জ্বালানি সংকট সমাধানে দিনের আলোভিত্তিক অর্থনীতি হতে পারে উত্তম বিকল্প

আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কেটেছে বাংলাদেশের এক সম্ভ্রান্ত নগরীতে। সূর্যের ঘুম ভাঙলেই যে নগরীর ঘুম ভাঙতো। আমাদের ক্লাস শুরু হতো সকাল ৮টা ১০ মিনিটে। ভোর বেলা আমরা ঘুম থেকে উঠে বাজার করতাম। সেই বাজারে রান্না হতো। সেই খাবার খেয়ে আমরা ৭টা ৪০ মিনিটের গাড়ি ধরে ক্লাসে পৌঁছাতাম। রাজশাহী নগরী এখন কেবল দেশে নয়, এই উপমহাদেশেও অনন্য। অপরদিকে, আমি যেখানে বড় হয়েছি, বেড়ে উঠেছি, সেই জনপদেরও ঘুম ভাঙতো খুব ভোর বেলা। ফজরের নামাজের পর আমি খুব কম মানুষকে ঘুমোতে দেখতাম। যে যার মতো কাজে বেরিয়ে পড়তো। জোহরের আজানেই শেষ হতো কাজ। বিকাল বেলা খেলাধুলা ও বেড়ানো। আর সন্ধ্যা বেলা পরিবার। ওভাবেই গড়ে উঠেছিল ওই জনপদের গল্প। গল্পটা দক্ষিণ বঙ্গের। সাতক্ষীরা জেলার। তারপর, আমার কর্মজীবন শুরু হলো নতুন এক জগতে। এখানে সকাল বেলা শহরের ঘুম ভাঙে না। চোখে পানির ছিটা দিয়ে ঘুম ভাঙাতে হয় শহরের। বেলা ১১টায়ও কিছু কিছু দোকানপাট বন্ধ থাকে। কখনও কখনও একটা দেয়াশলাইয়ের বক্স কিনতেও পাড়ি দিতে হয় কয়েক-শ কদম। এ শহর ঘুমাতে যায় গভীর রাতে। এ শহরের প্রাণকেন্দ্রে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষ জেঁগে থাকে। কোলাহল জেঁগে থাকে। বলছি, রংপুর শহরের কথা। আমি বলছি না, এই শহরের মানুষ অলস। আমি বলছি না, এই শহরের মানুষ ঘুম কাতুরে। অধিকন্তু, তারা অনেক বেশি পরিশ্রমী। আমি শুধু বলছি, এই শহর, এই জনপদের মানুষ কাজের সময়টাকে বদলে দিয়েছে। বদলে নিয়েছে। দিনের আলোর বদলে তাদের অর্থনীতি গড়ে উঠেছে রাতের আলোয়।
বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ, জ্বালানি-নির্ভর ও আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির দেশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তরল জ্বালানি ও আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় জাতীয় অর্থনীতিতে চাপ বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দিনের আলো সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং রাত ৮টার মধ্যে বেশির বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার একটি নীতি কেবল সময় ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়, এটি অর্থনীতি, সমাজ, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ— সবকিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত হতে পারে। প্রশ্ন হলো, প্রধানমন্ত্রী কি দিনের আলো-নির্ভর একটি অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য নির্দেশনা দেবেন, এবং দিলে তার প্রভাব কী হতে পারে?
বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালে সূর্যোদয় হয় ভোর ৫টা থেকে সাড়ে ৫ মধ্যে এবং সূর্যাস্ত হয় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে পৌনে ৭টার মধ্যে। অথচ বেশিরভাগ অফিস শুরু হয় সকাল ৯টায় এবং বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকে রাত ১০টা-১১টা পর্যন্ত। ফলে দিনের প্রাকৃতিক আলো পুরোপুরি ব্যবহৃত হয় না, বরং সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বাংলাদেশে পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ১৫ হাজার থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছে। যদি রাত ৮টার মধ্যে শপিংমল, রেস্তোরাঁ, অপ্রয়োজনীয় অফিস ও বিপণিবিতান বন্ধ করা হয় এবং অফিস সময় সকালমুখী করা হয়— তাহলে পিক আওয়ারে অন্তত ৫-৮ শতাংশ চাহিদা কমানো সম্ভব বলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এর অর্থ প্রায় ৮শ-১২শ মেগাওয়াট কম লোড। প্রতি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে যদি গড়ে বছরে ৬-৭ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয় (জ্বালানি, পরিচালন ও ভর্তুকিসহ), তাহলে বছরে প্রায় ৫ হাজার থেকে৭ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত সাশ্রয়ের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এই অঙ্কটি বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বিশ্বে দিনের আলো ব্যবহার বহু দেশে চালু ছিল বা আছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিএসটি চালুর পেছনে প্রথমিক যুক্তি ছিল জ্বালানি সাশ্রয়। মার্কিন জ্বালানি দফতরের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সময় এক ঘণ্টা এগিয়ে দেওয়ার ফলে দৈনিক বিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রায় ০.৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস ঘটে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে বছরে শত শত মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করে। কিছু গবেষণায় বছরে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, বিশেষত আলো ও গৃহস্থালি বিদ্যুৎ ব্যবহারে। জার্মানিতে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ডিএসটি’র ফলে বছরে প্রায় ০.৩-০.৮ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে, যা অর্থমূল্যে কয়েকশ’ মিলিয়ন ইউরোর সমান। ফ্রান্স সরকারও একাধিকবার জানিয়েছে, সময় সমন্বয়ের মাধ্যমে আলো-নির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, যার আর্থিক মূল্য বছরে প্রায় ৩০০-৪০০ মিলিয়ন ইউরো পর্যন্ত হতে পারে।
জাপানে ২০১১ সালের ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর বিদ্যুৎ ঘাটতি তীব্র হলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় আন্দোলনের মাধ্যমে অফিস সময় এগিয়ে আনা ও রাতের কার্যক্রম সীমিত করা হয়। জাপানে সেই সময় শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে প্রায় ১০-১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো সম্ভব হয়েছিল বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ আছে। অর্থমূল্যে এর প্রভাব কয়েক বিলিয়ন ডলারের সমান ছিল, কারণ আমদানিকৃত জ্বালানির বিল কমে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও গ্রীষ্মকালে সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপ কমানো হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতে সরকারি খাতে সংক্ষিপ্ত কর্মসপ্তাহ ও সময় পুনর্বিন্যাসের ফলে জ্বালানি ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় হয়েছে বলে নীতিগত বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। একইভাবে সৌদি আরবে তাপমাত্রা ও শক্তি ব্যবস্থাপনার কারণে সময়সূচি সমন্বয়ের অর্থনৈতিক প্রভাব ইতিবাচক বলে বিবেচিত হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশই আমদানিকৃত জ্বালানিনির্ভর। যদি বছরে ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব হয়, তাহলে তা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। একইসঙ্গে সরকারকে বিদ্যুৎ ভর্তুকি কম দিতে হবে। ভর্তুকি কমলে সেই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে ‘সুযোগব্যয় পুনর্বিন্যাস’— অর্থাৎ অপ্রয়োজনীয় ব্যয় থেকে উৎপাদনশীল খাতে সম্পদের স্থানান্তর বোঝায়।
