Uncategorized

‘পছন্দমতো’ প্রতিবেদন না হওয়ায় উল্টো কমিটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বিমান

কোনও সমস্যা বা দুর্ঘটনা হলে গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। তদন্ত করে একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিবেদন জমা দেয় তারা। জানায় সমস্যা বা দুর্ঘটনার কারণ এবং দেয় বিভিন্ন সুপারিশ। সেই সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সাধারণত এমনটা হয়ে থাকলেও এবার ঘটতে যাচ্ছে ভিন্ন ঘটনা। তাও আবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভিভিআইপি ফ্লাইট ইস্যুতে, যেটি দিয়ে কিনা দেশে ফিরেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনকে গ্রাহ্য না দিয়ে উল্টো তদন্ত কমিটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

গত ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিমানের বোয়িং ৭৮৭-৯ মডেলের একটি উড়োজাহাজে করে তারেক রহমান দেশে ফেরেন। গুরুতর যান্ত্রিক ত্রুটি নিয়েই লন্ডন থেকে সিলেটের উদ্দেশে ছেড়ে আসে বিমানটি। এ ঘটনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের উপপ্রধান প্রকৌশলী মো. মনসুরুল আলমের নেতৃত্বে একটি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়। কমিটির অপর সদস্যরা হলেন, আবদুল্লাহ আল মামুন এবং মো. জুবিয়ারুল ইসলাম।

তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা দেয় কমিটি, যেখানে গুরুতর সমস্যা চিহ্নিত করা হয়। তবে, প্রতিবেদন গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ। উল্টো তদন্ত কমিটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ।
 
বিষয়টি নিশ্চিত করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম বলেন, “তারা (তদন্ত কমিটি) ভুল রিপোর্ট দাখিল করেছে। আর তদন্ত কমিটির সব রিপোর্ট যে সঠিক হবে এমন কথা নয়। অনেক তদন্ত কমিটির রিপোর্ট ভুল ছিলো।”

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না তা আমার জানা নেই। তবে, ফাইল প্রসেসিং হচ্ছে। তাদের রিপোর্টে কি কি ভুল ছিল সেগুলোও মার্কিং হচ্ছে।”

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গুরুতর যান্ত্রিক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিমানের বোয়িং ৭৮৭-৯ মডেলের উড়োজাহাজটি দিয়েই গত ২৫ ডিসেম্বর ভিভিআইপি ফ্লাইটে তারেক রহমানকে বহন করা হয়েছিলো।

গত বছরের ৯ ও ১৭ ডিসেম্বর উড়োজাহাজটির রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে একাধিক অনিয়ম করা হয়েছে। বিশেষ করে ১০ ডিসেম্বরের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ মাত্র আড়াই ঘণ্টার মধ্যে শেষ করা হয়, যা বোয়িং ৭৮৭-৯ উড়োজাহাজের জন্য নির্ধারিত সময়ের তুলনায় অস্বাভাবিক কম। এছাড়া উড়োজাহাজটির ত্রুটি নির্ণয় বা কার্যকারিতা পরীক্ষার সঠিক কোনও রেকর্ডও তদন্ত কমিটির কাছে পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ১৫ দিনের ব্যবধানে একই যান্ত্রিক ত্রুটি তিনবার দেখা দিলেও সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। গত ২১ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে সিলেটগামী বিজি-২০২ ফ্লাইটটি যখন মাঝ আকাশে ছিল, তখন আবারও এর ভিএফএসজি বিকল হয়ে যায়। কমিটির মতে, এ ধরনের ত্রুটির কারণে উড়োজাহাজটিতে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড বা গিয়ারবক্সের অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কা ছিল।

প্রকৌশল বিভাগের এমন উদাসীনতার পরেও ত্রুটিপূর্ণ বিমানটি ভিভিআইপি ফ্লাইটে ব্যবহার করা হয়েছে।

রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের এ চরম অব্যবস্থাপনার কারণে প্রায় ২৬ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। বারবার যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন, এক বিমান থেকে যন্ত্রাংশ খুলে অন্যটিতে লাগানো এবং জরুরি ভিত্তিতে যন্ত্রাংশ পরিবহনের পেছনে এ বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। তদন্ত কমিটি এ আর্থিক ক্ষতির দায় নির্ধারণের পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়াকে একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করে। 

প্রতিবেদনে বিমানের দুই প্রকৌশলী হীরালাল এবং মো. সাইফুজ্জামান খানের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। কমিটি জানিয়েছে, উড়োজাহাজটিতে কম ফুয়েল প্রেসারের সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও তারা যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই সেটিকে উড্ডয়নের ছাড়পত্র দিয়েছিলেন। তাদের এ ভুল সিদ্ধান্তের কারণে জানমালের বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছিলো।

এদিকে, তদন্ত প্রতিবেদন জমা পরবর্তীতে কমিটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নেওয়ার খবরে বিমানে তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বিমান এ দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। ভিভিআইপি ফ্লাইটে এ ধরনের ত্রুটি নজিরবিহীন ঘটনা। এখন তারা এটি মেনে নিতে পারছে না। পছন্দমত রিপোর্ট না হওয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্তে নিয়োজিত থাকা এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেন, ওই ভিভিআইপি ফ্লাইটে ভয়াবহ ত্রুটি ছিল। তিনি বলেন, “সেটি যে লন্ডন থেকে ঢাকায় ভালোভাবে ফিরতে পেরেছে এটি অলৌকিক ঘটনা। দুর্ঘটনা ঘটার যথেষ্ট শঙ্কা ছিল। তারপরও আমরা ভুলত্রুটিগুলো ধরে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। এখন তারা সেটি গ্রহণ না করে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কাজ করছে। এটি খুবই দুঃখজনক ঘটনা।”  




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button