বিতর্কের ঘূর্ণিতে ট্রাইব্যুনাল

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ইতিহাস, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রের নৈতিক দায়-এই তিনের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রতিষ্ঠান এটি। তবে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে এর যাত্রা শুরু হলেও প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ট্রাইব্যুনালকে ঘিরে বিতর্ক থামেনি। কখনও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ, কখনও তদন্তের মান নিয়ে প্রশ্ন। সব মিলিয়ে আইসিটিকে ঘিরে জনমনে প্রত্যাশা যেমন উঁচু, সংশয়ও তেমনই গভীর। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই সংশয়কে আরও তীব্র করে তুলেছে।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে ট্রাইব্যুনালকে ঘিরে যে ধারাবাহিক ঘটনা ঘটেছে, তা বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল “জুলাই গণহত্যা” মামলার তদন্ত ও রায় ঘোষণার অস্বাভাবিক দ্রুততা।
আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার সাধারণত দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ। প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষ্য যাচাই, সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ফরেনসিক বিশ্লেষণ-এসবই অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল প্রক্রিয়া। বিশ্বজুড়ে এমন মামলার তদন্ত ও বিচার বহুবছর ধরে চলে। এটাই স্বাভাবিক বাস্তবতা। সেই তুলনায় বাংলাদেশে আলোচিত মামলার তদন্ত শেষ হওয়ার গতি অনেকের কাছেই বিস্ময়কর ঠেকেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই দ্রুততা কি দক্ষতার পরিচয়, নাকি তাড়াহুড়োর ফল?
অন্যদিকে, বিতর্কের কেন্দ্রে উঠেছে ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের নাম। তাকে এই পদে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই আইনজীবী মহল এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে তার নিরপেক্ষতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। কারণ, অতীতে তিনি ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামের কয়েকজন নেতার পক্ষে আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছিলেন। আইনের দৃষ্টিতে এটি কোনও অপরাধ নয়, বরং আইনজীবী পেশার স্বাভাবিক অংশ। তবু এমন একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য স্বার্থের দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলাই আন্তর্জাতিক রীতি। সেই কারণেই প্রশ্নটা পুরোপুরি স্তিমিত হয়নি।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাইব্যুনালে পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। চিফ প্রসিকিউটরের পদ থেকে তাজুল ইসলামকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। কিন্তু তার বিদায়ের দিনই পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। ট্রাইব্যুনালের আরেক প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ প্রকাশ্যে অভিযোগ তোলেন-চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়কে নাকি অর্থ উপার্জনের একটি মাধ্যম বানিয়ে ফেলা হয়েছিল, আর এর পেছনে ছিল একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
এই অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে তা নিছক ব্যক্তিগত দুর্নীতির ঘটনা নয়; বরং পুরো প্রসিকিউশন কাঠামোর ওপরই গুরুতর আঘাত। কারণ, মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো সংবেদনশীল মামলার বিচার যেখানে হচ্ছে, সেখানে আর্থিক লেনদেন বা অনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করতেই পারে।
তবে গল্পের এখানেই শেষ নয়। তাজুল ইসলামের পাল্টা বক্তব্যও কম বিস্ফোরক নয়। তিনি দাবি করেন, প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদের বিরুদ্ধে তিনি আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছিলেন। তার অভিযোগ অনুযায়ী, সুলতান মাহমুদ বিশ্বাসভঙ্গ, শৃঙ্খলাভঙ্গ, এমনকি ব্যক্তিগত সহিংসতার মতো বিভিন্ন আচরণবিধি লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ বিষয়ে তিনি সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে লিখিতভাবে অবহিতও করেছিলেন বলে জানা গেছে। কিন্তু যদি এমন অভিযোগ আগে থেকেই ছিল, তাহলে কেন তা তদন্তের আলো দেখেনি, এই প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে।
এরই মধ্যে আরেকটি অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এক সংবাদ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ট্রাইব্যুনালের এক প্রসিকিউটর কারাবন্দি একজন সাবেক আওয়ামী লীগ নেতাকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার জন্য তার পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা দাবি করেছিলেন। কথোপকথনের অডিও রেকর্ডিংয়ে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগটি প্রমাণিত হলে তা হবে বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর সরাসরি আঘাত।
এই আবহেই প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারের পদত্যাগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তার পদত্যাগ সরকারিভাবে গ্রহণ করা হলেও এর পেছনের কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি। ফলে ট্রাইব্যুনালের ভেতরে ঠিক কী ঘটছে-তা নিয়ে নানা জল্পনা ছড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে মূল প্রশ্নটি আর কোনও ব্যক্তি বা একটি নির্দিষ্ট অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্নটি এখন পুরো প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে। একটি প্রসিকিউশন টিম যদি নিজস্ব দ্বন্দ্ব, দুর্নীতির অভিযোগ এবং প্রশাসনিক অস্বচ্ছতার মধ্যে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে সেই টিমের উপস্থাপিত মামলার রায় নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
বিচারব্যবস্থার শক্তি কেবল আইনের ধারা বা আদালতের আদেশে নয়; এর আসল ভিত্তি মানুষের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে আইনি বৈধতা থাকলেও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে বিচার হয় ইতিহাসের, মানবতার এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। ট্রাইব্যুনালের ভেতরে ওঠা সব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। প্রয়োজনে পুরো প্রসিকিউশন কাঠামো নতুন করে সাজানোর কথাও ভাবতে হবে।
কারণ, শেষ পর্যন্ত একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই-বিচার শুধু হওয়া যথেষ্ট নয়, বিচার এমনভাবে হতে হবে যাতে তা নিয়ে কোনও যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ না থাকে। অন্যথায় ন্যায়বিচারের পরিবর্তে ইতিহাসে থেকে যেতে পারে আরেকটি বিতর্কের ছায়া। তখন প্রশ্নটা থেকেই যাবে-এমন ট্রাইব্যুনালের বিচার কতটা গ্রহণযোগ্য?
লেখক: সাংবাদিক


