জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো, বিপুল অস্ত্র উদ্ধার

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের আস্তানা ও অস্ত্র তৈরির কারখানাসহ অপরাধীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ। তিনি জানিয়েছেন, সোমবার ভোর ৬টা থেকে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দিনভর যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় সর্বমোট ২২ জনকে আটক করা হয়। আইনশঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ১০টি টিমে ভাগ হয়ে এ অভিযান চালায়। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পুরো এলাকায় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) দুপুর দেড়টার দিকে চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ের সামনে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন, র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান, রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক এবং চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খাঁনসহ বিজিবির কর্মকর্তারা।
রেঞ্জ ডিআইজি বলেন, ‘অভিযানে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসীদের আস্তানা ও অস্ত্র তৈরির কারখানাসহ অপরাধমূলক নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা হয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ের চূড়ায় স্থাপিত বিভিন্ন ওয়াচ টাওয়ার ভেঙে দেওয়া হয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতো। ওই এলাকায় দুটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।’
২২ জন আটক ও বিপুল অস্ত্র উদ্ধার
অভিযান চলাকালে বিভিন্ন পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে ২২ জনকে আটক করা হয়। এ সময় তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র (একটি বিদেশি পিস্তল, একটি দেশীয় পিস্তল ও একটি এলজি), ২৭টি পাইপগান, ৩০টি পিস্তলের ম্যাগাজিন, অস্ত্র তৈরির ৫৭টি পাইপ, ৬১টি কার্তুজ এবং বিভিন্ন ধরনের ১ হাজার ১১৩ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া ১১টি ককটেল, পাইপগান তৈরির লেদ মেশিনসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। ১৯টি সিসি ক্যামেরা, তিনটি ডিভিআর, একটি পাওয়ার বক্স ও দুটি বাইনোকুলার উদ্ধার করা হয়, যা অপরাধীদের নজরদারি কার্যক্রমে ব্যবহৃত হতো বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ জানায়, সোমবার ভোর ৫টা ৩০ মিনিট থেকে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান শুরু হয়।অভিযানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৪৮৭ জন সদস্য, জেলা পুলিশের ১৪৬ জন সদস্য, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ৮০০ জন সদস্য, আরআরএফ চট্টগ্রামের ৪০০ জন সদস্য, ফেনী জেলা পুলিশের ১০০ জন সদস্য, পার্বত্য জেলার ৩০০ জন সদস্য, এপিবিএনের ৩৩০ জন সদস্য, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ১২২ জন সদস্য এবং র্যাবের ৩৭১ জন সদস্যসহ ৩ হাজার ১৮৩ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য অংশ নেন। এ ছাড়া সাত জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করেন।
আকাশে ছিল ৩ হেলিকপ্টার ও ১২ ড্রোন
অভিযান কার্যকর করতে তিনটি হেলিকপ্টার, ১৫টি এপিসি (আর্মড পার্সোনেল ক্যারিয়ার), র্যাব ও সিএমপির তিনটি ডগ স্কোয়াড এবং ১২টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশের নেতৃত্বে অভিযানটি পরিচালিত হয়। এ সময় অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক এবং চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খান সরেজমিনে উপস্থিত থেকে অভিযান তদারকি করেন।
অভিযান চলাকালে কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি উল্লেখ করে রেঞ্জ ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেন, ‘উদ্ধারকৃত অস্ত্রশস্ত্র ও আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন আছে।’
টহল জোরদার
অভিযান শেষে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জঙ্গল সলিমপুরে দুটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে এসএম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ক্যাম্পে জেলা পুলিশ ও এপিবিএনের ১৩০ জন সদস্য এবং আলীনগর উচ্চ বিদ্যালয় ক্যাম্পে আরআরএফ, এপিবিএন ও র্যাব-৭ এর মোট ২৩০ জন সদস্য মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি এলাকায় চেকপোস্ট ও পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরের প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়ি এলাকাজুড়ে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। বায়েজিদ বোস্তামী থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটি। এর বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে ৩ হাজার ১০০ একর জায়গায় জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। সীতাকুণ্ড উপজেলায় হলেও নগরের কাছেই এই এলাকা। এলাকাটির পূর্ব দিকে রয়েছে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ বোস্তামী থানা। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এলাকাটি অপরাধীদের কাছে ‘নিরাপদ রাজ্য’ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে এখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার বাড়িতে অন্তত দেড় লাখ মানুষের বসবাস, যাদের অধিকাংশই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে বসতি গড়েছেন। জঙ্গল সলিমপুরে এখনও পাহাড় কেটে চলছে প্লট-বাণিজ্য। এই বাণিজ্য ও দখল টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে তোলা হয়েছে সন্ত্রাসী বাহিনী। সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে এসব সন্ত্রাসী। নগরীর সঙ্গে অবস্থান এই জঙ্গল সলিমপুরকে বলা হতো দেশের ভেতর আরেক রাজ্য। কারণ দেশের আইন ও নিয়মনীতিতে নয়, সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর নির্দেশেই চলছে সলিমপুর।
জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের দুটি পক্ষ রয়েছে। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অপর পক্ষে রোকন উদ্দিন। ইয়াসিন গত জানুয়ারিতে ওই এলাকায় অভিযানে যাওয়া এক র্যাব কর্মকর্তাকে হত্যার মামলায় প্রধান আসামি। জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় রয়েছে তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ।



