতাশা, পারিবারিক কলহসহ নানা কারণে শিক্ষার্থীরা এই চরম আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। 

সাম্প্রতিক আত্মহত্যার ঘটনা থেকে দেখা যায়, চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি মেসে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০১৬-১৭ সেশনের শিক্ষার্থী ইমরান নাবিল। 

একইভাবে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রাকিবা গত ৮ ফেব্রুয়ারি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। 

১৯ জানুয়ারি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন থিয়েটার বিভাগের ২০১৪-১৫ সেশনের শিক্ষার্থী আকাশ সরকার। 

২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল মেসে আত্মহত্যা করেন সঙ্গীত বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী প্রত্যাশা মজুমদার। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হাবিব রিয়াদ গত ১৯ ফেব্রুয়ারি গলায় ফাঁস দেন। পরে দুই দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি মারা যান। 

ফিন্যান্স বিভাগের ২০১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থী মো. আহাদ হোসেন গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সূত্রাপুরে মেসে গলায় গামছা পেঁচিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে ১৯ ফেব্রুয়ারি চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। 

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাবরিনা রহমান শাম্মী গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নিজ বাড়িতে বিষপানে আত্মহত্যা করেন। 

এই তথ্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক এবং মানসিক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। 

প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হুমায়রা আবেদীন বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা পরিবার ছেড়ে একা থাকায় মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। কোনও অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটলে অনেকেই চাপ নিতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। শিক্ষার্থীদের হতাশা ও দুশ্চিন্তা কমাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিজ্ঞ সাইকোলজিস্ট নিয়োগ জরুরি। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।” 

পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তাইফ ওয়াসিফ বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য একটি কাউন্সেলিং সেন্টার ও বিভাগভিত্তিক ছাত্র উপদেষ্টা থাকলেও তাদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। শিক্ষার্থীরা এই বছর তিনজন সহপাঠী হারিয়েছে, যা উদ্বেগজনক। প্রশাসনের উচিত প্রতিটি বিভাগে অন্তত মাসে দুইবার কাউন্সেলিং সেশন আয়োজন করা, যা আত্মহত্যা প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।” 

শিক্ষার্থীরা কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও সহপাঠীরা বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পেছনে কয়েকটি জটিল কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— 

অ্যাকাডেমিক ও ক্যারিয়ারের চাপ: বিসিএস বা সরকারি চাকরির তীব্র প্রতিযোগিতা, সেশনজট ও পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা শিক্ষার্থীদের হতাশ করে; 

মানসিক হয়রানি ও বিচারহীনতা: সহপাঠী বা শিক্ষকের মাধ্যমে হয়রানি এবং সময়মতো বিচার না পাওয়া শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে ভেঙে দেয়;  

আবাসন ও আর্থিক সংকট: ঢাকার ব্যয়বহুল জীবনযাপন ও আবাসন সংকট অনেক শিক্ষার্থীকে একাকীত্ব ও আর্থিক চাপের মধ্যে ফেলে; 

সম্পর্কের টানাপোড়েন: ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কের সংকট অনেক সময় তাৎক্ষণিক আবেগে আত্মহত্যার সিদ্ধান্তে প্ররোচিত করে। 

মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সহায়তা বৃদ্ধি করা জরুরি। তারা কিছু পদক্ষেপের কথা জানান। সেগুলো হলো— নিয়মিত কাউন্সেলিং সেবা চালু রাখা ও অভিজ্ঞ সাইকোলজিস্ট নিয়োগ। সচেতনতামূলক কর্মশালা আয়োজন করা। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়ানো। পরিবার, বন্ধু ও শিক্ষকদের সহানুভূতিশীল ভূমিকা নিশ্চিত করা। 

মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. অশোক কুমার সাহা বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। তারা সময়মতো কাউকে বিষয়টি জানায় না বা পেশাদার সহায়তা নেয় না। ফলে হতাশা গভীর হয়ে চরম সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। নিয়মিত কাউন্সেলিং ও সচেতনতা কার্যক্রম অনেক শিক্ষার্থীকে সংকট থেকে বের হতে সাহায্য করতে পারে।” 

একই বিভাগের শিক্ষক ও ছাত্র উপদেষ্টা ড. নুর মোহাম্মদ বলেন, “অ্যাকাডেমিক চাপের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং সামাজিক চাপ শিক্ষার্থীদের উপর প্রভাব ফেলে। একাকীত্ব এড়াতে কার্যকর কাউন্সেলিং সেবা অপরিহার্য।” 

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মতে, শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা প্রবণতা রোধ, বিষণ্ণতা ও পরীক্ষা ভীতি দূর করতে ২০২২ সালের ৩ জানুয়ারি রফিক ভবনের নিচতলায় কাউন্সেলিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, সেখানে অভিজ্ঞ ও পেশাদার সাইকোলজিস্টের অভাব রয়েছে। বর্তমানে সেখানে স্থায়ী পেশাদার সাইকোলজিস্ট নেই, যা সেবার কার্যকারিতা কমিয়েছে। 

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার হুমকি দ্রুত বেড়েছে। একাধিক সামাজিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক কারণে শিক্ষার্থীরা হতাশা ও চাপের মধ্যে পড়ছেন। সময়মতো সহায়তা, কার্যকর কাউন্সেলিং এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এই প্রবণতা কমানো সম্ভব নয়। 




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button