Uncategorized

কেমন সংসদ চাই

সতেরো বছর পরে আমরা একটা অবাধ, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের প্রতীক্ষায় ছিলাম। নানা দুর্বলতা, ত্রুটি বা ঘাটতির পরও ১২ ফেব্রুয়ারি মোটামুটি একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়েই  ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে। তাই একটা হিমালয় সমান প্রত্যাশা আছে এই সংসদের প্রতি। সুতরাং, এবার সংসদীয় রাজনীতির মধ্যে সংসদ হবে রাজনীতির প্রধান কেন্দ্র। এটাই প্রত্যাশিত এবং এটাই স্বাভাবিক। এদিক থেকে কিছুটা ওয়েস্টমিনস্টার ডেমোক্র্যাসির যে ধরন, সেটাই মূলত আমরা কাগজ-কলমে অনুসরণ করি।

 কিন্তু বাস্তবে আমাদের সংসদের কার্যক্রমের মধ্যে এর তেমন কোনও বহিঃপ্রকাশ বা রিফ্লেকশন থাকে না। এবার যে সংসদ গঠিত হয়েছে, সেই সংসদের মানে দুটো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একটা তো এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সংসদে যারা বিজয়ী দল, ইতোমধ্যে তারা সরকার গঠন করেছেন।

 বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। ফলে এটা হলো একটা। আরেকটা হচ্ছে, সংসদকে একইসঙ্গে তাদেরকে একটা সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও  দায়িত্ব পালন করবার কথা। যে জায়গা থেকে সংসদ নির্বাচনের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি যেখানে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

গণভোটের রায় যেহেতু ইতিবাচক হয়েছে, হ্যাঁ সূচক ভোট বেশি পড়েছে বলে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছেন—তাই এ নিয়ে এক ধরনের রাজনৈতিক চাপ আছে। এক ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব আছে জাতীয় সংসদের ওপরে। যাতে সংসদ পরবর্তীকালেও একইসঙ্গে সংসদ প্রথম ছয় মাস বা ১৮০ দিন—যেটা আমরা জুলাই সমঝোতায় যখন স্বাক্ষর করেছি, তখন যে সমঝোতার মধ্যে সংসদ একইসঙ্গে একটা এক ধরনের কনস্টিটিউশন পাওয়ার নিয়ে, এক ধরনের সংবিধান সংস্কার পরিষদের একটা ক্ষমতা নিয়ে সংসদ কাজ করবে। 

ফলে সংসদের এই পর্যায়টা শেষ হলে স্বাভাবিকভাবেই দেশের আইন প্রণয়নের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে তার স্বাভাবিক কাজকর্ম পরবর্তীকালে তারা পরিচালনা করবেন। ফলে এক ধরনের দ্বৈত দায়িত্ব নিয়ে বা ডুয়াল রেসপন্সিবিলিটি সংসদের ওপরে থাকছে।

এখন এটা নিয়ে বিএনপি বা  যারা সরকার গঠন করেছেন, আর এখনকার প্রধান বিরোধী দল তারাও স্বাক্ষর করেছেন।

তবে বিএনপি যে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে, তাদের কিছু ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল। কিছু ব্যাপারে যেমন তাদের একমত আছে, সম্মতি আছে, কিছু ব্যাপারে তাদের ভিন্নমত আছে, আপত্তি আছে। তো আগামী সংসদের এটা একটা বড় বিতর্কের জায়গা।

