Uncategorized

জ্বালানি সংকট মোকিবলায় যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে বিভিন্ন দেশ

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব মোকাবিলায় একাধিক পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার।

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার দেশজুড়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহার কমাতে সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

অফিসগুলোতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার নিশ্চিত করতে জানালা, দরজা বা ব্লাইন্ড খোলা রাখতে বলা হয়েছে, যাতে প্রয়োজন না হলে বৈদ্যুতিক আলো ব্যবহার না করতে হয়। একইসঙ্গে বিদ্যমান আলোর ব্যবহার অর্ধেকে নামিয়ে আনা এবং অপ্রয়োজনীয় বাতি ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কর্মচারীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—ব্যবহার না হলে লাইট, ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনারসহ অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখতে। এয়ার কন্ডিশনারের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি রাখতে এবং অফিস কক্ষ থেকে বের হওয়ার সময় সব বৈদ্যুতিক যন্ত্র বন্ধ রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশিকায় করিডোর, সিঁড়ি, ওয়াশরুমসহ অন্যান্য সাধারণ স্থানে অপ্রয়োজনীয় আলোর ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি যেখানে সম্ভব সেখানে জ্বালানি-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

অফিস সময় শেষ হওয়ার পর কম্পিউটার, প্রিন্টার ও স্ক্যানারসহ সব ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্র বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—বর্তমান পরিস্থিতির কারণে এবার ঈদুল ফিতর, স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবসে সরকারি ও বেসরকারি ভবনে প্রচলিত আলোকসজ্জা করা হবে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় এ বছর স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবসে কোনও আলোকসজ্জা হবে না।

তিনি বলেন, “প্রতিবছর স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি ভবনে আলোকসজ্জা করা হয়। তবে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য এ বছর সরকার তা থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”

তিনি আরও জানান, জ্বালানি সাশ্রয় এবং সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট এড়ানোর লক্ষ্যে কৃচ্ছ্রসাধনের অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ক্যাম্পাসে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আগেভাগে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা ইতোমধ্যে বেশিরভাগ ক্যাম্পাসে কার্যকর হয়েছে।

সরকার জ্বালানি রেশনিং ব্যবস্থাও চালু করেছে। আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটা ঠেকাতে পেট্রোল পাম্পগুলোতে দৈনিক জ্বালানি বিক্রির সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি সার কারখানার মধ্যে চারটি ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে ওই গ্যাস বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা যায়।

সরকারি সূত্র জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহ থেকে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটি শুরু হচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার আরও পদক্ষেপ নিতে পারে।

ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, সরকার ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে।

তিনি বলেন, “এখন আমাদের জনগণকে সংকট সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। শুধু ব্যবস্থা নেওয়া বা আইন চাপিয়ে দিলেই হবে না, মানুষ সচেতন না হলে তাতে খুব বেশি ফল পাওয়া যাবে না।”

তিনি আরও বলেন, “অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহার বন্ধ করতে পারলে তা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য বড় সহায়তা হবে, কারণ আমরা সরাসরি যুদ্ধের প্রভাবে পড়িনি।”

অন্য দেশগুলো কী পদক্ষেপ নিয়েছে?

প্রতিবেশী দেশ ভারত মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিকল্প উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।

ঘাটতি মোকাবিলায় ভারতীয় জ্বালানি কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে সোমবার (৯ মার্চ) থেকে কিছু শিল্প গ্রাহকের কাছে গ্যাস সরবরাহ কমানো শুরু করেছে।

জরুরি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পাকিস্তান সরকার সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা খাত এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে জ্বালানি সাশ্রয়ের বিভিন্ন পদক্ষেপ বিবেচনা করছে।

এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো—যেখানে সম্ভব সেখানে সরকারি অফিস ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ চালু করা।

একইভাবে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সাময়িকভাবে অনলাইন ক্লাসে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।