এ ধরনের নীতির সামাজিক প্রভাবও গভীর। রাত ৮টার মধ্যে বেশিরভাগ কার্যক্রম শেষ হলে পরিবারভিত্তিক জীবনযাত্রা পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। বর্তমানে শহুরে জীবনে অনেক কর্মজীবী মানুষ রাত ৯টা-১০টার আগে বাসায় ফিরতে পারেন না। ফলে সন্তানদের পড়াশোনা তদারকি, একসঙ্গে খাবার খাওয়া বা পারিবারিক আলাপচারিতা সীমিত হয়ে যায়। আগেভাগে কাজ শেষ হলে পরিবারে মানসম্মত সময় বৃদ্ধি পাবে। সামাজিকভাবে এটি অপরাধপ্রবণতা হ্রাস, কিশোরদের অনিয়ন্ত্রিত রাতজাগা কমানো এবং পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালী করতে সহায়ক হতে পারে।
শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও এই নীতির প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। মানবদেহের জৈবিক ঘড়ি প্রাকৃতিক আলো-অন্ধকার চক্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা ও মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। বিভিন্ন স্বাস্থ্য গবেষণায় দেখা গেছে, রাত জাগা কর্মসংস্কৃতি উৎপাদনশীলতা কমায় এবং দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ায়। যদি একটি দেশের কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর মাত্র ১০ শতাংশও উন্নত ঘুম ও কম মানসিক চাপের কারণে বছরে একজন গড়ে ৩-৫টি অসুস্থতাজনিত কর্মদিবস কম নেন, তাহলে জাতীয় উৎপাদনশীলতায় তার আর্থিক প্রভাব হাজার কোটি টাকার সমান হতে পারে। বাংলাদেশের শ্রমবাজারে কর্মঘণ্টা ক্ষতির আর্থিক মূল্য বিবেচনায় নিলে এই লাভ আরও সুস্পষ্ট।
তবে বিষয়টি একমাত্রিক নয়। কিছু দেশে যেমন- যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক গবেষণায় ডিএসটি’র উপকারিতা নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, সাশ্রয় সীমিত। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন— এখানে রাতের আলো ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ও তুলনামূলক বেশি। ফলে সময়ভিত্তিক চাহিদা ব্যবস্থাপনা এখানে অধিক কার্যকর হতে পারে।
অবশ্যই, মনে রাখতে হবে— সব খাত একসঙ্গে রাত ৮টায় বন্ধ করা সম্ভব নয়। হাসপাতাল, জরুরি সেবা, রপ্তানিমুখী শিল্প, গণপরিবহন— এসব ক্ষেত্রে নমনীয়তা প্রয়োজন। কিন্তু শপিংমল, বিনোদনকেন্দ্র, অপ্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও প্রশাসনিক অফিস যদি সকাল ৭টা-৮টার মধ্যে শুরু হয়ে বিকাল ৩টা-৪টার মধ্যে শেষ হয়, তাহলে জাতীয়ভাবে একটি ‘আর্লি ইকনোমি’ গড়ে উঠতে পারে। এতে সকাল বেলার যানজটও কমবে এবং জ্বালানি খরচ হ্রাস পাবে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ জ্বালানি তেলের বাজারে ইতোমধ্যে গভীর অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নানান সতর্কতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। অপ্রয়োজনীয় আলো ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ, স্বাধীনতা দিবসে আলোকসজ্জা নিষিদ্ধকরণ, দেশের সব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা, পাম্পে তেল বিক্রির ওপর নিয়ন্ত্রণারোপসহ নানান উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ফলে বোঝা যাচ্ছে, সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট প্রায় সুষ্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদী। একই সময় ইতিবাচক দিক হলো— বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজেই নতুন এক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তিনি সকাল ৯টায় অফিসে পৌঁছাচ্ছেন। এতে সচিবলায়সহ সারা দেশের অফিসপাড়ায় সময়ের নিয়মানুবর্তিতা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি সংকটের প্রভাবকে বিবেচনায় নিতে পারলে ও প্রধানমন্ত্রীর যথাসময়ে অফিসে আগমন দৃষ্টান্তকে কাজে লাগাতে পারলে নতুন এক বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, দিনের আলো সর্বোচ্চ ব্যবহার ও রাত ৮টার মধ্যে বেশিরভাগ কার্যক্রম সীমিত করার নীতি কেবল বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বিষয় নয়, এটি অর্থনীতিতে বছরে সম্ভাব্য কয়েক হাজার কোটি টাকার সাশ্রয়, বৈদেশিক মুদ্রা রক্ষা, পারিবারিক বন্ধন জোরদার, স্বাস্থ্যব্যয় হ্রাস এবং পরিবেশগত সুবিধা— সবকিছুর সমন্বিত প্রভাব তৈরি করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী যদি এবিষয়ে একটি সুপরিকল্পিত, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য নির্দেশনা দেন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে তা কার্যকর করেন, তাহলে এটি বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট সমাধানসহ, বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় একটি কাঠামোগত সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
লেখক: শিক্ষক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়