আগামী ১২ মার্চ সংসদ বসার পরে প্রধান বিতর্কের জায়গা হবে এটা। প্রথমত আমি এই সংসদ অধিবেশনকে স্বাগত জানাই। ১৭ বছর পরে গত তিনটি জাতীয় নির্বাচন কার্যত যেখানে ব্যর্থ হয়েছে, জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেনি, প্রতিনিধিত্বমূলক হয়নি। অবাধ বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আগামী সংসদ যাতে একইসঙ্গে, যাতে সংবিধান পরিষদের সভা হিসেবে এটা কাজ করতে পারে, সেই ব্যাপারটা নিশ্চিত করা। সেই জায়গাগুলো থেকে আজকের সংসদ সদস্যরা, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের ওপর জনগণের ম্যান্ডেট রয়েছে। সুতরাং, আশা করি নতুন নির্বাচিত  সংসদ সদস্যদের জন্য এটা আমার বিবেচনায় আইনগতভাবে আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন তাদের জন্য ম্যান্ডেটরি না হলেও আইনগত, রাজনৈতিক বা নৈতিকতার দিক থেকে তাদের ওপর একটা বড় কর্তব্য আছে।

জুলাই সনদকে সম্মান করা, জুলাই সনদ যাতে কার্যকর হয়, বাস্তবায়িত হয় এবং সে অনুসারে জাতীয় সংসদ যাতে কাজ করতে পারে, সেদিকে যাওয়ার জন্য। সেদিক থেকে বড় বিতর্ক হবে যে, তাহলে আগামী জাতীয় সংসদকে যদি একইসঙ্গে সংবিধান পরিষদের হিসেবে কাজ করতে হলে— সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে হবে, একেবারে প্রথম অধিবেশনগুলোতে বা প্রথম দিনগুলোতে। সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার পরে আমি আশা করি, সেদিক থেকে হয়তো আলোচনা হবে, বিতর্ক হবে, কিছু উত্তেজনাও তৈরি হবে। কিন্তু দিন শেষে আমি মনে করি যে সংবিধানে যখন এটা যুক্ত হবে, প্রথমতই এটা বিল আকারে উত্থাপিত হবে, আলোচনা হবে। এরপর যখন এটা আইনে পরিণত হবে তখন এটা সংবিধানে যুক্ত হবে। যে সংসদ একইসঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে যা কাজ করবে। এটা সংবিধানে যুক্ত হলে আমি আশা করি বিএনপির সংসদ সদস্যরাও শপথ গ্রহণ করবেন।

সংবিধান পরিষদের সদস্য হিসেবে এভাবে হয়তো এই বিতর্কের একটা অবসান হতে পারে। আর যদিও সেখানে, ইতোমধ্যে আমি দেখছি—এ নিয়ে উচ্চ আদালতও মামলা হয়েছে এবং উচ্চ আদালতে গণভোট, জুলাই সনদ এটা নিয়ে প্রশ্নও উত্থাপিত হয়েছে। 

উচ্চ আদালতে যেকোনও নাগরিকই যেতে পারেন। যদি কেউ মনে করেন যেটা সংবিধানবহির্ভূত, সংবিধান পরিপন্থি বা সংবিধান লঙ্ঘিত হয়েছে, সে অধিকার যেকোনও নাগরিকের আছে।

উচ্চ আদালত নিশ্চয়ই সামগ্রিক আইন বিবেচনা করে তাদের মতামত দেবেন, অথবা তারা রায় প্রদান করবেন। সেটার আরেকটা দিক আছে। তো এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু আমি যেটাই মনে করি যে যেটুকু উত্তেজনা, বিরোধ বা বৈরিতা অথবা মতপার্থক্যই থাকুক না কেন, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো যারা সংসদে আছেন ও যারা পার্লামেন্টে নির্বাচিত হয়েছেন, তারা প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতার পরিচয় দেবেন। আমরা তো মনে করি, বিতর্কটা হোক নানা প্রশ্নে। যেটা খানিকটা অচল অবস্থার দিকে যাতে না যায়। এমনটি হলে তো আমরা পুরোনো ঐতিহ্যটাকে অন্যভাবে ফিরিয়ে আনবো। তো সেরকম একটা দৃশ্য কেউ নিশ্চয়ই আমরা দেখতে চাইবো না।