এছাড়া অপ্রয়োজনীয় বৈঠক, সম্মেলন ও সরকারি সমাবেশ—যেগুলোতে ভ্রমণ বা বেশি জ্বালানি ব্যবহারের প্রয়োজন হয়—সেগুলো সীমিত করার পরিকল্পনাও করছে পাকিস্তান সরকার।

পাশাপাশি বিকল্প তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের সঙ্গে যোগাযোগও করছে দেশটি।

দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ জ্বালানির দামের ওপর সীমা নির্ধারণের কথা জানিয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিউং বলেছেন, তার সরকার দ্রুত পেট্রোলজাত পণ্যের দামের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করবে।

তিনি বলেন, প্রয়োজনে আর্থিক বাজার স্থিতিশীল রাখতে ১০০ ট্রিলিয়ন ওন (৫০ বিলিয়ন পাউন্ড বা ৬৭ বিলিয়ন ডলার) তহবিল কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করা হতে পারে।

থাইল্যান্ডে প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চানভিরাকুল জনগণকে জ্বালানি মজুত না করার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি ডিজেলের দাম ১৫ দিনের জন্য নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির বিভিন্ন পেট্রোল স্টেশনে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।

ভিয়েতনামের অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জ্বালানি আমদানির ওপর আরোপিত কর সাময়িকভাবে তুলে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র বেশিরভাগ সরকারি দফতরে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালুর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। তবে ফায়ার স্টেশন ও হাসপাতালের মতো জরুরি সেবাগুলো এ সিদ্ধান্তের বাইরে থাকবে।

তিনি জনগণকে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য কারপুলিং, অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ কমানো এবং গণপরিবহন ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন।

ইন্দোনেশিয়া তেলের দামের ধাক্কা সামাল দিতে রাষ্ট্রীয় বাজেট থেকে জ্বালানি ভর্তুকির বরাদ্দ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

দেশটি ইতোমধ্যে জ্বালানি ভর্তুকি এবং রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি পার্টামিনা ও বিদ্যুৎ কোম্পানি পিএলএনকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য ৩৮১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ (২২ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার) বরাদ্দ রেখেছে।

বিশ্বের বৃহত্তম পাম অয়েল উৎপাদক দেশ ইন্দোনেশিয়া অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ায় আবারও বি৫০—৫০ শতাংশ পাম অয়েলভিত্তিক বায়োডিজেল এবং ৫০ শতাংশ প্রচলিত ডিজেলের মিশ্রণ—চালুর পরিকল্পনা পুনরুজ্জীবিত করতে পারে বলে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

প্রতিবেশী মিয়ানমারে সামরিক সরকার ব্যক্তিগত গাড়ির অর্ধেককে সড়কে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, জোড় সংখ্যার নাম্বারপ্লেটের গাড়ি জোড় তারিখে এবং বিজোড় সংখ্যার নাম্বারপ্লেটের গাড়ি বিজোড় তারিখে চলাচল করতে পারবে।

গত এক সপ্তাহে থাইল্যান্ড, লাওস ও মিয়ানমারের বিভিন্ন পেট্রোল স্টেশনে দীর্ঘ লাইনের খবর পাওয়া গেছে।

আইএনজি ব্যাংকের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের গবেষণা প্রধান দীপালি ভার্গাভা এক বিশ্লেষণে লিখেছেন, “মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া ছাড়া প্রায় সব বড় অর্থনীতিই তেল ও গ্যাস বাণিজ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতিতে রয়েছে, ফলে বৈশ্বিক দাম বাড়লে তারা ঝুঁকির মুখে পড়ে।”

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সোমবার বলেছেন, প্রয়োজনে কৌশলগত জ্বালানি মজুত ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে। তিনি বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির বিষয়ে সমন্বিত প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে জি৭ নেতারা এ সপ্তাহেই বৈঠক করতে পারেন।

বর্তমানে জি৭ জোটের ঘূর্ণায়মান সভাপতিত্ব করছে ফ্রান্স।

এদিকে যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে জি৭ দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠক করছেন।




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button