Uncategorized

এবার বিদেশে অর্থ পাচার করা ৬ বড় গ্রুপকে টার্গেট করলো বাংলাদেশ ব্যাংক

বিদেশে পাচার হওয়া ঋণের অর্থ উদ্ধারের কার্যক্রমে কৌশলগতভাবে প্রথম ধাপে দেশের ছয়টি বড় গ্রুপকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কৌশলগত কারণে আপাতত ওই ছয় গ্রুপের নাম প্রকাশ করছে না বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ, বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে এই গ্রুপগুলোকে সিভিল অ্যাসেট রিকভারি কার্যক্রমের প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যাংক খাত থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পর তার একটি অংশ বিদেশে পাচারের শক্তিশালী তথ্য পাওয়া গেছে। তাই দ্রুত ফল পাওয়ার লক্ষ্যেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকিপূর্ণ ও আলোচিত গ্রুপগুলোকে প্রথম ধাপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এই উদ্যোগের আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক অ্যাসেট রিকভারি প্রতিষ্ঠান ও লিটিগেশন ফান্ডারদের সহায়তায় বিদেশি আদালতে সিভিল প্রসিডিংস শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলো সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন, সম্পদের অবস্থান এবং পাচারের পথ বিশ্লেষণ করে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা উদ্ধার করার কৌশল নির্ধারণ করবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, প্রথম ধাপের এই ছয়টি বড় গ্রুপের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি হবে। একইসঙ্গে এটি অন্যান্য বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধেও কঠোর বার্তা দেবে।

এছাড়া প্রথম ধাপের অভিজ্ঞতা ও অগ্রগতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী ধাপে আরও বিস্তৃত পরিসরে নতুন গ্রুপ ও মামলাকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতীয় ধাপে শতাধিক সম্ভাব্য মামলাকে সিভিল অ্যাসেট রিকভারি প্রক্রিয়ায় আনার প্রস্তুতি চলছে।

 

 

ব্যাংকগুলোকে দ্রুত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ ও তথ্য সরবরাহের আহ্বান

বিদেশে পাচার হওয়া ঋণের অর্থ উদ্ধারকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে দ্রুত কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেছেন, পাচার হওয়া অর্থ মূলত আমানতকারীদের টাকা— তাই তা যত দ্রুত সম্ভব উদ্ধার করে আমানতকারীদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন।

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ‘আপডেট অব সিভিল অ্যাসেট রিকভারি স্টাটাস’ শীর্ষক এক সভায় তিনি এসব নির্দেশনা দেন। গভর্নর একই সঙ্গে স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্সের (এআরটিএফ) চেয়ারম্যান হিসেবেও সভায় সভাপতিত্ব করেন।

সভায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান ও উপপ্রধান, ইউনিটটির পরিচালকরা এবং বিদেশে ঋণের অর্থ পাচারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তারা।

সভায় গভর্নরের পরামর্শক ও অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্সের উপদেষ্টা ফারহানুল গনি চৌধুরী পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারের অগ্রগতি নিয়ে একটি বিস্তারিত উপস্থাপনা দেন।

সম্পদ উদ্ধারে দুই ধরনের আইনি প্রক্রিয়া

উপস্থাপনায় জানানো হয়, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারের জন্য বাংলাদেশ বর্তমানে দুটি আইনি পদ্ধতি অনুসরণ করছে— ক্রিমিনাল প্রসিডিংস এবং সিভিল প্রসিডিংস।

ক্রিমিনাল প্রসিডিংস মূলত সরকার-টু-সরকার (জি২জি) ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। এতে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহায়তায় অপরাধমূলক কার্যক্রমের তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

অন্যদিকে, সিভিল প্রসিডিংসের ক্ষেত্রে বিদেশে ঋণের অর্থ পাচারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো সরাসরি উদ্যোগ নিচ্ছে। তারা আন্তর্জাতিক অ্যাসেট রিকভারি প্রতিষ্ঠান ও লিটিগেশন ফান্ডার নিয়োগের মাধ্যমে বিদেশি আদালতে মামলা করে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা করছে।

প্রথম ধাপে ছয়টি বড় গ্রুপ নির্বাচন

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের পরিমাণ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সিভিল প্রসিডিংসের প্রথম ধাপে ছয়টি বড় গ্রুপকে নির্বাচন করা হয়েছে।

এই প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক অ্যাসেট রিকভারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য ইতোমধ্যে ১০টি ব্যাংক বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৩৬টি নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (এনডিএ) স্বাক্ষর করেছে। এসব এনডিএ’র মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পাচার হওয়া অর্থ সংক্রান্ত গোপন তথ্য পর্যালোচনা করতে পারবে এবং সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত মোট এনডিএ স্বাক্ষরের প্রায় ৬০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। তবে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অগ্রগতি তুলনামূলক ধীর বলে উল্লেখ করা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, সরকারি ব্যাংকগুলো দ্রুত এনডিএ স্বাক্ষর প্রক্রিয়া শেষ করে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ শুরু করবে।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে তথ্য সরবরাহ শুরু

সভায় জানানো হয়, কিছু ব্যাংক ইতোমধ্যে তাদের খেলাপি ঋণ ও সংশ্লিষ্ট লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য আন্তর্জাতিক অ্যাসেট রিকভারি প্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহ করা শুরু করেছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের অবস্থান, সম্পদ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পথ নির্ধারণ করা হবে।

দ্বিতীয় ধাপে শতাধিক মামলার পরিকল্পনা

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপের কাজ শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় ধাপে আরও বড় পরিসরে উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ পর্যায়ে বিদেশে পাচার হওয়া ঋণের অর্থ সংক্রান্ত ১০০টিরও বেশি মামলা নিয়ে নতুন করে সিভিল প্রসিডিংস শুরু করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলার আশ্বাস

সভায় গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারের এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। তবে যদি কোনো পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে সরাসরি গভর্নরের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, এমন চাপ মোকাবিলার দায়িত্ব তিনি নিজেই নেবেন।

ব্যাংকগুলোর ওপর বাড়তি দায়িত্ব

গভর্নর আরও বলেন, সিভিল প্রসিডিংস প্রক্রিয়ায় ব্যাংকগুলোই মূল ভূমিকা পালন করে। তাই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।

তার মতে, বিদেশে পাচার হওয়া ঋণের অর্থ উদ্ধার করা গেলে তা ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button