কেউ যদি এ ইস্যুতে আবার সংসদ বয়কট করে, সেটাও আরেকটা সংকট তৈরি করবে। সেদিক থেকে মনে করি, ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী দলের মধ্যে ব্রডলি, এমনকি সংসদ অধিবেশনের বাইরেও আলাপ আলোচনা দরকার। উভয় পক্ষকেই ন্যূনতম সমঝোতা বা ঐকমত্যের জায়গায় যাওয়া দরকার। তাহলেই জনপ্রত্যাশা অনুসারে আগামী সংসদ কাজ করতে পারে।

ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে আমি মনে করি, সংসদ সদস্যরা ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিভিন্ন দলের সদস্যরা প্রথমত শুল্কমুক্ত গাড়ি তারা নেবেন না, এমন একটা সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছেন। তারা সরকারি প্লটও না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটা একটা ইতিবাচক দিক বলে আমি করি।

এর সঙ্গে আমি যুক্ত করতে চাই, তারা এমন ধারা পদ্ধতি চালু করতে পারেন কিনা, সংসদ সদস্য পদটা কোনও লাভজনক পদ নয়। পার্লামেন্ট মেম্বাররা প্রধানত আইন প্রণয়ন করবেন, তারা ল’ মেকার। স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়নমূলক কাজ মসজিদ-মন্দির-গির্জা নির্মাণ অথবা রাস্তাঘাটের সংস্কার এগুলো স্থানীয় সরকারের কাজ। তবে সংসদ সদস্যরাও এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকতে পারেন। তারা এগুলোর তত্ত্বাবধান করবেন।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা যারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছি, আগামী ৬ মাসের মধ্যে যদি এগুলো সংবিধানে যুক্ত হয়, এগুলো নিয়ে বড় ধরনের কোনও দ্বিমত নেই। যেমন- উচ্চকক্ষের ব্যাপারটি নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। উচ্চকক্ষ কীভাবে নির্বাচিত হবে এটা নিয়ে মতপার্থক্য আছে। তবে উচ্চকক্ষ নিয়ে আমরা সবাই একমত ছিলাম। বিএনপি, জামায়াত, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি বা গণতন্ত্র মঞ্চের দলগুলো আমরা একমত ছিলাম।

এগুলো আলাপ আলোচনা করে নিশ্চয়ই দেখা যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্ষমতাসীন দলের নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে যেকোনও মডার্ন ডেমোক্রেটিক স্টেটের নির্বাহী বিভাগের পার্লামেন্টারি আইন ও বিচার বিভাগের একটি রেশনাল লজিক্যাল মানে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকা উচিত। আগেকার অনুশীলনে আমরা দেখেছি দুই দশকে কার্যত নির্বাহী বিভাগকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রীকে এক ধরনের অগণতান্ত্রিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিল।

আমি আশা করি, এবার সে জায়গা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারবো। প্রধানমন্ত্রীকে কেন্দ্রের যে সরকার, প্রশাসনিক কাঠামো এবং পার্লামেন্টারি বিভাগের সঙ্গে একটা যৌক্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে। তাহলে ক্ষমতার চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স নিশ্চিত হয়।

 আরেকটা হলো, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীদের আমি দেখতে চাইবো, ভোটাররা তাদের ভোট দিয়েছেন, তাদের কাছে তারা কীভাবে জবাবদিহি করবেন। প্রতি ছয় মাস পরপর তারা ভোটারদের কাছে একটা জবাবদিহির বিধান চালু করতে পারেন কিনা এটাও তারা বিবেচনা করতে পারেন।

এই সংসদের কাছে আমরা চাইবো— বিতর্ক বা আলাপ-আলোচনা হবে। তবে সংসদে কোনও ব্যক্তিবন্দনা হবে না, অনেকগুলো স্তুতিবাক্যে ভাঁড়ামি করা হবে না। কারণ স্তুতি বা প্রশংসা করতে গিয়ে অনেক সময় বক্তা তার মূল বক্তব্যই বলতে পারেন না। বিশেষণ পাঠ করতে গিয়ে তার মূল সময়টাই চলে যায়। এগুলো দরকার নেই।

