ট্রাম্প যুগে পারমাণবিক অস্ত্রই কি তাহলে একমাত্র নিরাপত্তা নিশ্চয়তা?

গত সপ্তাহে উত্তর কোরিয়ার একটি যুদ্ধজাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পর দেশটির নেতা কিম জং-উন একটি বিশ্লেষণধর্মী মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যুদ্ধজাহাজকে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত করার প্রক্রিয়াটি ‘সন্তোষজনকভাবে অগ্রসর’ হচ্ছে। তবে ৫ হাজার টনের ধ্বংসাত্মক জাহাজ চো হিয়ন-এর ডেক থেকে দেওয়া এই বার্তার লক্ষ্য কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শন নয়; বরং এর গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান উত্তর কোরিয়াকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি আরও জোরদার করতে উৎসাহিত করছে। কিম জং-উন এবং তার সরকার মনে করে, টিকে থাকার একমাত্র পথ হলো পারমাণবিক অস্ত্র।
দক্ষিণ কোরিয়ার দেজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সং সিয়ং-জং বলেন, কিম নিশ্চয়ই ভাবছেন, পারমাণবিক অস্ত্র নেই বলেই ইরান এভাবে আক্রান্ত হচ্ছে।
জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা এবং ট্রাম্পের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাসত্ত্বেও উত্তর কোরিয়া তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে গেছে। ২০২৫ সালে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপারি) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিয়ংইয়ংয়ের কাছে বর্তমানে প্রায় ৫০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে এবং আরও ৪০টি তৈরির মতো পর্যাপ্ত তেজস্ক্রিয় উপাদান তাদের হাতে আছে।
ইরাক, লিবিয়া, ভেনিজুয়েলা বা বর্তমান ইরানের ভাগ্য এড়াতে কিম জং-উন পারমাণবিক সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। রাশিয়ার সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়া এবং চীনের সমর্থন এই অবস্থানকে আরও সংহত করেছে।
ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার নিন্দা জানিয়ে উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে ‘অবৈধ আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তবে তারা সরাসরি ট্রাম্পের নাম নেওয়া থেকে বিরত ছিল। এতে ধারণা করা হচ্ছে, আলোচনার পথ এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
গত মাসে কিম জং-উন বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি উত্তর কোরিয়ার বর্তমান অবস্থানকে অর্থাৎ পারমাণবিক রাষ্ট্র হিসেবে সম্মান জানিয়ে তাদের সংঘাতমূলক নীতি প্রত্যাহার করে, তবে সুসম্পর্ক বজায় না রাখার কোনও কারণ নেই।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সিনিয়র উপদেষ্টা সিডনি সেলারের মতে, ট্রাম্পের সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রবণতা কিমকে আলোচনার ব্যাপারে আরও সতর্ক ও রক্ষণশীল করে তুলতে পারে। তবে কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশনের চো হান-বাম মনে করেন, ইরানের মতো উত্তর কোরিয়াকে নিরস্ত্রীকরণ করা অসম্ভব। তাই পারমাণবিক সক্ষমতা বজায় রেখেই কিম ট্রাম্পের কাছ থেকে বড় কোনও ছাড় পাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
চলতি মাসের শেষে ট্রাম্পের চীন সফরের সময় কিম জং-উনের সঙ্গে তার একটি সম্ভাব্য বৈঠকের গুঞ্জন রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি সেই বৈঠক হয়, তবে কিম বেশ শক্তিশালী অবস্থান থেকেই আলোচনা করবেন। ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে পিয়ংইয়ংয়ের কাছে এখন এটি স্পষ্ট যে, কেবল পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং এর প্রকৃত মালিকানাই নিরাপত্তার একমাত্র পথ।
দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে।



