কারাবন্দি সাংবাদিকদের মুক্তি মিলবে কবে?

কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (সিজেএ) বিএনপি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গ্রেফতার হওয়া সাংবাদিকদের মুক্তির জন্য। সংগঠনটি সম্প্রতি এক বিবৃতিতে বলেছে, “মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে হত্যাসহ বিভিন্ন ভুয়া অভিযোগে এক বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে থাকা সাংবাদিকদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানাই।”
এর আগে সম্পাদক পরিষদ এবং বাংলাদেশে মানবাধিকার রক্ষাকারী ৬৩ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি সাংবাদিকদের নির্বিচারে আটক ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন বিনা বিচারে কারাগারে থাকা সাংবাদিকদের জামিন না হওয়ায় সাধারণ মানুষ, আইনজীবী ও গণমাধ্যম মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আদালতগুলোতে সাংবাদিকদের জামিন আবেদন বারবার খারিজ করা হচ্ছে।
আইনজীবী এবং মানবাধিকার সংস্থা বলছে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা অধিকাংশ মামলা মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যদিও রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, অভিযোগ গুরুতর হওয়ায় আদালত জামিন দিচ্ছেন না।
হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিভি) প্রেসিডেন্ট ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এনেছে তা মিথ্যা। এসব মামলা থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়ার আইনি কাঠামো এখনও দেশের মধ্যে তৈরি হয়নি।”
তিনি বলেন, “নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে যেন মামলা থেকে বন্দি সাংবাদিকদের দ্রুত মুক্তি দেওয়া হয়। এটি দেশে ও বিশ্বজুড়ে নতুন বার্তা পৌঁছাবে।”
সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও শ্যামল দত্তের আইনজীবী শ্যামল কান্তি সরকার বলেন, “মুক্তি বা জামিন তো দূরে থাক, বয়স-স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায়ও তারা মৌলিক সুবিধা পাচ্ছে না। কোনও মামলার মেরিট নেই, অথচ বছরের পর বছর এভাবে কারাগারে রাখা হচ্ছে।”
কারামুক্তি পাওয়া সাংবাদিক মঞ্জরুল আলম পান্না বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের অনুসারী পুলিশ অফিসাররা এখনো মামলা বাণিজ্য করছে। নতুন সরকার যদি এগুলো বন্ধ করে, তাহলে নিরপরাধ সাংবাদিকরা মুক্তি পাবে।”
সাংবাদিক আনিস আলমগীরের আইনজীবী তাসলিমা জাহান পপি বলেন, “জামিন এখন রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। আইনের দৃষ্টিতে তারা হকদার, তবে আদালত তা মঞ্জুর করছে না।”
ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী দাবি করেন, সাংবাদিকরা ক্ষমতাচ্যুত সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং মামলার অভিযোগ গুরুতর হওয়ায় জামিন মঞ্জুর করা হচ্ছে না।
কারাবন্দি যেসব সাংবাদিক
শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রুপা ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে আটক হন। জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে হত্যাসহ একাধিক মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
মোজাম্মেল হক বাবু ২০২৪ সালে ১৭ সেপ্টেম্বর ধোবাউড়া সীমান্ত থেকে আটক হন। জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন হত্যা ও সিআর মামলায় আটক দেখানো হয়েছে তাকে।
একই দিনে ধোবাউড়া সীমান্ত থেকে আটক হন শ্যামল দত্ত । তার বিরুদ্ধেও একই ধরনের হত্যা ও উসকানির একাধিক মামলায় আসামি করা হয়েছে তাকে।
মাইটিভির চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন সাথী ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট গুলশান থেকে গ্রেফতার হন। হত্যা ও চাঁদাবাজির মামলায় কারাবন্দি তিনি।
এছাড়া জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে হত্যাসহ বিভিন্ন মামলায় সাংবাদিক আরিফ হাসান, শওকত মাহমুদ, শেখ জামাল, আনিস আলমগীর ছাড়াও ডজনখানেক সাংবাদিক গ্রেফতার হয়েছেন।
উল্লেখ্য, জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে গণহত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-সহ ৫২ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিসি) তদন্ত সংস্থায় মামলা করা হয়। একইসঙ্গে ৩২ জন সিনিয়র সাংবাদিকের নামে মামলা করা হয়েছে। সাংবাদিকদের মধ্যে রয়েছেন প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি, একাত্তর টিভি ও এটিএন নিউজের সিনিয়র কর্মকর্তাসহ অন্যান্য গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।