এবারের অধিকাংশ সংসদ সদস্যই নতুন। তারা সংসদে কী ধরনের ভূমিকা পালন করবেন, অনেকের গ্লোবাল এক্সপেরিয়েন্স আছে। সেগুলো তারা নিশ্চয়ই বিবেচনার মধ্যে নেবেন। মানুষের জনপ্রত্যাশা তারা রাষ্ট্রের, সরকারের ও দেশের গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করবার ক্ষেত্রে যেন ভূমিকা পালন করতে পারে।

আরেকটা দিক হলো, আমি দেখতে চাইবো— হয়তো এ অধিবেশনেই পার্লামেন্টারি বিভিন্ন কমিটিগুলো পার্লামেন্টকে সক্রিয় রাখার ক্ষেত্রে যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সেহেতু আমরা বলেছি— কিছু কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলের জন্য রাখা। জুলাই সনদ অনুযায়ী এগুলো যদি আমরা সংবিধানে যুক্ত করতে পারি, তাহলে পার্লামেন্ট সক্রিয় ও গতিশীল হবে এবং জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করা সম্ভব হবে। আশা করবো, পার্লামেন্ট শুধু একটি বিতর্কের ক্লাব হবে না, সত্যি সত্যি দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করবে।

বিগত দিনে যেসব চুক্তি বা সমঝোতা হয়েছে, যেগুলো রাষ্ট্রের স্বার্থ বা নিরাপত্তার পরিপন্থি এগুলো নিয়ে এমপিরা পার্লামেন্টে আলোচনা ও পর্যালোচনা করবেন। দেশবিরোধী এসব চুক্তি বাতিলের উদ্যোগ নেবেন। আমি মনে করি, পার্লামেন্টে আলাপ-আলোচনা না করে, বা গণশুনানি না করে ভবিষ্যতে কোনও মেগা প্রকল্প নেওয়া ঠিক হবে না। পার্লামেন্ট, রাজনীতি, গণতন্ত্রের চর্চার উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম হবে।

আমাদের একটা বহুত্ববাদী সমাজ, এ নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে, বিতর্ক আছে, নানা বৈচিত্র্যের মধ্যে যে ঐক্য, পার্লামেন্ট যদি সেগুলো ধারণ করে এগোতে পারে, সেটা হবে ইতিবাচক। এই পার্লামেন্ট আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, যেটা আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

তারই ধারাবাহিকতায় ৯০ দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং এবারকার চব্বিশের যে গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধের অসম্পূর্ণ কর্তব্য সম্পন্ন করার ডাক দিয়ে, আমরা তা করেছি। তাই আমরা নতুন কোনও বিরোধ বা বিভাজন দেখতে চাই না। নানা প্রশ্নে বিতর্ক থাকবে আমরা বিতর্ক করবো।

কিন্তু সব শেষে এক ধরনের জাতীয় ঐক্য বা এক ধরনের সমঝোতা নিয়েই আমাদের হাঁটতে হবে। না হয় জটিল যে আঞ্চলিক পরিস্থিতি বা বৈশ্বিক যে পরিস্থিতি তা আমাদের বিভক্তি, বিভাজন বা বৈরিতা- এটা কিন্তু আমাদের অভ্যুত্থানের অর্জন সংসদকে অকার্যকর করে ফেলতে পারে। এই ঝুঁকিটা কারও নেওয়া ঠিক হবে না। আশা করবো, এবারের সংসদ জনপ্রত্যাশা ধারণ করবে। বাংলাদেশ একটি নিয়মতান্ত্রিক পথে ধারাবাহিকভাবে আইন এবং গণতান্ত্রিক শাসনে চলার ক্ষেত্রে এবারের সংসদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করবে। এটাই হবে জনগণের প্রত্যাশা।

 

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button